কুষ্টিয়া পদ্মা-গড়াইয়ে পানি বাড়ায় বন্যার আশংকায় হাজারো মানুষ

কুষ্টিয়া পদ্মা-গড়াইয়ে পানি বাড়ায় বন্যার আশংকায় হাজারো মানুষ

উত্তরদক্ষিণ। বুধবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৫, আপডেট ১৬:৪০

কুষ্টিয়ার পদ্মা ও গড়াই নদীর পানি বাড়ছে। গত এক সপ্তাহে পদ্মা নদীর পানি বেড়েছে অন্তত ১৫০ সেন্টিমিটার। ভারি বর্ষণ ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা ঢলে পানি বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বলে জানা গেছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, পদ্মার পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি অবস্থান করেছে। এভাবে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে কয়েকদিনের মধ্যে পদ্মার পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। ধারাবাহিক পানি বৃদ্ধির ফলে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে নদীর পাশের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। তলিয়ে গেছে প্রায় এক হাজার হেক্টর জমির ফসল। চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর এ দুই ইউনিয়ন মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ইউনিয়ন দুটিতে অবস্থিত ১৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, ইন্ডিয়া থেকে ফারাক্কা হয়ে পানি পদ্মায় পড়ছে। ২ আগস্ট থেকে ধারাবাহিকভাবে পদ্মার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত আছে। প্রতিদিন গড়ে ১২ থেকে ২০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সকালে উপজেলার ভাগজোত পয়েন্টে পানির উচ্চতা ছিল ১৪ দশমিক ৭২ সেন্টিমিটার। এ পয়েন্টের বিপৎসীমা হল ১৫.৭০ সেন্টিমিটার। সে অনুযায়ী বিপৎসীমার ৯৮ সেন্টিমিটার (০.৯৮ মিটার) নিচ দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।

বুধবার হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পদ্মার পানির উচ্চতা পরিমাপ করা হয় ১২ দশমিক ৮৯ সেন্টিমিটার। এদিন গড়াই নদীর পানির উচ্চতা পরিমাপ করা হয় ১১ দশমিক ২৭ সেন্টিমিটার। দুই নদীর পানি বিপৎসীমার চেয়ে মাত্র এক সেন্টিমিটার নিচে রয়েছে।

পদ্মা নদীতে প্রতিদিন পানি বাড়ছে। দুদিন আগেও যেসব এলাকা শুকনা ছিল। সেখানে বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের অধিকাংশ রাস্তা ঘাট পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ইউনিয়ন দুটি মুল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ফলে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় পঞ্চাশ হাজারের বেশি মানুষ।

পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে দু’একদিনের মধ্যে এসব গ্রামের বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়ার আশংকা রয়েছে। এদিকে ফিলিপনগর, মরিচা, চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর চরাঞ্চলের প্রায় এক হাজার হেক্টর জমির মরিচ, কলা, ধানসহ বিভিন্ন ধরনের ফসলের ক্ষেতে পানি ঢুকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

পদ্মাপাড়ের বাসিন্দারা গনমাধ্যমকে জানান, চরাঞ্চলের নিম্নভূমি প্লাবিত হয়েছে। আবাদি জমি ও রাস্তা ডুবে যাওয়ায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। যদিও এখনো বসতবাড়িতে পানি ওঠেনি, তবু বন্যার শঙ্কা ক্রমে বাড়ছে। বিশেষ করে রামকৃষ্ণপুর ও চিলমারী ইউনিয়নের অন্তত ৪০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এরমধ্যে চরের ১৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পানি প্রবেশ করায় পাঠদান বন্ধ রাখা হয়েছে।

চিলমারী এলাকার স্থানীয় জনপ্রতিনিধি শেখ নুরুজ্জামান গনমাধ্যমকে জানান, পদ্মার পানি বেড়ে যাওয়ায় শত শত বিঘা জমির ফসল ক্ষেতে পানি ঢুকে নষ্ট হয়ে গেছে। সড়কপথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। বিদ্যালয়গুলোতে পাঠদান বন্ধ ঘোষণা করে দেওয়া হয়েছে।

মরিচা ইউনিয়নের ভূরকাপাড়া গ্রামের জামিরুল ইসলাম গনমাধ্যমকে বলেন, পদ্মায় পানি বৃদ্ধির ফলে গ্রামের হাজার হাজার মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। কেন না নদীর পাড়ের ব্যাপক অংশ অরক্ষিত রয়েছে। যে কোন সময় এসব অংশ নিয়ে পানি লোকালয়ে ডুকে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ জন্য জরুরি ভিত্তিতে নদীর অরক্ষিত পাড় রক্ষা করা জরুরি।

চিলমারী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান গনমাধ্যমকে বলেন, রাস্তাঘাটে পানি ঢুকে পড়ায় চিলমারী ইউনিয়ন মুল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। যে কোনো সময় চরাঞ্চলের গ্রামগুলোতে পানি ঢুকে যেতে পারে।

উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মুশতাক আহম্মেদ বলেন, বন্যাকবলিত এলাকায় পরিদর্শন করে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের ১৩টি বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে বিদ্যালয়গুলো খোলা থাকবে যাতে বন্যাকবলিত মানুষ সেখানে আশ্রয় নিতে পারেন।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম গনমাধ্যমকে বলেন, চরাঞ্চলের প্রায় এক হাজার হেক্টর জমির মরিচ, রোপা আউশ কলা, বিভিন্ন ধরনের সবজি, ভুট্টা বন্যার পানিতে আক্রান্ত হয়েছে। বন্যার পানি বৃদ্ধির এ ধারা অব্যাহত থাকলে এখনও যেসব জমিতে পানি প্রবেশ করেনি সেগুলোও আক্রান্ত বা তলিয়ে যেতে পারে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল হাই সিদ্দিকী গনমাধ্যমকে বলেন, পদ্মায় পানি বেড়ে যাওয়ায় উপজেলার চারটি ইউনিয়নের মানুষ ক্ষতির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়ন মুল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক বন্যা পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা হচ্ছে। বন্যায় ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া, শুকনো খাবারসহ দুর্যোগ মোকাবেলায় পর্যাপ্ত প্রস্তুতি রয়েছে।

কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. তৌফিকুর রহমান গনমাধ্যমকে বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে ত্রাণের ব্যবস্থা করা করছি। তাদের প্রয়োজন হলে আমরা সার্বিকভাবে সহযোগিতা করবো। পানি আরও বাড়তে পারে। সেজন্য আমরা যথাযথ প্রস্তুতি নিচ্ছি।

পাবনা ওয়াটার হাইড্রোলজি বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জাহিদুজ্জামান জাহিদ গনমাধ্যমকে জানিয়েছেন, পদ্মা ও গড়াই নদীতে প্রতিদিন পানি বাড়ছে। আর এ পানি বৃদ্ধি কত দিন অব্যাহত থাকবে। সেটি এ মুহূর্তে বলা মুশকিল।

ইউডি/রেজা

Asadujjaman

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading