মাদুরোকে ট্রাম্পের তুলে নেওয়া কি ইরানে মার্কিন হামলার আশঙ্কা বাড়িয়ে দিল

মাদুরোকে ট্রাম্পের তুলে নেওয়া কি ইরানে মার্কিন হামলার আশঙ্কা বাড়িয়ে দিল

উত্তরদক্ষিণ। মঙ্গলবার, ০৬ জানুয়ারী, ২০২৬, আপডেট ০৯:০৫

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বৈঠকের এক সপ্তাহের কম সময়ের মধ্যে মাদুরোকে জোর করে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ওই বৈঠকে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে হামলা চালানোর হুমকিও দেন।

ওয়াশিংটনের সঙ্গে কারাকাস ও তেহরানের উত্তেজনার উৎস ও গতিপথ আলাদা হলেও বিশ্লেষকদের মতে, মাদুরোর বিরুদ্ধে ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

ন্যাশনাল ইরানিয়ান আমেরিকান কাউন্সিলের (এনআইএসি) প্রেসিডেন্ট জামাল আবদি বলেন, ‘একধরনের নতুন আইনহীনতা পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলছে এবং যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলছে।’

মাদুরোকে আমেরিকায় তুলে নিয়ে যাওয়ার এ ঘটনায় ইরানের মিত্রদের নিয়ে তৈরি করা ছোট নেটওয়ার্কটি আরও সংকুচিত হয়ে যেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে সিরিয়ায় নেতা বাশার আল-আসাদের পতন এবং লেবাননে হিজবুল্লাহ দুর্বল হয়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এটি এমনিতে ছোট হয়ে এসেছিল। আবদির মতে, ট্রাম্প যদি ‘নিশানাভিত্তিক হস্তক্ষেপের’ মাধ্যমে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের ধারণায় মুগ্ধ হয়ে পড়েন কিংবা একই ধরনের পদক্ষেপের জন্য নেতানিয়াহুকে আমেরিকার আনুষ্ঠানিক সমর্থন দেন, তাহলে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে যুদ্ধের জন্য চাপ দেওয়া ব্যক্তিদের অনেকে উৎসাহিত হবেন।

জামাল আবদির ধারণা, মাদুরোকে অপহরণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইরান বিভিন্ন সামরিক তৎপরতা শুরু করতে পারে। এর মধ্যে থাকতে পারে—নিজেদের সামরিক প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তোলা কিংবা আমেরিকা বা ইসরায়েলের সম্ভাব্য হামলার আগেই আগাম আঘাত হানা।

সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির জ্যেষ্ঠ ফেলো নেগার মোর্তাজাভি আল–জাজিরাকে বলেন, ‘তেহরানের বিষয়ে আমি যা দেখছি ও শুনছি, তাতে বোঝা যাচ্ছে, তারা ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনায় যেতে আগ্রহী নয়। কারণ, ট্রাম্প প্রশাসনের ইঙ্গিত হলো, তারা পুরোপুরি আত্মসমর্পণ চায়।’

মোর্তাজাভি আরও বলেন, ‘এই মুহূর্তে কূটনীতির সুযোগ খুবই কম। আর সেটাই আমাদের উল্টো পথে ঠেলে দিচ্ছে। আর তা হলো সংঘাতের পথ। এখন ইসরায়েল, ইরান ও আমেরিকা—তিন পক্ষই সম্ভাব্য সংঘাতের পথে এগোচ্ছে।’

ইরান–ভেনেজুয়েলা জোট
ভেনেজুয়েলার সরকারের বিরুদ্ধে কয়েক মাস ধরে কঠোর বক্তব্য ও হুমকি দিয়ে আসছিলেন ট্রাম্প। এরপর গত শনিবার শেষরাতে অভিযান চালিয়ে মাদুরোকে আমেরিকায় তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।

আমেরিকার কর্মকর্তাদের অভিযোগ, মাদুরো একটি মাদক চক্রকে নেতৃত্ব দেন। ট্রাম্প এবং তাঁর সহযোগীদের দাবি, ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলভান্ডারের ওপর ওয়াশিংটনের অধিকার আছে।

মাদুরোর সঙ্গে ইরানের সম্পর্কের বিষয়টিকে সামনে টেনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও অভিযোগ করেছেন, কারাকাস লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহকে পশ্চিম গোলার্ধে উপস্থিত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে; যদিও তিনি তাঁর এ দাবির পক্ষে প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি।

মাদুরো ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র। ব্যাপকভাবে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ভেনেজুয়েলা ও ইরান দুই দেশই ব্যবসায়িক সম্পর্ক আরও গভীর করার চেষ্টা করছে।

মাদুরোকে আমেরিকায় তুলে নিয়ে যাওয়ার এ ঘটনায় ইরানের মিত্রদের নিয়ে তৈরি করা ছোট নেটওয়ার্কটি আরও সংকুচিত হয়ে যেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে সিরিয়ায় নেতা বাশার আল-আসাদের পতন এবং লেবাননে হিজবুল্লাহ দুর্বল হয়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এটি এমনিতে ছোট হয়ে এসেছিল।

‘তেহরানের বিষয়ে আমি যা দেখছি ও শুনছি, তাতে বোঝা যাচ্ছে, তারা ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনায় যেতে আগ্রহী নয়। কারণ, ট্রাম্প প্রশাসনের ইঙ্গিত হলো, তারা পুরোপুরি আত্মসমর্পণ চায়।’ নেগার মোর্তাজাভি, সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির জ্যেষ্ঠ ফেলো ভেনেজুয়েলায় ওয়াশিংটনের অভিযানের পর ইরান সরকার দ্রুত আমেরিকার বিরুদ্ধে নিন্দা জানায়। ‘অবৈধ আগ্রাসন’ বন্ধ করতে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়।

আমেরিকার পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে

শনিবার মার্কো রুবিও ইঙ্গিত দেন, মাদুরোকে তুলে নেওয়ার ঘটনাটি ট্রাম্প আমলে ওয়াশিংটনের সব প্রতিপক্ষের জন্যই একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে।

আমেরিকার শীর্ষ এই কূটনীতিক সাংবাদিকদের বলেন, ‘যখন তিনি (ট্রাম্প) আপনাদের বলেন, তিনি কিছু করবেন বা কোনো সমস্যা মোকাবিলা করবেন, তখন তিনি সেটা করে দেখান।’

তবে কারাকাসে আমেরিকার অভিযানের পর ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি তাঁর কঠোর অবস্থান আরও জোরালো করেছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে খামেনি লেখেন, ‘আমরা শত্রুর কাছে মাথা নত করব না। আমরা শত্রুকে হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করব।’

ট্রাম্পের হুমকি
গত সপ্তাহে ট্রাম্প ফ্লোরিডায় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে আতিথ্য দেন। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ইরান যদি আবার ক্ষেপণাস্ত্র বা পারমাণবিক কর্মসূচি গড়ে তোলে, তাহলে আমেরিকা আবারও দেশটিতে বোমা হামলা চালাবে।

গত জুনে ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে হামলা শুরু করলে দেশটির শীর্ষ সামরিক কমান্ডার, কয়েকজন পরমাণুবিজ্ঞানী ও কয়েক শ বেসামরিক মানুষ নিহত হন। ওই হামলায় আমেরিকাও যোগ দেয়। তারা ইরানের তিনটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালায়।

ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন, আমেরিকার হামলায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি ‘ধ্বংস’ হয়ে গেছে এবং তিনি এই যুদ্ধকে সফল বলে উদ্‌যাপন করেছেন। তবে হামলার পরও ইরানের শাসনব্যবস্থা টিকে থাকে।

হামলার জবাবে তেহরান ইসরায়েলের দিকে শত শত রকেট ছোড়ে। এর মধ্যে কয়েক ডজন রকেট ইসরায়েলের বহুস্তরবিশিষ্ট আকাশ প্রতিরক্ষা ভেদ করে ভেতরে ঢুকে পড়ে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার ঠিক আগমুহূর্ত পর্যন্ত ইরানি বাহিনী পাল্টা হামলা চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

সমালোচকদের কারও কারও মতে, ইরানে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন করাটাই ছিল ইসরায়েলের মূল লক্ষ্য এবং তা এখনো রয়েছে। আর ট্রাম্প ধীরে ধীরে সেই লক্ষ্যকেই সমর্থন করছেন বলে মনে হচ্ছে।

গত শুক্রবার ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, ইরানে চলমান বিক্ষোভের মধ্যে যদি দেশটির সরকার বিক্ষোভকারীদের হত্যা করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র হামলার জন্য ‘পুরোপুরি প্রস্তুত’ আছে।

রবিবার রাতেও ট্রাম্প একই হুমকি দেন।

তাহলে আমেরিকায় কি ইরানে ভেনেজুয়েলার মতো সরকারপ্রধানকে সরিয়ে দেওয়ার অভিযান চালাতে পারে?

ন্যাশনাল ইরানিয়ান আমেরিকান কাউন্সিলের (এনআইএসি) প্রেসিডেন্ট জামাল আবদি উল্লেখ করেন, গত জুনেই ইসরায়েল ইরানের শীর্ষ নেতাদের হত্যার চেষ্টা করেছে। এর মধ্যে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও ছিলেন।

ট্রাম্প নিজেও একাধিকবার ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার হুমকি দেন। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, তাঁরা যুদ্ধের সময় খামেনিকে ‘উৎখাত’ করার চেষ্টা করেছিলেন।

সমালোচকদের কারও কারও মতে, ইরানে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন করাটাই ছিল ইসরায়েলের মূল লক্ষ্য এবং তা এখনো রয়েছে। আর ট্রাম্প ধীরে ধীরে সেই লক্ষ্যকেই সমর্থন করছেন বলে মনে হচ্ছে।
মাদুরো ছাড়া ভেনেজুয়েলা
ভেনেজুয়েলায় মাদুরোকে সরানো হলেও আপাতত তাঁর সরকারের পতন হয়নি। ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ বর্তমানে ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, মাদুরো এখনো দেশের একমাত্র নেতা। তিনি আমেরিকার হামলারও নিন্দা জানান।

রদ্রিগেজ আরও ইঙ্গিত দেন, ইসরায়েলও মাদুরোকে তুলে নেওয়ার এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিল। মাদুরো আমেরিকার মিত্রদেশগুলোর কঠোর সমালোচক।

ট্রাম্প ইতিমধ্যে রদ্রিগেজকে হুমকি দিয়েছেন। দ্য আটলান্টিক সাময়িকীকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আমেরিকার দাবিতে রাজি না হলে তাঁকে (রদ্রিগেজ) ‘বড় মূল্য চুকাতে হবে—সম্ভবত মাদুরোর চেয়েও বড়।’

এতে বোঝা যায়, ভেনেজুয়েলাকে ‘পরিচালনা’ এবং দেশটির তেল নেওয়ার বিষয়ে আমেরিকার পরিকল্পনা এখনো শেষ হয়নি। এর জন্য আরও বেশি করে সামরিক পদক্ষেপের প্রয়োজন হতে পারে।

তবে নেগার মোর্তাজাভি বলেন, ট্রাম্পের পছন্দের ধাঁচ হলো দ্রুত শক্তি প্রদর্শন। দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ নয়। তিনি ট্রাম্পের নির্দেশে দ্রুত সময়ের মধ্যে চালানো কয়েকটি অভিযানের কথা উল্লেখ করেন। সেগুলো হলো ২০১৯ সালে আইএস নেতা আবু বকর আল-বাগদাদিকে হত্যা, ২০২০ সালে ইরানের শীর্ষ জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যা এবং জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা।

মোর্তাজাভি আরও বলেন, ‘বেশির ভাগ মার্কিন নাগরিক দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে ক্লান্ত; বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে। তাই ট্রাম্প প্রশাসন জানে, এমন আরও যুদ্ধ চালানো হলে তা মার্কিন নাগরিকদের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলা যাবে না।’

তবে ট্রাম্প ইতিমধ্যেই ভেনেজুয়েলায় স্থল অভিযান চালানোর আশঙ্কার কথা বলেছেন।

ট্রাম্প বলেছেন, ‘স্থলসেনা পাঠাতে আমরা ভয় পাই না। এটা বলতে আমাদের আপত্তি নেই। তবে দেশটি যেন সঠিকভাবে পরিচালিত হয়, তা আমরা নিশ্চিত করব। আমরা এটাকে ব্যর্থ হতে দেব না।’

তবে এনআইএসির আবদি মনে করেন, ভেনেজুয়েলায় আমেরিকার দীর্ঘমেয়াদি সম্পৃক্ততা পরোক্ষভাবে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ ঠেকাতে পারে।

আবদি আল–জাজিরাকে বলেন, ‘এমনও হতে পারে, আমেরিকা ভেনেজুয়েলাকে “চালাতে” গিয়ে সেখানে এতটাই জড়িয়ে পড়বে যে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানো বা ইসরায়েলকে এমন যুদ্ধ শুরু করতে সমর্থন দেওয়ার মতো সময় ও সামর্থ্য তাদের থাকবে না।’

আবদি আরও বলেন, ‘২০০৩ সালে আমেরিকা ইরাকে আক্রমণ করার পর তালিকায় পরের দিকেই ইরানের নাম ছিল। আর আমরা জানি এরপর কী হয়েছিল। ট্রাম্প হয়তো এখনই “মিশন সম্পন্ন” ঘোষণা করতে চাইবেন না।’

তেল প্রসঙ্গ
রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য মারজরি টেইলর গ্রিনের মতো কয়েকজন সমালোচক মনে করেন, আমেরিকা যদি ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদ নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়, তাহলে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ হলেও জ্বালানির বাজারে এর প্রভাব ঠেকানো যাবে।

বিশ্বের মোট তেলপ্রবাহের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে আনা–নেওয়া করা হয়। সর্বাত্মক যুদ্ধ বেধে গেলে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে।

আবদির মতে, পারস্য উপসাগরের রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হলে ভেনেজুয়েলার তেল তত্ত্বগতভাবে উপশম হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, এর জন্য আমেরিকাকে ভেনেজুয়েলায় অনেক কিছু ঠিকভাবে করতে হবে।

ইউডি/রেজা

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading