জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে যেসব প্রতিশ্রুতি দিলেন তারেক রহমান
উত্তরদক্ষিণ। সোমবার, ০৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, আপডেট ২১:৫০
আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারে দেওয়া এই ভাষণে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনায় গেলে দুর্নীতি দমন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনে গুচ্ছ প্রতিশ্রুতির কথা তুলে ধরেন।তারেক রহমান বলেন, জনগণের কাছে রাষ্ট্র এবং সরকারকে দায়বদ্ধ রাখার কোনো বিকল্প নেই।
আপনাদের কাছে আমার অঙ্গীকারের কারণ আপনারাই বিএনপির সব রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস। ফ্যাসিবাদ আমলে ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি তথাকথিত আমি ডামি নির্বাচনে আমি আপনাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছিলাম ৭ জানুয়ারি সারাদিন পরিবারকে সময় দেবেন।
বর্তমানে ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন এবার দেশবাসীর প্রতি আমার আহ্বান, আপনাদের প্রতি আমার বিনীত আবেদন ১২ ফেব্রুয়ারি সারাদিন ধানের শীষে ভোট দিন। তারুণ্যের প্রথম ভোট ধানের শীষের জন্য হোক।
তিনি বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি আপনারা ধানের শীষের প্রার্থীদের দায়িত্ব নিন। ১৩ তারিখ থেকে আপনাদের নির্বাচিত এমপিরা আপনাদের দায়িত্ব নেবে। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা আপনাদের দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করছে কি না সেটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমি নেব ইনশাআল্লাহ।
১২ ফেব্রুয়ারি যদি আপনাদের সমর্থন পায় তাহলে রাষ্ট্রীয় পরিচালনায় বিএনপির মূল মন্ত্র থাকবে মহানবীর মহান আদর্শ ন্যায় করার। ১২ ফেব্রুয়ারি সারাদিন ধানের শীষের ভোট দিন।বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, মরহুমা বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার সাফল্য যাত্রা অব্যাহত রাখতে আমি আমার দলের নেতাকর্মীদেরকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপির রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়নের জন্য দীর্ঘদিন থেকে হাতে কলমে প্রস্তুতি নিয়েছি।
তিনি বলেন, ২০০১ সালে যখন আপনাদের সমর্থনে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছিল আমি তখন সরকারের অংশ হইনি। তবে বিএনপির একজন কর্মী হিসাবে সারাদেশে প্রতিটি জেলা উপজেলা গ্রাম নগর বন্দরে ঘুরেছি।
আপনাদের স্থানীয় সমস্যাগুলো সম্ভাবনাগুলো জানা, বোঝার চেষ্টা করেছি। পরিস্থিতির কারণে বিদেশে থাকতে বাধ্য হলেও হৃদয় মন সত্তা জুড়েছিল বাংলাদেশ। বাংলাদেশের জনগণ।
আমি তাই বিদেশে অবস্থানকালীন সময়েও দেশের প্রতিটি এলাকায় আপনাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করি। বিদেশ থেকে দেশে ফিরেও আমি আবারো এই স্বল্প সময় যতটুকু সম্ভব আপনাদের কাছে ছুটে গিয়েছি। আমি আপনাদের ভালোবাসা পেয়েছি। বিএনপির প্রতি আপনাদের আবেগ এবং ভালোবাসা উপলব্ধি করেছি।
গণতান্ত্রিক উত্তোরণের এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে উপনীত বাংলাদেশ মন্তব্য করে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, দেশের সংবিধানের সপ্তম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ। কিন্তু পতিত পরাজিত বিতাড়িত চক্র জনগণের কাছ থেকে রাষ্ট্রের মালিকানা কেড়ে নিয়েছিল।
কেড়ে নিয়েছিল জনগণের সব গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার। অবশেষে দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় হাজারো প্রাণের বিনিময়ে জনগণের কাছে রাষ্ট্রের মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়া এক মাহেন্দ্রক্ষণ আমাদের সামনে উপস্থিত।
তারেক রহমান বলেন, দেশের নাগরিকদের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ইতিমধ্যেই বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করা হয়েছে।
প্রতিটি সেক্টর এবং প্রতিটি শ্রেণি-পেশার মানুষকে লক্ষ্য করে একটি স্বনির্ভর বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য আমরা আমাদের পরিকল্পনা সাজিয়েছি। বর্তমান প্রজন্মের সামাজিক অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক অধিকার পুনর্বহাল এবং ভবিষ্যৎ প্রজম্যের জন্য একটি নিরাপদ মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়েই চূড়ান্ত করা হয়েছে।
বিএনপির সব পরিকল্পনা বিশেষ করে দেশের সব তরুণ-তরুণী বেকার জনগোষ্ঠী এবং নারীদের জন্য দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থান এবং কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাই এবার বিএনপির প্রথম এবং প্রধান অগ্রধিকার।
আমি ইশতেহারে উল্লেখিত কয়েকটি বিষয় খুব সংক্ষিপ্তভাবে আজ আবারও দেশবাসীর সামনে তুলে ধরতে চাই। তিনি বলেন, বেকার সমস্যা নিরসনের লক্ষ্যে ব্যাংক, বিমা, পুঁজিবাজারসহ দেশের অর্থনৈতিক খাতের সার্বিক সংস্কার, অঞ্চল ভিত্তিক অর্থনীতিকে চাঙা করা এবং শিল্প ও বাণিজ্যে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশে বিদেশে এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যমার্তা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এভাবে পর্যায়ক্রমিকভাবে এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য কয়েকটি সেক্টরকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির উপায় এবং কর্মকৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে। এরই অংশ হিসাবে দেশব্যাপী কারিগরি এবং ব্যবহারিক শিক্ষা দেওয়ার মাধ্যমে বেকার জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করা হবে।
কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয় বিনামূল্যে স্কিলস ডেভেলপমেন্ট, ফ্রিল্যান্সিং এবং আউটসোর্সিং প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। যাতে করে বেকার যুবক কিংবা তরুণ-তরুণীরা দেশে বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির জন্য প্রস্তুত হয়ে সরাসরি কর্মক্ষেত্রে কর্মসংস্থানে যুক্ত হতে পারেন।
প্রতিটি অঞ্চলভিত্তিক স্থানীয়ভাবে বিখ্যাত এবং ঐতিহ্যবাহী পণ্যের উৎপাদন এবং বাজারজাতকরণের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে।
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, বিএনপিকে যদি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেন তাহলে আমরা এবার প্রথমবারের মতো দেশে প্রতিটি পরিবারের জন্য ফ্যামিলি কার্ড ইস্যু করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছি। পরিবারগুলোর নারী প্রধানের নামে ফ্যামিলি কার্ড ইস্যু করা হবে।
তবে প্রথম পর্যায়ে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা প্রান্তিক এবং নিম্ন আয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে ফ্যামিলি কার্ডে প্রতিমাসে আড়াই হাজার টাকা কিংবা সমমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য সহায়তা দেওয়া হবে। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে আর্থিক সহযোগিতার পরিমাণ প্রয়োজন এবং বাস্তবতার নিরিখে পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হবে।
ফ্যামিলি কার্ডটিকে আমরা নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবে মনে করি।তিনি বলেন, দেশনেত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া নারী শিক্ষার উন্নয়নে দেশের স্নাতকত্তর পর্যন্ত বিনা বেতনে শিক্ষার সুযোগ চালু করেছিলেন।
আপনারা বিএনপিকে আবারো রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিলে নারীদের বিনা বেতন শিক্ষা গ্রহণের সুবিধা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি নীতি নির্ধারণে নারীর অংশগ্রহণ ও ভূমিকা বাড়ানো হবে। নারী উদ্যোক্তাদের আর্থিক ও দক্ষতা উন্নয়নে বিশেষ সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি আনুষ্ঠানিক খাতে নারী কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে।
উপজেলা পর্যায়ে বিশেষায়িত নারী কল্যাণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করার পর কল্পনা আমাদের রয়েছে। স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা নিশ্চিত করতে শুধুমাত্র নারীদের জন্য বিশেষায়িত ইলেকট্রিক পরিবহন চালু করা হবে। কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে কর্মস্থলে ডে কেয়ার ও ব্রেস্টফিডিং কর্নার স্থাপন করা হবে।
এছাড়া বিশেষ করে রাজধানী ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে কয়েকটি নির্দিষ্ট স্থানে হাইজিনিক বাথরুম নির্মাণের পরিকল্পনাও আমাদের রয়েছে। আমাদের সমাজে নারীরা নানাভাবে হয়রানী এবং সহিংসতার শিকার হন। বর্তমান সময় নারীর প্রতি সাইবার বুলিং উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে।
বুলিং সহ নারীর প্রতি যেকোন ধরনের স্বয়ংসতা বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগের পরিকল্পনা এবং সিদ্ধান্ত আমাদের রয়েছে। নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত অবশ্যই করা হবে জানিয়ে বিএনপির এই নীতির নির্ধারক বলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতির নানা খাত বাড়লেও দেশের অর্থনীতি এখনো মূলত কৃষি নির্ভর।
বিএনপি বিশ্বাস করে কৃষকের স্বার্থ রক্ষার অর্থ দেশের স্বার্থ রক্ষা। এজন্যই আমরা বলি বাঁচলে কৃষক বাঁচবে দেশ। এই উপলব্ধি থেকেই আমরা কৃষকদের স্বার্থ রক্ষার জন্য কৃষকদের জন্য ফার্মাস কার্ড ইস্যুর উদ্যোগ নিয়েছি।
এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষক একদিকে কৃষি সংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্য পাবেন। অপরদিকে সরকারের কাছ থেকে পাবেন আর্থিক এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা। দেশে কোটি কোটি কৃষক শ্রমিক রয়েছেন। অধিকাংশই কর্মক্ষম।
কর্মক্ষম কৃষকদের জন্য একদিকে যেরকম কর্মসংস্থান প্রয়োজন অপরদিকে প্রয়োজন তাদের শ্রমের ন্যাজ্য মজুরি এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ। আমরা মনে করি কর্মক্ষময়ী জনশক্তির শ্রমই হতে পারে বাংলাদেশকে পুনরায় স্বনির্ভর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশে রূপান্তরের চাবিকাঠি।
এ কারণেই আমরা বলি করব কাজ। গর্ব দেশ সবার আগে বাংলাদেশ। তাই আমরা আমাদের কর্মপরিকল্পনায় কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছি।
ইউডি/এআর

