যে কারণে ইরানে হামলা চালাতে ভয় পাচ্ছেন ট্রাম্প
উত্তরদক্ষিণ। বুধবার, ১৪ জানুয়ারি, ২০২৬, আপডেট ২০:৪২
ইরানে চলমান গণবিক্ষোভ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু ওয়াশিংটন বাস্তবে কেন ইরানে সরাসরি হামলা চালাতে পিছিয়ে থাকছে—তা নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন।বিশ্লেষকদের মতে, কৌশলগত, রাজনৈতিক ও আইনি— একাধিক জটিলতার কারণেই ট্রাম্পের হুমকি এখনো বাস্তব রূপ পায়নি।ট্রাম্পের যুদ্ধংদেহী বক্তব্য সত্ত্বেও পেন্টাগন এখনো মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত বিমানবাহী রণতরী বা বড় সামরিক প্রস্তুতি নেয়নি। বরং সাম্প্রতিক সময়ে অঞ্চলটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি কিছুটা কমানো হয়েছে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান।এদিকে, গত বছর ইসরায়েলের সঙ্গে হওয়া ১২ দিনের যুদ্ধে ইরানের পাল্টা হামলার অভিজ্ঞতা থাকা উপসাগরীয় মিত্র রাষ্ট্রগুলোও ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন হামলার জন্য নিজেদের ঘাঁটি ব্যবহারে অনাগ্রহী।ইরানে হামলা চালাতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে কাতার, বাহরাইন, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান কিংবা সৌদি আরবের ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি নিতে হবে। এমনকি সাইপ্রাসে যুক্তরাজ্যের আকরোটিরি ঘাঁটির কথাও ভাবতে হতে পারে। কিন্তু এসব ঘাঁটি ব্যবহার করলে ইরানের পাল্টা হামলার ঝুঁকি এবং স্বাগতিক দেশগুলোর নিরাপত্তা বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে।আরেকটি বিকল্প হতে পারে দূরপাল্লার বি-২ বোমারু বিমানের মাধ্যমে হামলা—যেমনটি গত জুনে ইরানের ফোরদো পারমাণবিক স্থাপনায় চালানো হয়েছিল। তবে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এ ধরনের হামলা অতিরিক্ত প্রাণহানি ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ডেকে আনতে পারে।যদিও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে ইরানের সামরিক সক্ষমতা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে। তবুও দেশটির হাতে এখনো সীমিত কিন্তু কার্যকর ক্ষেপণাস্ত্র ক্ষমতা রয়েছে।ইসরায়েলি ও মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ইরানের কাছে প্রায় ২ হাজার ভারি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আছে, যেগুলোর অনেকগুলো পাহাড়ের গভীরে সুরক্ষিত উৎক্ষেপণস্থলে রাখা।সেক্ষেত্রে যদি যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্ররা ইরানে হামলা চালায়, তাহলে এসব ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে মার্কিন ঘাঁটি ও নৌজাহাজে পাল্টা আঘাত হানার হুমকি দিয়েছে তেহরান।আরেকটি বড় সমস্যা হলো— কোন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হবে। ইরানের বিক্ষোভ ও দমন-পীড়ন দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকায় হামলার জন্য শুধু সামরিক বা সরকারি স্থাপনা বেছে নেওয়াও কঠিন। ভুল লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত লাগলে বেসামরিক হতাহতের আশঙ্কা অত্যন্ত বেশি।বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও শাসকগোষ্ঠীর জন্য একটি জাতীয়তাবাদী সমাবেশের সুযোগ তৈরি করতে পারে। ১৯৫৩ সালের মার্কিন হস্তক্ষেপের স্মৃতি কাজে লাগিয়ে সরকার সহজেই অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভকে ‘বিদেশি ষড়যন্ত্র’ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে।রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক রক্সান ফারমানফারমাইয়ান বলেন, ‘ইরানে এখনো একটি সংহত সরকার, সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা কাঠামো রয়েছে। সরকার দেখিয়ে দিচ্ছে—রাস্তাঘাট ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে তারা কোনো ছাড় দেবে না।’কিছু মহলে খামেনিকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করার কথাও আলোচনায় এসেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, অন্য দেশের রাষ্ট্রপ্রধান বা সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করা আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন, যা দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ ডেকে আনতে পারে। তাছাড়া এতে শাসনব্যবস্থার পতন নিশ্চিত নয়—কারণ খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে ইতোমধ্যেই কয়েকজন শীর্ষ আলেমের নাম প্রস্তুত রাখা হয়েছে।সব মিলিয়ে, কড়া কড়া হুমকি সত্ত্বেও ইরানে সরাসরি সামরিক হামলা চালানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উচ্চ ঝুঁকি, সীমিত লাভ এবং বড় কূটনৈতিক খরচের বিষয় হয়ে দাঁড়াতে পারে। এ কারণেই ট্রাম্পের বক্তব্য বাস্তব রূপ নাও পেতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
ইউডি/এআর

