টাঙ্গাইলে ট্রাক উল্টে নিহত ১৫, ঈদের আনন্দ শোকের বাতাসে স্তব্ধ
উত্তরদক্ষিণ। সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬, আপডেট ২০:১০
প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ উদযাপন করতে বাড়ি ফিরছিলেন তারা। ভাড়া কম হওয়াতে রডবোঝাই একটি ট্রাকের ছাদে যাত্রা করেন। ক্লান্ত শরীরে মধ্যরাতে পথে যাত্রীদের অনেকেই ঘুমিয়ে ছিলেন। এর মধ্যে ট্রাকের চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মহাসড়কের পাশে খাদে ফেলে দেন ট্রাকটি। যাত্রীরা রড ও ট্রাকের চাকার নিচে চাপা পড়েন। পরে স্থানীয় বাসিন্দা, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে ১৫ জনকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করেন।
বেশ কয়েকজনকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। নিমিষেই ঈদের আনন্দ শোকের বাতাসে স্তব্ধ হয়ে যায়। এদিকে নিহত ও আহতদের পরিবার-স্বজনদের আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছে পরিবেশ। এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। ট্রাকে থাকা যাত্রীদের অধিকাংশের বাড়ি নওগাঁর মান্দা উপজেলা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়।
ঈদযাত্রার সোমবার ভোর ৪টা ১৫ মিনিটে ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কের টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার যোকারচর ১৮ নম্বর ব্রিজ এলাকায় এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। স্বজনদের সঙ্গে ঈদ করতে ফেনী, চট্টগ্রামসহ ঢাকার বিভিন্নস্থান থেকে রডবোঝাই ট্রাকে করে উত্তরবঙ্গের দিকে যাচ্ছিলেন তারা।
এ সংবাদ লেখা পর্যন্ত নিহত ১৫ জনের মধ্যে ১২ জনের নাম-পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন নওগাঁর মান্দা উপজেলার রাজেন্দ্রবাটির সাকিম মিয়ার ছেলে সাগর মিয়া (২০), একই এলাকার শহিদুল ইসলামের ছেলে রবিউল ইসলাম (২৫), রাজশাহীর তানোর উপজেলার বাতানপুরের আলতাফ হোসেনের ছেলে ইসমাইল হোসেন (১৯), চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার নজরুল (৬০), চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার মামুন (৪৫), নওগাঁর নেয়ামতপুর উপজেলার মালঞ্চির সাইদুলের ছেলে সারিকুল (২৫), নওগাঁর মান্দা উপজেলার রাজেন্দ্রবাটির আব্দুর রশিদের ছেলে বারি (২১), একই উপজেলার রাজেন্দ্রবাটির আব্দুর রহিমের ছেলে বাদশা (৩২), নওগাঁ জেলার মান্দা উপজেলার পাকুরিয়া গ্রামের আব্দুর রশিদের ছেলে গিয়াস (২০), একই এলাকার রশিদের ছেলে মাইনুল (২৮), রাজেন্দ্রবাটি এলাকার একাব্বর আলীর ছেলে ইয়াকুব (২০) ও একই এলাকার সুলতানের ছেলে তারেক (২০)।
বাকি তিনজনের পরিচয় পাওয়া যায়নি। আহতরা হলেন নওগাঁর মান্দা উপজেলার মজিবরের ছেলে বাবু (৩৫), একই উপজেলার আব্দুল রহিমের ছেলে আব্দুল রহমান (৩৫), নাটোরের মৃত মান্নানের ছেলে নয়ন বিশ্বাস (৩২), দশপাড়া গ্রামের নজরুলের ছেলে তুহিন, নওগাঁর মান্দা উপজেলার পাকুরিয়ার সফেদ আলীর ছেলে আলমগীর (৪০), একই উপজেলার ছোরহাব আলীর ছেলে সিদ্দিক আলী (৪০), মৃত সাহেব আলীর ছেলে খোরশেদ (২৬), নওগাঁর মান্দা উপজেলার ডেমরার শহিদুলের ছেলে সমেজ।
প্রাণে বেঁচে যাওয়া রাব্বানি নামের এক যাত্রী বলেন, ‘আমরা ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলাম। হঠাৎ দেখি ট্রাকটি উল্টে গেছে। এরপর আর কিছুই বলতে পারব না। ট্রাকে থাকা যাত্রীদের অধিকাংশের বাড়ি নওগাঁর মান্দা উপজেলা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়। তারা চট্টগ্রাম ও ফেনী এলাকায় হকারের কাজ করতেন।’
আরেক যাত্রী তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘ট্রাকটি নওগাঁ জেলার মান্দার দিকে যাচ্ছিল। আমরা কয়েকজন চাঁপাইনবাবগঞ্জে যাওয়ার জন্য চট্টগ্রাম থেকে উঠি। মূলত বাসের চেয়ে কম ভাড়া হওয়ায় ট্রাকে উঠি। আমাদের মধ্যে দুজন মারা গেছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘ফেনী থেকে ১৮ জন একসঙ্গে ট্রাকে ওঠেন। বাকিরা বিভিন্ন স্থান থেকে ওঠেন। সবাই পেশায় হকার। কসমেটিকস, চুল, ভাঙা মোবাইলসহ বিভিন্ন পণ্য ফেরি করে গ্রামে গ্রামে কেনাবেচা করি।’
এলেঙ্গা ফায়ার সার্ভিস স্টেশনে দায়িত্বরত আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘ঘটনাস্থল থেকে ১৫ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। ছয়জনকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ট্রাকে ২৪-২৫ জন যাত্রী ছিলেন।’
যমুনা সেতু পূর্ব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খন্দকার ফুয়াদ রুহানি বলেন, ‘১৫ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। আর ৬-৭ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আইনি প্রক্রিয়া শেষে নিহতদের স্বজনদের কাছে লাশগুলো হস্তান্তর করা হবে। ট্রাকচালক ও হেলপার পলাতক রয়েছেন। এ ঘটনায় মামলা করার প্রস্তুতি চলছে।
এলেঙ্গা (মধুপুর) হাইওয়ে থানার ওসি মো. শরীফ বলেন, ‘ঈদযাত্রায় মহাসড়কে যানবাহন ও যাত্রীর চাপ বেড়েছে। তবে মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। পুলিশ প্রশাসনের সদস্যরা মহাসড়কে সার্বক্ষণিক তৎপর রয়েছেন।’
টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার মুহাম্মদ শামসুল আলম সরকার বলেন বলেন, ‘নিহতদের পরিচয় শনাক্তে কাজ চলছে। ঈদযাত্রায় মালবাহী খোলা যানবাহনে কিংবা বাসের ছাদে যাত্রী পরিবহন বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ইউডি/আতা

