গাজীপুরে বেড়েছে চুরি-ছিনতাই, টার্গেট পোশাকশ্রমিকরা

গাজীপুরে বেড়েছে চুরি-ছিনতাই, টার্গেট পোশাকশ্রমিকরা

উত্তরদক্ষিণ। শুক্রবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৫, আপডেট ১৭:১৫

গাজীপুর যেন ছিনতাইকারী ও অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। দিন-রাত হরহামেশাই ঘটছে চুরি, ছিনতাই ও রাহাজানি। ঘটছে হতাহতও। অনেক সময় এসব অপরাধ কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ হয়ে বিক্ষুব্ধ জনতা আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছেন। এতে গণপিটুনিতে নিহতের ঘটনাও বাড়ছে।

স্থানীয় মানুষের দাবি, ছিনতাইকারীদের প্রধান টার্গেট সাধারণত শিল্পকারখানার শ্রমিকরা। বিশেষ করে মাসের শুরুতে কারখানাগুলোতে বেতন–ভাতা দেওয়ার সময় তাদের অপতৎপরতা বেড়ে যায়। এছাড়া কর্মস্থলে যাতায়াতের সময় অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে সর্বস্ব লুটে নিচ্ছে দুর্বৃত্তরা। এতে ভয় ও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন শ্রমিকরা। শুধু পোশাকশ্রমিক নয়, চুরি–ছিনতাই বেড়ে যাওয়ায় আতঙ্ক ছড়িয়েছে বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার মানুষের মধ্যেও। এর জন্য পুলিশের উদাসীনতা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অপ্রতুল তৎপরতা ও নজরদারির অভাবকে দায়ী করছেন স্থানীয়রা। পুলিশ বলছে, চুরি–ছিনতাই রোধ ও মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা কাজ করছে। তবে অপ্রতুল জনবল দিয়ে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা রক্ষা করতে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে।

জানা গেছে, গত ১৯ অক্টোবর রবিবার রাত সাড়ে আটটার দিকে পলিটেকনিক শিক্ষার্থী জাহিদুল আহসান জিহাদ তার মায়ের কাছ থেকে তিন হাজার টাকা নিয়ে কলেজ রোডের দিকে যাচ্ছিলেন ফি রকেটের মাধ্যমে জমা দিতে। পথে আউচপাড়ার সাহাজ উদ্দিন সরকার রোডের গলিতে ঢুকলে অজ্ঞাত চার–পাঁচজন ছিনতাইকারী জিহাদ ও তার বন্ধু রহমান ও আরিফ হোসেনের পথরোধ করে। এসময় রহমান ও আরিফ দৌড়ে পালিয়ে যান। ছিনতাইকারীরা জিহাদকে একা পেয়ে ছুরিকাঘাত করে। আহত জিহাদ তাদের ধাওয়া করার চেষ্টা করলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে ফুটপাতে পড়ে যান। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে ঢাকা ইম্পেরিয়াল হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পথে জিহাদ মারা যান।

এই হত্যাকাণ্ডের রেশ কাটতে না কাটতেই গত মঙ্গলবার দুপুরে টঙ্গীর স্টেশন রোড এলাকায় মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা কালে স্থানীয়রা এক যুবককে আটক করে গণপিটুনি দেয়। এসময় উত্তেজিত জনতা তার শরীরে লবণ ছিটিয়ে উল্লাস করে। পরে শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

দুই দিনের ব্যবধানে পরপর দুটি হত্যাকাণ্ডে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
পুলিশ সূত্র জানায়, শ্রমিকদের বেতন–ভাতা সাধারণত মাসের প্রথম থেকে দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে পরিশোধ করা হয়। এই সময়ে কারখানা এলাকায় সুযোগসন্ধানী দুর্বৃত্তরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। ব্যাংকের এটিএম বুথে নজর রেখে শ্রমিকদের টার্গেট করে তারা। পরে ভয়ভীতি দেখিয়ে সর্বস্ব লুটে নেয়।

শ্রমিকদের অভিযোগ, কারখানার ফটক ও আশপাশে মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা নিয়মিত অবস্থান করেন। বেতন পাওয়ার সময় এদের উৎপাত বেড়ে যায়। হামলা, ছিনতাই, হেনস্তা থেকে শুরু করে নির্যাতনের মতো ঘটনাও ঘটে। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে চাকরি বদলাচ্ছেন।

শ্রীপুর পৌরসভার ভাঙ্গাহাটি এলাকার গার্মেন্টস শ্রমিক বলেন, গত এপ্রিল মাসে রাতের ডিউটি শেষে বাড়ি ফিরছিলাম। পথে কয়েকজন যুবক এসে টাকা দাবি করে। না দিতে চাইলে রাস্তার পাশের জঙ্গলে নিয়ে মারধর করে। শেষ পর্যন্ত তিন হাজার টাকা দেওয়ার শর্তে ছেড়ে দেয়। তিনি জানান, ভয়ে থানায় অভিযোগ করেননি। পরে অন্য কারখানায় চাকরি নেন।

একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ডেকো গার্মেন্টস, রিদিশা গার্মেন্টস, ডিবিএল গার্মেন্টস, এক্স সিরামিক, নিট হরাইজন, আমান গার্মেন্টস, সিজি গার্মেন্টস, মেঘনা গার্মেন্টস, সাদমা গ্রুপসহ জেলার বেশির ভাগ কারখানার শ্রমিকরা।

এ বিষয়ে মৌচাক এলাকার সাদমা গ্রুপের পরিচালক সোহেল রানা বলেন, সাধারণত ব্যাংকের বুথ থেকে বেতন উত্তোলন বা নগদ টাকা বহনের সময় শ্রমিকদের টার্গেট করে ছিনতাই হয়। তাই মোবাইল ব্যাংকিং আরও সহজ করা দরকার, যেন শ্রমিকরা বুথে গিয়ে লম্বা লাইনে না দাঁড়াতে হয়।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ১০ মাসে গাজীপুর মহানগর এলাকায় বিভিন্ন থানায় ১৭৮টি ছিনতাইয়ের মামলা হয়েছে। এই সময়ে পুলিশ ঘটনায় জড়িত ১ হাজার ৪৩১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। জেলার পাঁচ থানায় জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে দস্যুতার মামলা হয়েছে ২৭টি। এসব মামলায় ১৮ জন নামীয় ও ২০–২৫ জন অজ্ঞাত আসামিকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। গ্রেপ্তার হয়েছেন ১৪ জন।

স্থানীয়দের দাবি, অনেক সময় চুরি–ছিনতাইয়ের শিকার হলেও সাধারণ মানুষ ও শ্রমিকরা থানায় অভিযোগ দেন না। পুলিশি হয়রানি ও সন্ত্রাসীদের ভয়ে অনেকে ঘটনা চেপে যান। ফলে বিচার না হওয়ায় অপরাধীরা পার পেয়ে যায়।

এ বিষয়ে গাজীপুর মহানগর পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কমিশনার জাহিদ হাসান বলেন, চুরি–ছিনতাই রোধে বিভিন্ন এলাকায় টহল পুলিশের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে টঙ্গী ফ্লাইওভার ও চান্দনা চৌরাস্তায় সন্ধ্যার পর অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এজন্য টঙ্গী পূর্ব থানায় গত এক মাসে ৪৮ জন ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের অনেকেই চুরি ও ডাকাতির প্রস্তুতিসহ বিভিন্ন মামলার আসামি। এছাড়া অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পাশাপাশি বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনও কাজ করছে।

তিনি আরও বলেন, এই অঞ্চলে মাদক একটি বড় চ্যালেঞ্জ। নেশার টাকা জোগাড় করতে গিয়েই অনেকে চুরি–ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়ছে। এসব আসামিকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হলেও অল্প সময়ে জামিন পেয়ে আবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এটা আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

ইউডি/রেজা

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading