ভূমি নিবন্ধন: রেজিস্ট্রেশন ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিতে এবারও বাধা
উত্তরদক্ষিণ। শনিবার, ১০ জানুয়ারী, ২০২৬, আপডেট ১৯:৫০
ভূমি সংক্রান্ত সেবা সহজ করতে ভূমি নিবন্ধন কার্যক্রমকে আইন মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে নেওয়ার উদ্যোগ আবারও বাধার মুখে পড়েছে।
জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশ এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব থাকা সত্ত্বেও আইন মন্ত্রণালয় ও নিবন্ধন অধিদপ্তরের আপত্তি কারণে বিষয়টি এগোচ্ছে না। ফলে এক ছাতার নিচে ভূমি সেবা আনার দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা আবারও অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
ভূমি রেজিস্ট্রেশন বা নিবন্ধনের ক্ষেত্রে মানুষের ভোগান্তি বহু দিনের পুরনো। ভোগান্তি কমাতে ভূমি নিবন্ধন বিভাগকে আইন মন্ত্রণালয় থেকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিতে সাধারণ মানুষের দাবি অনেক দিনের। কিন্তু, রাজনৈতিক সরকারগুলোর সময় আইন মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টদের বাধায় সেটি কখনো বাস্তবায়ন হয়নি।
তবে অনেকেরই প্রত্যাশা ছিল নির্দলীয় অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এ বিষয়টি সুরাহা হবে। ভূমি রেজিস্ট্রেশন ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে যাবে, একটি জায়গা থেকে মানুষ ভূমি সংক্রান্ত সকল সেবা পাবে। এ বিষয়ে আলোচনাও চলছিল। জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন ভূমি নিবন্ধন সেবা ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে নেওয়ার সুপারিশও করেছিল। ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল।
কিন্তু বরাবরের মতো বাদ সেধেছে আইন মন্ত্রণালয় ও নিবন্ধন অধিদপ্তর। আইন মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়া ভূমি মন্ত্রণালয় কেন নিবন্ধন বিভাগকে নিজেদের অধীনে নিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের চিঠি পাঠিয়েছে, মৌখিকভাবে সেই ব্যাখ্যা চেয়েছে আইন মন্ত্রণালয়। তাই শেষ পর্যন্ত আর এ বিষয়টি আলোর মুখ দেখবে না বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রতিবেদন দেয় জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন।
ভূমি রেজিস্ট্রেশনকে আইন মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে নেওয়ার সুপারিশ করে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন।
ভূমি সংক্রান্ত যাবতীয় কাজ ভূমি মন্ত্রণালয় করলেও রেজিস্ট্রেশনের কাজ আইন মন্ত্রণালয় করে থাকে। ফলে ভূমি রেজিস্ট্রেশনের জন্য দুটি মন্ত্রণালয়ে দৌড়ঝাঁপ করতে হয়। কমিশন মনে করে, এক মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হলে জনগণের হয়রানি বহুলাংশে কমে আসবে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েও ভূমি মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি ভূমি নিবন্ধন সেবাকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনার সুপারিশ করেছিল।
জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশের পর এই বিষয়টি নিয়ে উপদেষ্টা পরিষদ বৈঠকেও অনানুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা হয়। এরপর এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে একটি চিঠি পাঠানো হয়।
ভূমি মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, চিঠি পাঠানোর কারণে ক্ষুব্ধ হন আইন মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায় থেকে। আইন মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায়ের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে কেন চিঠি পাঠানো হয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের কাছে তার সেই জবাব চেয়েছেন বলে জানা গেছে।
এছাড়া আইন মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টদের বাধায় এ বিষয়ে উপদেষ্টা পরিষদে প্রস্তাব উঠানোর কথা থাকলেও তা সম্ভব হয়নি বলে জানা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভূমি মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা বাংলা পোস্ট জানান, প্রতিটি মানুষ ভূমির সাথে সম্পৃক্ত। তাই ভূমি সেবা এক ছাতার নিচে আনার লক্ষ্যে এবং দেশ ও জনগণের সুবিধার্থে আমরা চেয়েছিলাম ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে সাব-রেজিস্ট্রি নিয়ের আসার প্রস্তাব মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হয়েছিল কিন্তু আইন মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে বলা হয়েছে, কেন উনার অনুমতি ছাড়া প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। সেজন্য আর কাজ হচ্ছে না বলে মনে হচ্ছে। যেহেতু সরকারের আমলে যেহেতু হয়নি। রাজনৈতিক সরকারের আমলে হওয়ায় সুযোগ কম।
ভূমি মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মানুষের হয়রানি কমাতে ভূমি সেবা ডিজিটাল করা হয়েছে। এখন মানুষ ভূমি অফিসে না গিয়েও ভূমি সেবা নিতে পারছেন। এতে ভূমি অফিসের দুর্নীতি অনেকটাই কমে গেছে। কিন্তু ভূমি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে মানুষকে এখনো ভোগান্তি পোহাতে হয়। ভূমি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে আর্থিক অনিয়ম স্থায়ী রূপ লাভ করেছে। ভূমি রেজিস্ট্রেশন এখনো আগের মতোই রয়ে গেছে।
ভূমি নিবন্ধন ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে আসলে এ সেবাটিকেও অনলাইন ভিত্তিক করার চিন্তা-ভাবনা রয়েছে। এতে মানুষের হয়রানি কমবে, দুই জায়গায় দৌড়াতে হবে না। কারণ ভূমি নিবন্ধনের পর নামজারি সহ পরবর্তী সকল কাজের জন্য মানুষকে ভূমি অফিসে যেতে হয়।
তবে ভূমি রেজিস্ট্রেশন ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনার উদ্যোগকে আইনি প্রক্রিয়ার লঙ্ঘন হিসেবে দেখছেন আইন মন্ত্রণালয় ও নিবন্ধন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। তাদের দাবি, ২০০৮ সাল থেকে এই সংক্রান্ত একটি রিট মামলা উচ্চ আদালতে বিচারাধীন থাকায় বর্তমানে এটি আইনগতভাবে স্থানান্তর করার সুযোগ নেই।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ২০০৭ সালে তৎকালীন অর্থ বিভাগের এই সংক্রান্ত একটি সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপটে জনস্বার্থে উচ্চ আদালতে রিট (নং ২৫১-২০০৮) করা হয়। ২০০৮ সালের ১৩ মার্চ আদালত এক আদেশে জানায়, রিটটি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নিবন্ধন অধিদপ্তর স্থানান্তরের প্রক্রিয়া স্থগিত থাকবে। এই অবস্থায় ভূমি নিবন্ধন সেবাকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে নেওয়ার প্রস্তাব তোলাকে আদালত অবমাননার শামিল বলে মনে করছেন বাংলাদেশ রেজিস্ট্রেশন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা।
অন্যদিকে মাঠ পর্যায়ের সাব-রেজিস্ট্রারদের অভিযোগ, ভূমি অফিসগুলোতে বর্তমানে নামজারিসহ বিভিন্ন সেবায় জনভোগান্তি চরম পর্যায়ে রয়েছে। এমতাবস্থায় নিবন্ধন বিভাগকেও সেখানে যুক্ত করা হলে সাধারণ মানুষের হয়রানি আরও কয়েকগুণ বাড়বে। বর্তমানে ১৭টি অফিসে পরীক্ষামূলকভাবে ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন বা অটোমেশন সেবা সফলভাবে চলছে এবং সারা দেশে এটি চালুর প্রক্রিয়াধীন।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এ এস এম সালেহ আহমেদ বাংলা পোস্ট কে বলেন, বাংলাদেশে ভূমি ব্যবস্থাপনায় জটিলতার অন্যতম বড় কারণ হলো ভূমি প্রশাসন ও ভূমি রেজিস্ট্রেশনের দ্বৈত নিয়ন্ত্রণ। বর্তমানে ভূমি প্রশাসন ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীন হলেও ভূমি রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম পরিচালিত হয় আইন মন্ত্রণালয়ের অধীন। এই বিভাজন প্রশাসনিক অসামঞ্জস্য সৃষ্টি করেছে এবং ভূমি ব্যবস্থাপনাকে আরও দুরূহ করে তুলেছে।
তিনি আরও বলেন, আমরা জনগণের জন্য কাজ করি। জনগণের দুর্ভোগ লাঘবের জন্য আমাদের সকলকে একসাথে কাজ করতে হবে। এখানে কে কোন মন্ত্রণালয় কাজ করছেন সেটা মুখ্য নয়, মুখ্য বিষয় হচ্ছে জনগণকে কতটুকু সেবা দিতে পেরেছি। ভূমি রেজিস্ট্রেশন মূলত ভূমি ব্যবস্থাপনারই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। জমির মালিকানা হস্তান্তর, দলিল সম্পাদন, নামজারি ও খতিয়ান সংশোধন সবকিছুই একই ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত। অথচ একই প্রক্রিয়ার দায়িত্ব যখন ভিন্ন ভিন্ন মন্ত্রণালয়ের হাতে থাকে, তখন তথ্যের সমন্বয় ব্যাহত হয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব ঘটে এবং দুর্নীতির সুযোগ বাড়ে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ভূমি রেজিস্ট্রেশন আনা হলে একটি একক কর্তৃত্ব ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা সম্ভব হবে। এতে ভূমি সংক্রান্ত সব তথ্য এক প্ল্যাটফর্মে সংরক্ষণ ও যাচাই করা সহজ হবে। ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়নও আরও কার্যকর হবে। একই সঙ্গে দলিল জালিয়াতি, দ্বৈত নিবন্ধন ও কাগজপত্রের অসামঞ্জস্যতা অনেকাংশে কমে আসবে বলেও জানান ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব।
তিনি আরও বলেন, ভূমি সংক্রান্ত সব কার্যক্রমকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনতে হলে, ভূমি রেজিস্ট্রেশনকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীন করা হলে, ভূমি ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরবে, দুর্নীতি কমবে।
ইউডি/এআর

