আবারও উত্তপ্ত জেনেভা ক্যাম্প: জামিনে বেরিয়ে এসেই সংঘর্ষ

আবারও উত্তপ্ত জেনেভা ক্যাম্প: জামিনে বেরিয়ে এসেই সংঘর্ষ

উত্তরদক্ষিণ। সোমবার (১১ আগস্ট) ২০২৫, আপডেট ২৩:৪০

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। মাদক কারবার ও ক্যাম্পের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সন্ত্রাসী দুই গ্রুপ—ভূঁইয়া সোহেল ওরফে বুনিয়া সোহেল এবং সেলিম আশরাফি ওরফে চুয়া সেলিমের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ চলছে। সোমবার (১১ আগস্ট) দুপুরে এ সংঘর্ষে শাহ আলম (২২) নামে এক তরুণ নিহত হন, আহত হয়েছেন অন্তত ৫ জন।

এ সংঘর্ষের সূত্রপাত নতুন নয়। গত বছরের জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের পর থেকেই ক্যাম্পের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘাত শুরু হয়। সেই সময়ে মাদক কারবারিসহ অন্তত সাত জন নিহত হন। এরপর ২৮ অক্টোবর মো. রহমত ওরফে সার্জ্জন (১৩) নামে এক শিশু নিহত হয়েছে। এরপর চলতি বছরের ১ মে দুই গ্রুপের সশস্ত্র হামলায় মাহতাব হোসেন (৩২) নামে এক মাছ ব্যবসায়ী নিহত হন। সর্বশেষ সোমবার (১১ আগস্ট) শাহ আলম নামে একজনকে কুপিয়ে হত্যা করে বুনিয়ে সোহেলের সদস্যরা।

স্থানীয়রা বলছেন, গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর টানা দেড় মাস দুই গ্রুপের সংঘর্ষ চলেছে ক্যাম্পের ভেতরে। ওই সময় দুই জন শিশুসহ সাত জন নিহত হন। সে সময় বুনিয়ে সোহেল ও চুয়া সেলিমকে গ্রেফতারের পর ক্যাম্প এলাকা কিছুটা শান্ত ছিল। গত কয়েক মাসে সন্ত্রাসীরা বেশির ভাগই জামিনে বেরিয়ে আসার পর আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প। বিশেষ করে গত ৮ আগস্ট থেকে শুরু হয় দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ। এরই ধারাবাহিকতায় রবিবার দিনভর ক্যাম্পের ভেতরে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এরপর সোমবার কুপিয়ে হত্যা করা হয় শাহ আলমকে।

পুলিশ বলছে, গত বছরের ৫ আগস্টের সংঘর্ষের পর র‌্যাব ও পুলিশের ধারাবাহিক অভিযানে অস্ত্র ও মাদকসহ জেনেভা ক্যাম্পের শতাধিক অপরাধী গ্রেফতার হয়েছিল। বিশেষ করে গত বছরের ৩১ অক্টোবর সিলেটে অভিযান চালিয়ে বুনিয়া সোহেলকে এবং এ বছরের ৮ জানুয়ারি রাজধানীর ধানমন্ডির ল্যাবএইড হাসপাতাল থেকে চুয়া সেলিমকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। এরপর কিছু দিন শান্ত থাকার পর তারা জামিনে বের হলে ক্যাম্প এলাকায় আবার সহিংসতা শুরু হয়।

ক্যাম্পের সূত্র বলছে, বুনিয়া সোহেল ও চুয়া সেলিম জেল থেকে জামিনে বের হওয়ার পর থেকে ক্যাম্পে আগের মতোই প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি চলছে। বাধা দিলে হামলার শিকার হন স্থানীয়রা। সোমবার দুপুরে ক্যাম্পের ৭ নম্বর সেক্টরের হুমায়ুন রোড ময়লার গলিতে চুয়া সেলিম গ্রুপ ও বুনিয়া সোহেল গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের সময় কুপিয়ে হত্যা করা হয় শাহ আলমকে।

মোহাম্মদপুর থানার ওসি আলী ইফতেখার হাসান বলেন, ‘সংঘর্ষের ঘটনায় র‌্যাব, সেনাবাহিনী ও পুলিশ যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করছে। দেশি-বিদেশি অস্ত্রসহ অন্তত ২০ জনকে আটক করা হয়েছে। অভিযান শেষ হলে বিস্তারিত জানানো হবে।’ এ ঘটনায় ককটেল বিস্ফোরণ ও হত্যাকাণ্ডের পৃথক দুটি মামলা দায়ের হয়েছে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চুয়া সেলিমের বিরুদ্ধে হত্যা, মাদক, অস্ত্র লুটসহ ৩৫টি মামলা রয়েছে। অপরদিকে বুনিয়া সোহেলের বিরুদ্ধেও একাধিক হত্যা ও মাদক মামলা রয়েছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দুষ্কৃতকারীরা মোহাম্মদপুর ও আদাবর থানায় হামলা চালিয়ে আগ্নেয়াস্ত্রসহ মালপত্র লুট করে। থানায় অগ্নিসংযোগের পর উভয় থানা কার্যত পুলিশশূন্য হয়ে পড়ে। এ সুযোগে জেনেভা ক্যাম্পের প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপগুলো দফায় দফায় সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।

এর আগে সংঘর্ষে ইটপাটকেল, পেট্রোলবোমা ও ধারালো অস্ত্র ব্যবহারের ঘটনা ঘটলেও এখন পুলিশের লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করছে দুই গ্রুপ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, লুট হওয়া বহু অস্ত্র এখন ক্যাম্পে রয়েছে। পাশাপাশি ক্যাম্পের ভেতরে ককটেল তৈরির কাজও চলছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, সাম্প্রতিক সহিংসতায় তাদের জীবনযাত্রা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। দিনের বেলাতেও অনেকে রাস্তায় বের হতে ভয় পাচ্ছেন। শিশু-কিশোরদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। ব্যবসায়ী ও দোকানিরা সময়ের আগেই দোকানপাট বন্ধ করছেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ক্যাম্পে টহল ও অভিযান জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি পুলিশ, র‌্যাব ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা যৌথ অভিযান চালাচ্ছে। সর্বশেষ রাত ১০টা পর্যন্ত এ অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানা যায়।

এ বিষয়ে তেজগাঁও বিভাগের মোহাম্মদপুর জোনের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) জুয়েল রানা জানান, আমরা দুপুরের পর থেকে জেনেভা ক্যাম্পে ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছি। কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বেশ কিছু মাদক ও অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি জেনেভা ক্যাম্পে মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেফতারে আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

ইউডি/এবি

badhan

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading