যেভাবে প্রতিযোগিতায় নেমেছে রাশিয়া, আমেরিকা ও চীন

যেভাবে প্রতিযোগিতায় নেমেছে রাশিয়া, আমেরিকা ও চীন

উত্তরদক্ষিণ। শনিবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০২৬, আপডেট ১৬:৩০

‘পশ্চিম গোলার্ধে আমেরিকার আধিপত্য আর কখনোই প্রশ্নবিদ্ধ হবে না’- ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আমেরিকা আটক করার পর এ ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর যখন ট্রাম্প ওয়াশিংটনের শক্তি প্রদর্শন করছেন; চীন ও রাশিয়াও তাদের নিজস্ব প্রভাববলয়কে সুসংহত ও সম্প্রসারণের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এই তিনটি দেশই একটি নতুন বৈশ্বিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাইছে, যার প্রভাব ইউরোপসহ অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির ওপরও পড়তে পারে।

আমরা বিশ্লেষণ করছি- কীভাবে আমেরিকা, চীন এবং রাশিয়া সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে শুধু প্রতিবেশী রাষ্ট্র নয়, আরও দূরের দেশগুলোতেও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে।

‘ক্ষমতা দ্বারা শাসিত’ এক বিশ্ব

ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে আমেরিকা বর্তমানে তার পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলকে পুনর্নির্ধারণ ও পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে- যেখানে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে পশ্চিম গোলার্ধকে। সাম্প্রতিক সময়ে ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান, দুই দল থেকেই নির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্টদের ধারণায় একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ফুটে ওঠে, যারা আমেরিকার শক্তি ও প্রভাবকে আরও বৈশ্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতেন।

ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, এটি ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির বাস্তবায়ন, যেখানে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে এমন বিষয়গুলোকে, যেমন অভিবাসন, অপরাধ ও মাদক পাচার—যেগুলো সরাসরি আমেরিকান নাগরিকদের জীবনে প্রভাব ফেলে।

ট্রাম্পের শীর্ষ উপদেষ্টা স্টিফেন মিলার সাম্প্রতিক মন্তব্যে বলেছেন, বিশ্ব এখন ‘শক্তি দ্বারা শাসিত, প্রভাব দ্বারা শাসিত, ক্ষমতা দ্বারা শাসিত’- যা ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে হেনরি কিসিঞ্জার ও রিচার্ড নিক্সনের বাস্তববাদী, আদর্শহীন পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে তুলনার অবকাশ তৈরি করতে পারে। তবে এর সঙ্গে সবচেয়ে মিল হতে পারে বিংশ শতকের শুরুতে প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম ম্যাককিনলি ও থিওডোর রুজভেল্টের আমেরিকান সাম্রাজ্য সম্প্রসারণের নীতি।

৮২৩ সালের ‘মনরো নীতি’, যা ইউরোপীয় শক্তির হস্তক্ষেপ থেকে পশ্চিম গোলার্ধকে মুক্ত রাখার কথা বলেছিল—তার ভিত্তিতে রুজভেল্ট দাবি করেন, আমেরিকাকে পুরো আমেরিকা মহাদেশে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।

সে সময় আমেরিকা ভেনেজুয়েলা ও ডোমিনিকান রিপাবলিকের মতো দেশগুলোকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছিল এবং হাইতি ও নিকারাগুয়ায় মার্কিন সেনা মোতায়েন করেছিল।

দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার নিকটবর্তী ভৌগোলিক অঞ্চল ও ইস্যুতে গভীর আগ্রহ দেখিয়ে আসছেন। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার সামরিক অভিযানটি এর সবচেয়ে নাটকীয় উদাহরণ; তবে এর আগে ছিল ক্যারিবীয় সাগরে সন্দেহভাজন মাদকবাহী নৌযানে মার্কিন হামলা, লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর ওপর শুল্ক চাপানো, বিভিন্ন দেশের জাতীয় নির্বাচনে নির্দিষ্ট প্রার্থী ও দলের পক্ষে সমর্থন, এবং পানামা খাল, গ্রিনল্যান্ড ও কানাডার সম্পূর্ণ অংশ যুক্ত করার দাবি।

হোয়াইট হাউজের সদ্য প্রকাশিত জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে বলা হয়েছে, আমেরিকাকে পশ্চিম গোলার্ধে সবার চেয়ে এগিয়ে থাকতে হবে, যা আমাদের নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির শর্ত। এটি আমাদেরকে আঞ্চলিক প্রয়োজনে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পদক্ষেপ নিতে সক্ষম করে।

নতুন এই আন্তর্জাতিক কৌশলের একটি অংশ হলো বিদেশি শক্তিগুলোর বিশেষত চীনের- আমেরিকার আঞ্চলিক প্রতিবেশীদের ওপর প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টাকে প্রতিরোধ করা। এখানেই আমেরিকার প্রভাববলয়কে কেন্দ্র করে নেওয়া নতুন দৃষ্টিভঙ্গি বৈশ্বিক রাজনীতির সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে।

এছাড়া, ট্রাম্প বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে শান্তি চুক্তি করানোর আগ্রহ দেখিয়েছেন এবং সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো আরব দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক জোরদার করার ব্যাপারেও বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

ট্রাম্প ও তার ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টারা জোর দিয়ে বলেছেন যে, আমেরিকা হলো পশ্চিমা সভ্যতার রক্ষক, এমন সব শক্তির বিরুদ্ধে; যারা এর সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ক্ষয় করতে চায়।

এসব কিছুই ইঙ্গিত করে যে, আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতির কৌশলগত ভিত্তি যদিও নতুন এক ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সম্পর্কিত, তবু ট্রাম্পের ব্যক্তিগত মতামত ও আগ্রহই আমেরিকার আন্তর্জাতিক এজেন্ডাকে চালিত করতে থাকবে।

আমেরিকার ২৫০ বছরের ইতিহাসে এর পররাষ্ট্রনীতি বিভিন্ন সময়ে বিচ্ছিন্নতাবাদ থেকে হস্তক্ষেপ এবং আবার সেখান থেকে ফিরে আসার মধ্য দিয়ে পরিবর্তিত হয়েছে, যেখানে আদর্শবাদ ও বাস্তববাদের ভিন্নমাত্রার মিশেল ছিল, আর যা নির্ভর করেছে আমেরিকার সামরিক শক্তি এবং জনগণ ও নেতৃত্বের স্বার্থের ওপর।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে পরিস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বদলাতে দেখা গেলেও দীর্ঘমেয়াদে আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতির এসব চক্র বা পরিবর্তন শেষ হয়ে গেছে- এমন কোনো প্রমাণ নেই।

চীনের ‘মহা পুনর্জাগরণ’

চীনের বৈশ্বিক প্রভাব কোনো নির্দিষ্ট ‘প্রভাববলয়’ বা অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নয়। দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগর থেকে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া, বিস্তৃত মধ্যপ্রাচ্য, লাতিন আমেরিকা, এমনকি এদের মাঝামাঝিও- বিশ্বের প্রায় প্রতিটি প্রান্তেই এখন বেইজিংয়ের উপস্থিতি অনুভূত হচ্ছে।

বৈশ্বিক আধিপত্যের লক্ষ্যে চীন তার প্রধান সক্ষমতা, উৎপাদনশীলতাকে ব্যবহার করেছে। বিশ্বের মোট উৎপাদিত পণ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তৈরি হয় চীনে, যার মধ্যে রয়েছে আমাদের পকেটে থাকা প্রযুক্তিপণ্য, আলমারির পোশাক এবং টিভি দেখতে বসলে যেসব আসবাবপত্র ব্যবহার করি সেগুলোও।

বেইজিং ভবিষ্যতকে নিজের দখলে রাখতে বিশ্বের ‘রেয়ার আর্থ’ বা বিরল খনিজের বৃহত্তম অংশ নিশ্চিত করে নিজেদের শীর্ষস্থানে নিয়ে গেছে। এই খনিজগুলো প্রযুক্তিপণ্য তৈরির জন্য অপরিহার্য, যেমন স্মার্টফোন, বৈদ্যুতিক গাড়ি, বায়ু বিদ্যুৎচালিত টারবাইন এবং সামরিক অস্ত্র।

চীন বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ বিরল খনিজ প্রক্রিয়াজাত করে এবং সম্প্রতি এই প্রভাববলয় ব্যবহার করেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে, গত বছরের আমেরিকা-চীন বাণিজ্যযুদ্ধের সময় রপ্তানি সীমিত করে। সম্ভবত এ কারণেই ওয়াশিংটনের দৃষ্টি পড়েছে গ্রিনল্যান্ডসহ অন্যান্য স্থানের খনিজ সম্পদের দিকে। দুটি পরাশক্তি যেন সম্পদ সুরক্ষার প্রতিযোগিতায় নেমেছে।

এটি গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের জন্য এক বিশাল পরিবর্তন যে, দেশটি ২০০০ সালে আমেরিকার আধিপত্যের অধীন বিশ্বে ছিল একটি তুলনামূলক গৌণ শক্তি।

প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২০২৬ সালের দিকে অগ্রসর হতে হতে বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ এবং এক সম্প্রসারণশীল সামরিক শক্তির সহায়তায় নিজেকে উদীয়মান বৈশ্বিক নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর একটি থেকে শিল্প ও প্রযুক্তিখাতে নেতৃত্বস্থানীয় শক্তি হয়ে ওঠার চীনের এই উত্থান অনেক উদীয়মান অর্থনীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। তাদের কাছে এটি পশ্চিমীকরণ ছাড়া আধুনিকায়নের একটি উদাহরণ, যেখানে রাষ্ট্র ও দেশগুলো পশ্চিমা রাজনৈতিক ব্যবস্থা বা পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ না করেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে এগোতে পারে।

এটি কার্যকর কৌশল হিসেবেও প্রমাণিত হয়েছে। ২০০১ সালে বিশ্বের ৮০ শতাংশেরও বেশি অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের তুলনায় বেশি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য করত। এখন বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ অর্থনীতি আমেরিকার তুলনায় চীনের সঙ্গে বেশি বাণিজ্য করছে।

বেইজিং উন্নয়নকেও অগ্রাধিকার দিয়েছে এবং তার বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অংশ হিসেবে উদীয়মান অর্থনীতিগুলোতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। এটি এক বিশাল বৈশ্বিক অবকাঠামো প্রকল্প, যার লক্ষ্য এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকাকে স্থল ও সমুদ্রপথে যুক্ত করা চীনা বিনিয়োগে নির্মিত বন্দর, রেলপথ, সড়ক ও জ্বালানি প্রকল্পের মাধ্যমে।

এর ফলে বেশ কয়েকটি দেশ ক্রমশই বেইজিংয়ের প্রতি ঋণনির্ভর হয়ে পড়েছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা অভিযান শেষে অন্যতম বড় প্রশ্ন ছিল- এটি কি চীনকে তাইওয়ান আক্রমণের ধারণা দেবে? কিন্তু, চীন স্বশাসিত এই দ্বীপটিকে নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে দেখে- একটি বিচ্ছিন্ন প্রদেশ, যা একদিন মাতৃভূমির সঙ্গে পুনরায় যুক্ত হবে।

শি জিনপিং দ্বীপটিতে আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিলে তা আমেরিকা নজির স্থাপন করেছে বলেই হবে, এমন নয় বিষয়টা। বরং অধিকাংশ বিশ্লেষক মনে করেন, চীন তার বর্তমান কৌশলই চালিয়ে যাবে। অর্থাৎ চাপ প্রয়োগ করে তাইওয়ানের জনগণকে ক্লান্ত করে তোলা, যার লক্ষ্য হলো তাইওয়ানকে আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসা।

শি জিনপিংয়ের স্বপ্ন সবসময়ই ছিল চীনা জাতির ‘মহা পুনর্জাগরণ’। গত বছরের সামরিক কুচকাওয়াজে যখন তিনি সৈন্যদের দিকে তাকিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়েছিলেন, তিনি বলেছিলেন— চীনের উত্থান ‘অপ্রতিরোধ্য’।

তিনি এমন এক বিশ্ব চান, যা বেইজিংকে সম্মান করে ও অনুসরণ করে এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে বৈশ্বিক অস্থিরতাকে ‘রূপান্তরের সময়’ হিসেবে দেখেন। তিনি একে একটি সুযোগ হিসেবে দেখবেন। তার বার্তা হলো— বিশ্ব এখন এক সংক্রমণের মোড়ে দাঁড়িয়ে এবং চীনই পথ দেখানোর সর্বোত্তম অবস্থানে রয়েছে।

রাশিয়ার ‘নিকট প্রতিবেশ’

কথাটিকে বিখ্যাত বা কুখ্যাত দুইভাবেই ব্যাখ্যা করা যেতে পারে; আর সেটি হলো— ভ্লাদিমির পুতিন যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনকে বলেছিলেন ‘বিশ শতকের সবচেয়ে বড় ভূ-রাজনৈতিক বিপর্যয়’।

এটি রাশিয়ায় প্রচলিত ‘নিকট প্রতিবেশ’ ধারণা সম্পর্কে ১৯৯০-এর দশকে স্বাধীন হওয়া সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রগুলোর বিষয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়।

অনেকের কাছে এই পরিভাষাটিই ইঙ্গিত করে যে, এসব রাষ্ট্র যেন ‘দূর প্রতিবেশের’ দেশগুলোর তুলনায় স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে কম অধিকার রাখে।

এই চিন্তাধারা, যা ক্রেমলিনের মতাদর্শ গঠন করে— এমন একটি মানে তৈরি করে যে এসব দেশে রাশিয়ার বৈধ স্বার্থ রয়েছে এবং সেগুলো রক্ষা করার অধিকারও রয়েছে।

এর প্রভাববলয়ের পরিধি একটি অস্পষ্ট ধারণা এবং ক্রেমলিন ইচ্ছাকৃতভাবে এ নিয়ে অস্পষ্ট অবস্থান বজায় রেখেছে।

প্রেসিডেন্ট পুতিন একবার বলেছিলেন, ‘রাশিয়ার সীমানার শেষ নেই’ এবং তার সম্প্রসারণবাদী নীতির কিছু সমর্থকের কাছে রাশিয়ার প্রভাববলয় বলতে ঐতিহাসিকভাবে রুশ সাম্রাজ্যের অংশ হওয়া সব অঞ্চল, এমনকি তার চেয়েও বেশি এলাকা বোঝায়। এ কারণেই মস্কো ইউক্রেনের অন্তর্ভুক্ত অঞ্চলগুলোকে ‘ঐতিহাসিক অঞ্চল’ বলে উল্লেখ করে।

কাগজে-কলমে ক্রেমলিন সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র ও এমন দেশগুলোর সার্বভৌমত্বকে সম্মান করে, যেগুলোতে তাদের ‘স্বার্থ’ রয়েছে বলে তারা দাবি করে। তবে বাস্তবে, এসব দেশ রাশিয়ার প্রভাববলয় থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করলে মস্কোর অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ প্রয়োগের দীর্ঘ রেকর্ড রয়েছে।

ইউক্রেন এ বিষয়টি কঠিনভাবেই শিখেছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার পর এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশটি এমন নীতি অনুসরণ করে, যা মূলত ক্রেমলিনের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল এবং ক্রিমিয়ার কৃষ্ণ সাগর উপকূলে একটি বড় রুশ নৌঘাঁটিও সেখানে ছিল।

সম্পর্কটি মসৃণ ছিল; যতদিন না ইউক্রেন সংস্কারমুখী, পশ্চিমপন্থি প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইউশচেঙ্কোকে নির্বাচিত করে। তার আমলে ২০০৬ ও ২০০৯ সালে রাশিয়া দুইবার গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেয়।

অর্থনৈতিক চাপ ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ব্যর্থ হলে রাশিয়া ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া আক্রমণ করে এবং অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণ নেয়, পরে ২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আক্রমণ চালায়।

একইভাবে, ২০০৮ সালে রাশিয়া জর্জিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে যখন দেশটির নেতৃত্বে ছিলেন সংস্কারপন্থি প্রেসিডেন্ট মিখাইল সাকাশভিলি। এর ফলে জর্জিয়ার প্রায় ২০ শতাংশ ভূখণ্ডে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত ও সম্প্রসারিত হয়। এরপর থেকে রুশ সেনারা ‘ক্রিপিং অকুপেশন’ নামে পরিচিত এক প্রক্রিয়ায় ধীরে ধীরে জর্জিয়ার ভেতরের দিকে সীমান্ত চিহ্ন ও কাঁটাতারের বেড়া ঠেলে দিচ্ছে।

পশ্চিমা বিশ্ব ২০০৮ সালে জর্জিয়া ও ২০১৪ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের প্রতিক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য কিছু না করায় পুতিনের বিশ্বাস আরও জোরালো হয় যে ‘নিকট প্রতিবেশ’ তার জন্য গ্রহণযোগ্য লক্ষ্য।

উল্লেখযোগ্য যে, ইউক্রেন ও জর্জিয়া মস্কোর রাজনৈতিক আধিপত্য ঠেকানোর চেষ্টা করায় সামরিক হস্তক্ষেপ ঘটে। কিন্তু সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রগুলোর মধ্যে কিছু এখনো রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি দেশ বেলারুশ, তাজিকিস্তান, কিরগিজস্তান, কাজাখস্তান ও আর্মেনিয়া এখনো রুশ সেনাদের আতিথ্য দিচ্ছে।

ইউক্রেন ও জর্জিয়ার সমস্যা শুরু হয়েছিল তখনই, যখন তারা এমন সরকার নির্বাচন করেছিল যারা গণতান্ত্রিক সংস্কার বাস্তবায়ন এবং পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলে রাশিয়ার প্রভাববলয় থেকে বেরিয়ে আসার আকাঙ্ক্ষা ঘোষণা করেছিল।

এরপর যা ঘটেছে; তা নতুন কিছু নয়। ইতিহাসে স্বার্থ রক্ষার দাবি বা জাতিগত সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার অজুহাতে বহু যুদ্ধ হয়েছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এবং পরে ঠান্ডা যুদ্ধের অবসানে, বৈশ্বিক সম্প্রদায়কে সমঅধিকারভিত্তিক এক ভূ-রাজনৈতিক কাঠামোয় রূপান্তর করার বড় প্রচেষ্টা ছিল রাষ্ট্রের আকার বা অস্ত্রভাণ্ডার যাই হোক না কেন। কিন্তু. প্রভাববলয়ের পুনরুত্থান আমাদের সবাইকে অতীতের আরও অন্ধকার সময়ের দিকে ফিরিয়ে নিতে পারে।

ইউডি/রেজা

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading