পঙ্গুত্ব তাকে ভিক্ষুক নয়, বানিয়েছে ব্যবসায়ী

পঙ্গুত্ব তাকে ভিক্ষুক নয়, বানিয়েছে ব্যবসায়ী

উত্তরদক্ষিণ। বুধবার, ১৯ নভেম্বর, ২০২৫, আপডেট ১২:০০

প্রায় ১৭ বছর আগে মাঠ থেকে গরু নিয়ে ফিরছিলেন রুবেল হোসেন। সে সময় তার বয়স কেবল আট। ঝড়ে মাঠের মাঝে ছিঁড়ে পড়ে ছিল বিদ্যুতের তার। অবুঝ মনে সেই তার স্পর্শ করতেই হন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট। সে যাত্রায় জীবন নিয়ে কোনো রকমে বেঁচে ফেরেন। তবে, কেটে ফেলতে হয় তার দুইটি হাত।

সেই রুবেল এখন ২৫ বছরের যুবক। শারীরিক অক্ষমতা নয়, মানসিক দৃঢ়তাকে নিজের জীবনের সঙ্গী করে নিয়েছেন তিনি। দুই পাকে সঙ্গী করে দিনাজপুরের হিলি শহরে ঘুরে ঘুরে ডালা গলায় নিয়ে করেন সিদ্ধ ডিম বিক্রি। পাশাপাশি করছেন ছাগল পালন। পঙ্গুত্ব তাকে ভিক্ষুক নয়, বানিয়েছে ব্যবসায়ী।

হিলি পৌর এলাকার জালালপুর গ্রামের বাসিন্দা রুবেল। বাবাকে হারিয়েছেন অনেক আগেই। এখন মা এবং স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে বসবাস তার।

এলাকাবাসী জানান, হাত না থাকায় রুবেলকে খাবার খাওয়ানো ও গোসল করানোর কাজ করেন তার মা। তিনি বিয়ে করেছেন। সংসারে একটি কন্যা সন্তানও আছে। ছোট বেলায় দুই হাত হারানো এই যুবক ভিক্ষার পরিবর্তে বেছে নিয়েছেন ব্যবসাকে। ছাগল পালনের পাশাপাশি তিনি প্রতিদিন সন্ধ্যায় হিলি শহরে গিয়ে গলায় ডালা ঝুলিয়ে সিদ্ধ ডিম বিক্রি করেন। নিজের জীবিকা তো বটেই, চালিয়ে নিচ্ছেন পরিবারের ভরণপোষণও।

রুবেল হোসেন জানান, সন্ধ্যা হলেই ডিমের ডালা গলায় ঝুলিয়ে হিলি শহরের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে সিদ্ধ ডিম বিক্রি করছেন। ডিমের খোসা ছিড়ে ক্রেতাদের দেওয়ার কোন উপায় নেই তার, কেননা হাত নেই। ক্রেতারাই খোসা ছাড়িয়ে ডিম কেনেন। টাকা পকেটে রাখেন। প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০টি ডিম বিক্রি করতে পারেন। তা থেকে দিনে লাভ আসে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা।

রুবেলের কাছ থেকে ডিম কিনছেন হিলি শহরের দুই বাসিন্দা

আইনুল হক নামে এক ব্যক্তি বলেন, “আমার বাড়ি পাঁচবিবিতে, হিলিতে এসেছি কাজে। দুই হাতবিহীন যুবককে গলায় ডালা ঝুলিয়ে ডিম বিক্রি করতে দেখে অবাকই হয়েছি। আমার খুব মায়া লেগেছে তার জন্য। নিজেই তার ডালা থেকে তিনটি ডিম নিয়ে খোসা ছাড়িয়ে খেলাম। সে তো ভিক্ষে করতে পারতো, কিন্তু ব্যবসা করছে। তার এই ইচ্ছে শক্তিকে আমি স্যালুট জানাই।”

লুৎফর রহমান বলেন, “দূর থেকে দেখলাম, গলায় ডালা ঝুলিয়ে এক ব্যক্তি ডিম বিক্রি করছেন। শীতের দিন তাই ডিম খেতে ইচ্ছা করল। কাছে এসে দেখি, ডিম ব্যবসায়ীর দুই হাতিই নেই। খুব খারাপ লাগল। নিজেই ডিম নিয়ে খোসা ছাড়িয়ে খেলাম। বিক্রেতার পকেটেই টাকা রেখেছি।”

হান্নান নামে হিলি ইমিগ্রেশন চেকপোস্টে এলাকার বাসিন্দা বলেন, “রুবেলকে আমরা চিনি। তার বাড়ি জালালপুরে। দুই হাত নেই, কোনো কাজ করার ক্ষমতাও নেই, তবুও তিনি ভিক্ষা করেন না। ডিমের ব্যবসা করে সংসার চলান। তার এই সংগ্রামী জীবন থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে।”

রুবেল হোসেন এই প্রতিবেদককে বলেন, “ছোট বেলায় কারেন্টে আমার দুই হাত নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক কষ্ট করে বড় হয়েছি। বাবা নেই, মা আছেন। দুই বছর হলো বিয়ে করেছি, একটা মেয়ে হয়েছে। সংসার বড় হয়েছে, বসে থাকলে তো হবে না। তাই ডিমের ব্যবসা করছি। সবাই আমার ব্যবসায় সহযোগিতা করেন। সিদ্ধ ডিম কিনে ক্রেতারা নিজেরাই খোসা ছাড়িয়ে খান। আমি ছোট থেকে পরিশ্রম করে আসছি, কারো কাছে সাহায্য চায়নি।”

তিনি বলেন, “অনেক আগে থেকেই পঙ্গু ভাতা পাচ্ছি। ব্যবসা করে আর ভাতার টাকা দিয়ে আল্লাহ আমার সংসার ভালই চালাচ্ছেন।”

ইউডি/মোসলেম উদ্দিন/কেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading