দুর্ভোগ নিরসনে অর্থনীতিকে দাঁড় করানোর বিকল্প নেই
শিলা আক্তার। শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, আপডেট ১২:০০
বিভিন্ন সূচকে মিশ্র প্রবণতার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে দেশের অর্থনীতি। নানা সমস্যার পাশাপাশি বেশ কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। তবে সার্বিকভাবে দেশের অর্থনীতি চাপের মধ্যে রয়েছে। ২০২৬ সালের শুরুতে বাংলাদেশের অর্থনীতি জটিল অবস্থায় আছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকের সমস্যা, বিনিয়োগ সমস্যা ও জ্বালানিসংকট- সব মিলিয়ে নতুন সরকার বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। সরকারকে এখন এসব সমস্যা মোকাবিলা করে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে হবে। সেই সঙ্গে সংস্কারের মাধ্যমে অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনের ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে উন্নতি হলেও পূর্ণাঙ্গ পুনরুদ্ধার নাজুক অবস্থায় আছে। চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিক অর্থাৎ গত অক্টোবর-ডিসেম্বর সময়ের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) ঢাকার প্রতিবেদনে এমন পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে। এমসিসিআইর ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দ্বিতীয় প্রান্তিকের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলা হয়, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বৈশ্বিক অস্থির পরিস্থিতির প্রভাবে যেসব প্রতিবন্ধকতা দেখা দিয়েছিল তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে দেশের অর্থনীতি। ফলে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সূচকে মিশ্র প্রবণতা দেখা গেছে।
‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পর্যালোচনা’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদেন বলা হয়, একদিকে রপ্তানি খাতের দুর্বলতা, বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা ও মুদ্রানীতির কড়াকড়ি প্রভাবে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি সীমিত রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি অব্যাহত থাকায় ঋণপ্রবাহে কড়াকড়ি বজায় রাখা হয়েছে, যা ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডকে আরও সীমিত করেছে। অন্যদিকে ইতিবাচক দিক হচ্ছে রেমিট্যান্স প্রবাহ শক্তিশালী থাকায় বেড়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। পাশাপাশি বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধি সত্ত্বেও বৈদেশিক লেনদেনের সামগ্রিক ভারসাম্যে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে। প্রতিবেদনে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কিছু সূচকের জন্য পরবর্তী তিন মাসের (জানুয়ারি-মার্চ) প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, এই তিন মাসে রপ্তানি, আমদানি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়তে পেতে পারে। রেমিট্যান্স জানুয়ারিতে কমলেও পরের দুই মাসে তা আবার বাড়তে পারে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এরপর মার্চ মাসে তা কমতে পারে।
প্রতিবেদনে দেওয়া প্রক্ষেপণ অনুসারে, চলতি ফেব্রুয়ারি মাসে রপ্তানি আয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ৪৪৮ কোটি ডলারে, যা মার্চে বেড়ে প্রায় ৪৫২ কোটি ডলারে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে আমদানি ব্যয়ও ঊর্ধ্বমুখী থাকতে পারে। ফেব্রুয়ারিতে তা প্রায় ৫৯৫ কোটি ডলার এবং মার্চে প্রায় ৬০৪ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে। এতে বলা হয়, ফেব্রুয়ারিতে রেমিট্যান্স আসতে পারে প্রায় ৩১৯ কোটি ডলার। মার্চে তা আরও বেড়ে ৩২৫ কোটি ডলারে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মূল্যস্ফীতি ফেব্রুয়ারিতে সামান্য বেড়ে ৮ দশমিক ৬০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। তবে মার্চে তা কিছুটা কমে প্রায় ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে।
বলতে চাই- দেশের অর্থনীতিকে এক ভয়াবহ অবস্থায় রেখে গেছে অন্তর্বর্তী সরকার। সরকার আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি করে যাওয়ায় রাষ্ট্রীয় কোষাগার প্রায় শূন্যবস্থায় রয়েছে। পাশাপাশি বিপুল বকেয়া রেখে গেছে। অর্থনীতির এই দৈন্যদশা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে। আমরা বারবার বলেছি, অন্তর্বর্তী সরকার নতুন সরকারের ওপর একটি ঋণনির্ভর অর্থনীতি রেখে যাচ্ছে, যেখানে অর্থ বলতে কিছু নেই। এখন জনগণের প্রাত্যাহিক চাহিদা মেটানোই দায় হয়ে পড়েছে। অর্থাভাবে জনপ্রত্যাশা কীভাবে পূরণ করা হবে, তা নিয়ে সরকারের দায়িত্বশীল অনেকেই চিন্তিত। অর্থনীতিবিদদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনৈতিক উন্নয়নের পরিবর্তে ক্ষমতাকে প্রলম্বিত করার বাসনা নিয়ে চলতে গিয়ে অর্থনীতির কোনো উন্নতি করতে পারেনি।
স্বৈরাচার হাসিনার ফোকলা করে যাওয়া অর্থনীতিকে টেনে তুলতে পারেনি। উল্টো অর্থনীতিকে খাদের কিনারে নিয়ে গেছে। গতকাল দৈনিক বণিকবার্তার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার চলতি অর্থবছরে ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকাওে বাজেট ঘোষণা করেছিল। এর মধ্যে পরিচালন খাতে বরাদ্দ করা হয়েছে ৫ লাখ ৩৫ হাজার ৩১৭ কোটি এবং উন্নয়ন খাতে ২ লাখ ৪৫ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা। অর্থ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ৬ মাসে সরকার ব্যয় করেছে ২ লাখ ৫৮ হাজার ১৮৬ কোটি টাকা যার মধ্যে পরিচালন খাতে ২ লাখ ২০ হাজার ৪৬৩ কোটি এবং উন্নয়ন খাতে ৩১ হাজার ৮৪১ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। একই সময়ে রাজস্ব আহরণ হয়েছে ২ লাখ ২২ হাজার ৮৫৩ কোটি টাকা। ফলে বাজেট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৫ হাজার ৩৩৩ কোটি টাকা, যার মধ্যে বোশির ভাগই ঋণ নিয়ে মেটানো হয়েছে। এ পরিসংখ্যান থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না, অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতিকে কোথায় রেখে গিয়েছে। কীভাবে ঋণের বোঝা নতুন সরকারের উপর চাপিয়ে দিয়েছে। অথচ ড. ইউনূস অন্তর্ববর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেয়ার পর বিশ্বপ্রশংসায় ভেসে গিয়েছিলেন। পরশক্তি থেকে শুরু করে আর্ন্তজাতিক আর্থিক সংস্থাগুলো মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার সহায়তা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। দেখা যাচ্ছে, তার কিছুই অন্তর্বর্তী সরকার আনতে পারেনি।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৮ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের কাছ থেকে ক্ষমতা গ্রহণের সময় বিএনপি সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে ২৩ লাখ কোটি টাকার বেশি ঋণের বোঝা পেয়েছে। এই ভারি বোঝা বহন করেই তাকে চলতে হচ্ছে এবং হবে। অর্থনীতিবিদদের মতে, রাষ্ট্রীয় কোষাগারের সীমিত সামর্থ্য, বাড়তে থাকা ঋণের বোঝা এবং জনমুখী প্রতিশ্রুতির চাপ, এই তিন সমস্যা মোকাবেলা করাই নতুন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ। এ পরিস্থিতিতে সরকারের রাজনৈতিক যেসব প্রতিশ্রুতি রয়েছে সেগুলো বাস্তবায়ন করতে গিয়ে অর্থ সংস্থান করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়বে। আমরা পুনঃপুনঃ বলেছি, সরকারকে এমন এক সময় যাত্রা শুরু করতে হয়েছে, যখন রোজা এবং এ সময় গ্যাস-বিদ্যুতের চাহিদা, নিত্যপণ্যের মূল্য ঊর্ধ্বমুখী থাকে। সাধারণ মানুষকে স্বস্তিতে সিয়াম পালন করতে হলে, নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুত সরবরাহ নিশ্চিত করাসহ পণ্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। এর চেয়েও কঠিন বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংক খাত, নিম্ন রাজস্ব ও অপ্রতুল কর্মসংস্থানের চাপে আছে। প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধি ও রিজার্ভের উন্নতিতে কিছু সম্ভাবনার সংকেত দেখা যাচ্ছে। তবে অর্থনৈতিক ম্যান্ডেটের জন্য দৃশ্যমান সংস্কার ও কার্যকর নীতি দরকার। এসব কারণে ২০২৬ সাল নতুন সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এই বছরটি তাদের পরীক্ষার বছর।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে পরিস্থিতিকে নিজের জন্য ‘অগ্নিপরীক্ষা’ হিসেবে উল্লেখ করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, বিগত সময়ে যে পরিমান বকেয়া রেখে যাওয়া হয়েছে, তা পরিশোধ করে সমন্বয় করা অত্যন্ত কঠিন। বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতে বকেয়া রয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। আমরা চেষ্টা করছি, পরিস্থিতি সামাল দিতে। এর মধ্যে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে পে কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। তা বাস্তবায়ন করতে ২০ হাজার কোটি টাকা লাগবে। রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক যে দুরবস্থার চিত্র ফুটে উঠেছে, তাতে নতুন সরকারকে অত্যন্ত সতর্ক ও সচেতন হয়ে চলতে হবে। কারণ, দেশের অর্থনীতির এই দুরবস্থা নতুন নয়। শেখ হাসিনার শাসনামল থেকে শুরু করে অন্তর্বর্তী সরকার পর্যন্ত শোচনীয় পরিস্থিতির মধ্যেই রয়ে গেছে। আশা করা হয়েছিল, গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দ্রুতই অর্থনীতিকে চাঙা করতে পারবে। তা সে করতে পারেনি। উল্টো ঋণ করে চলতে চলতে দেশকে লাখ লাখ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে ডুবিয়ে গেছে। অর্থনীতির এই ডুবন্ত অবস্থা থেকে এখন নতুন সরকারকে টেনে তুলতে হবে। কাজটি কঠিন, তবে সরকার দক্ষতার সাথে হ্যান্ডেল করতে পারলে, আশা করা যায়, অর্থনীতিকে শক্ত মাটির উপর দাঁড় করাতে পারবে।
নতুন সরকারকে বিপাকে ফেলার জন্য বহু ধরনের রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র থাকা অস্বাভাবিক নয়। সরকারের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ বাড়িয়ে তোলার ষড়যন্ত্রও হবে। বিশেষ করে রোজায় যেসব সংকট প্রকট হয়ে উঠে, সেগুলো সামাল দিতে না পারলে, জনগণের মধ্যে সরকারের প্রতি বিরূপ ধারণা জন্মাবে। এ সময় নিরবিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ ও জিনিসপত্রের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে হবে। দিন দিন গরম বাড়ছে, ঈদের আগে আরও বাড়বে। সরকারকে এ বিষয়টি মাথায় রেখে প্রস্তুতি নিতে হবে। জনঅসন্তোষ যাতে না বাড়ে, মানুষ স্বস্তিতে থাকে, এ ব্যবস্থা করতে হবে। আমরা দেখেছি, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মানুষ যতই কষ্টে থাকুক না কেন, এ নিয়ে কোনো টুঁ শব্দ করা হয়নি। যারা অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোর সমর্থক এবং সরকারের অংশ হয়ে ক্ষমতা ভোগ করেছে, তারা কোনো কথা বলেনি। একই পরিস্থিতিতে তারা এ সরকারের সময় চুপ থাকবে না। সোরগোল করবে। ফলে সরকারকে এ ব্যাপারে সর্তক থাকতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুর সময়ের মতো পরাশক্তি ও বিশ্বব্যাংকসহ আর্থিক সংস্থাগুলো নতুন সরকারকে সহায়তা দেয়ার প্রতিশ্রুতি এবং বিভিন্ন উপদেশ ও পরামর্শ দিচ্ছে।
সরকারকে মনে রাখতে হবে, এসব উপদেশ খয়রাত করে লাভ নেই। তাকে তার নিজের পায়ের উপর দাঁড়াতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারকেও তারা অনেক উপদেশ-পরামর্শ দিয়েছে। তাতে কোনো লাভ হয়নি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এ ব্যাপারে গভীর চিন্তা করতে হবে। তাকে সতর্ক থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, দেশের অর্থনীতি দুর্বল এবং মানুষের জীবনযাপন কষ্টকর হলে যেকোনো দেশের সরকারের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে যায়। সরকারের পতন ঘটে। শেখ হাসিনার পতনের অন্যতম কারণ ছিল শোচনীয় অর্থনীতি। অন্তর্বর্তী সরকার তা থেকে বের হতে পারেনি। কাজেই সরকারের প্রথম কাজ হচ্ছে, অর্থনীতিকে শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড় করানো। প্রথমে নজর দিতে হবে, সাধারণ মানুষের নিত্যকার সমস্যা ও প্রয়োজনীয়তার দিকে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তাদের সমস্যার সমাধান করতে হবে। দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ধীরে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিলেও খুব একটা সমস্যা হবে না। তবে সবার আগে মানুষের চলমান দুর্ভোগ ও সমস্যা নিরসন করতে হবে।
লেখক: কলামিস্ট।

