‘তেলাপোকাদের’ হাতে মোদির বিপদ-ঘন্টা!

‘তেলাপোকাদের’ হাতে মোদির বিপদ-ঘন্টা!

উত্তরদক্ষিণ। সোমবার, ০৮ জুন, ২০২৬, আপডেট ১৬:১৫

শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ না করলে ইন্ডিয়াজুড়ে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি, ৭ দিনের আল্টিমেটাম

ইন্ডিয়ায় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) তথা ‘তেলাপোকা পার্টি’ অনলাইনে ভাইরাল হওয়ার পর থেকেই সকল মহলে একটি প্রশ্ন ঘরেছে-এই দল কি শুধুই অনলাইনকেন্দ্রীক ব্যঙ্গেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি বাস্তবে মাঠে নামবে? তবে গত শনিবার দিল্লীর যন্তর মন্তরে তাদের প্রথম বিক্ষোভ সমাবেশ ও আরও বড় ধরনের আন্দোলনের আল্টিমেটামে সেই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাচ্ছে। ওই সমাবেশে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, ইন্ডিয়ার শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ না করলে ‘তেলাপোকারা’ দেশজুড়ে আন্দোলন গড়ে তুলবে। এ ছাড়া আগামী ১৩ জুন আবার যন্তর মন্তরে সমাবেশের আয়োজন করা হবে। এই বিক্ষোভ কেন্দ্র করে নরেন্দ্র মোদী সরকার বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। কারণ দেশটিতে তরুণদের এ ধরনের আন্দোলন এটাই প্রথম। আন্দোলনের মুখে সরকার পতনের নজির এরই মধ্যে স্থাপন হয়েছে শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালে। এসব দেশে আন্দোলনের পেছনে সবচেয়ে বড় ভ‚মিকার রেখেছে তরুণরা, যারা জেন-জি নামে পরিচিত। এসব নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন…

প্রথমবারের মতো জেন-জি আন্দোলন দেখছে ইন্ডিয়া

আসাদ এফ রহমান : গত মাসে ইন্ডিয়ার একজন শীর্ষ বিচারক দেশটির বেকার তরুণদের ‘তেলাপোকা’ ও ‘পরজীবী’র সঙ্গে তুলনা করেন। তিনি স্বপ্নেও ভাবেননি এর ফল কী হতে পারে। বিচারকের ওই তুলনা ইন্ডিয়ার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তরুণদের মধ্যে এক বিশাল ক্ষোভ-বিক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ১২ বছরের শাসনামলে অনলাইনে এটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রতিবাদের ঘটনা। আন্দোলনের পেছনে সবচেয়ে বড় ভ‚মিকার রেখেছে তরুণরা, যারা জেন-জি নামে পরিচিত। দেশটিতে তরুণদের এ ধরনের আন্দোলন এটাই প্রথম। প্রতিবেশী রাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ কিংবা নেপাল এই ধরণের আন্দোলন দেখেছে সম্প্রতি। আর এর ফলাফল কী তা দেখেছে বিশ্ব। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি অনলাইনে রীতিমতো ঝড় তুলেছে। তবে তারা এই আন্দোলনকে বাস্তব দুনিয়ায় রূপ দিতে পারবে কি না, তা নিয়ে ছিল নানা জল্পনা-কল্পনা।

প্রথমে মনে করা হচ্ছিল অনলাইনে জনপ্রিয়তার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে কোনো কিছু প্রতিষ্ঠা করা যায় না। তবে এ ধারণা পাল্টে গেছে গত শনিবার দিল্লিতে অনুষ্ঠিত তেলাপোকা পার্টির বিক্ষোভ কেন্দ্র করে। হাজার হাজার তরুণ সেখানে সমবেত হয়েছেন। রাজধানী দিল্লির জন্তর মন্তরে শনিবার কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ করে তারা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে সিজেপি লিখেছে, আমরাই শিক্ষামন্ত্রীকে নির্বাচিত করে সেখানে পাঠিয়েছি, তিনি আমাদের করের টাকায় বেতন পান। অথচ তার আমলে কোটি কোটি তরুণের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে। ককরোচরা আসছে, ধর্মেন্দ্র প্রধান বিদায় নিচ্ছেন। শনিবার ভোরে আমেরিকা থেকে দিল্লির আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে। বিমানবন্দরের টার্মিনাল-৩ থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে। কারণ পাঁচজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। অভিজিৎ দীপকে সমাবেশে সংক্ষিপ্ত ভাষণে বলেন, দেশের যুবসমাজ আর ভয় পাবে না। তারা লড়বে। ককরোচ (তেলাপোকা) ভয় পায় না, মরেও না।

গত শনিবার দিল্লীর যন্তর মন্তরে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে,শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ না করলে দেশজুড়ে আন্দোলন গড়ে তুলবে

এ ছাড়া শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ না করলে ইন্ডিয়াজুড়ে আন্দোলন হবে বলেও ঘোষণা দেওয়া হয় সমাবেশ থেকে। বলা হয়, আবারও ১৩ জুন যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের আয়োজন করা হবে। এদিকে, সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ বা অপসারণের দাবিতে নতুন করে সাত দিনের আল্টিমেটাম ঘোষণা করেছেন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি পূরণ না হলে আন্দোলন আরও তীব্র ও ধারাবাহিকভাবে দেশজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া হবে। রবিবার (০৭ জুন) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে অভিজিৎ দিপকে বলেন, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে অপসারণ বা তার পদত্যাগের জন্য সরকারকে সাত দিনের আল্টিমেটাম দেওয়া হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে দাবি পূরণ না হলে দেশজুড়ে ধারাবাহিকভাবে আরও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হবে। শনিবার দিল্লির তীব্র গরম উপেক্ষা করে হাজারো সমর্থক যন্তর মন্তরের সমাবেশে অংশ নেওয়ায় তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান দিপকে। তিনি বলেন, ‘গতকাল (শনিবার) আমরা ইতিহাস সৃষ্টি করেছি। আমাদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন সরকারের কাছে দেখিয়ে দিয়েছে, ঐক্যবদ্ধ হলে ‘ককরোচরা’ কী করতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, যারা সমাবেশে অংশ নিয়েছেন, তাদের অধিকাংশই আগে কখনও কোনো আন্দোলনে অংশ নেননি। কিন্তু সম্মিলিত উপস্থিতি তাদের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশের সাহস জুগিয়েছে। জনগণের কণ্ঠস্বর উচ্চারিত না হলে পরিবর্তন সম্ভব নয়। সমাবেশে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীসহ সব বয়সী মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে দিপকে বলেন, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। ঐক্যবদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে দমন করা সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে আন্দোলন এখানেই থেমে থাকবে না বলে সতর্ক করে তিনি বলেন, ধর্মেন্দ্র প্রধান একটি পুরো প্রজন্মের সঙ্গে অন্যায় করেছেন। আগামী সাত দিনের মধ্যে তিনি যদি পদত্যাগ না করেন বা তাকে অপসারণ না করা হয়, তাহলে আমরা মাঠে আরও আন্দোলনে নামতে বাধ্য হব।

কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে মোদি সরকার

রিন্টু হাসান : বিশ্বজুড়েই দেখা যায়, কৌতুক, মিম ও অনলাইন তৎপরতাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আন্দোলনগুলো অনেক সময় প্রথাগত বিরোধী দলের চেয়ে বেশি কার্যকর হয়। এরা খুব সহজে স্বৈরতান্ত্রিক সরকারগুলোকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে। তবে ইন্ডিয়ার এই ‘তেলাপোকা পার্টির’ আন্দোলন একটু ব্যতিক্রমই বটে। কেননা এই পার্টিও সিংহভাগই তরুণ। ‘তেলাপোকা পার্টির’ আন্দোলন এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ইন্ডিয়ার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকার বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। কারণ দেশটিতে তরুণদের এ ধরনের আন্দোলন এটাই প্রথম। দেশটিতে এর আগে রাজনৈতিক দলের বাইরে তরুণদের নেতৃত্বে কোনো সমাবেশ বা বিক্ষোভ হয়নি। রাজনৈতিক দল বা কৃষকদের অনেক আন্দোলন হয়েছে। তবে সেই সব আন্দোলনকে বিজেপি রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করেছে। কিন্তু এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন ও অত্যন্ত সংবেদশীল।

ইন্ডিয়ার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি

কারণ এই তরুণদের নেতৃত্বেই প্রতিবেশী দেশগুলোতে স¤প্রতি সরকার পতন হয়েছে, যা মোদি সরকার খুব ভালোভাবেই অনুধাবন করতে পেরেছে বা জানে। তাই অন্য আন্দোলনের মতো তরুণদের দমন করতে চাইলে হিতে বিপরীত হতে পারে। আন্দোলনের মুখে সরকার পতনের নজির এরই মধ্যে স্থাপন হয়েছে শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালে। সবকটি দেশই ইন্ডিয়ার প্রতিবেশী। এসব দেশে আন্দোলনের পেছনে সবচেয়ে বড় ভ‚মিকার রেখেছে তরুণরা, যারা জেন-জি নামে পরিচিত। বেকারত্বের হতাশা ও সরকারের দুর্নীতি থেকেই এসব আন্দোলনের সূত্রপাত। প্রথমে ছোট ছোট মিছিল, বিক্ষোভ তারপর বড় সমাবেশ। এক সময় তা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। এভাবেই দক্ষিণ এশিয়ার তিন দেশে সরকার পতন হয়।তেলাপোকা জনতা পার্টির নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভে তরুণরা এখন মোদী সরকারের শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ চাইছে। তাদের জোড়ালো দাবি হচ্ছে ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে হবে। এখন যদি সরকার তাকে মন্ত্রিসভা থেকে বহিষ্কার না করে তাহলে তরুণরা ছোট ছোট সমাবেশ বা বিক্ষোভের মাধ্যমে আন্দোলনকে আরও বেগবান করতে পারে। অন্যদিকে যদি সরকার তাকে মন্ত্রিসভা থেকে বহিষ্কার করে তাহলে মোদি সরকারের দুর্বলতা সামনে চলে আসবে। এর সুযোগ নিতে শুরু করবে বিরোধীদলগুলো। তাছাড়া এই আন্দোলনেও পেছন থেকে তরুণদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করতে থাকবে তারা।

এরই মধ্যে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী সামাজিকমাধ্যমে ভিডিও প্রকাশ করে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ চেয়েছেন। একই সঙ্গে তেলাপোকা জনতা পার্টির বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন শিক্ষাবিদ ও জলবায়ু কর্মী সোনাম ওয়াংচুকও। বাংলাদেশ ও নেপালের পর প্রশ্ন ওঠে একই ধরনের আন্দোলন ইন্ডিয়ায়ও হতে যাচ্ছে কি না। ২০১৪ সালের পর থেকেই একচেটিয়া ক্ষমতা ভোগ করছে মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার। উন্নয়ন আর হিন্দুত্ববাদের প্রচারণা চালিয়ে রাজনৈতিক সুবিধা নিচ্ছে দলটি। তবে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির টোপ থেকে নিজেদের দূরে রাখতে শুরু করেছে দেশটির তরুণরা। এরই মধ্যে সরকারের চোখে চোখ রেখে কথা বলতে শুরু করছে তরুণরা। সা¤প্রতিক সময়ে দেশটির বিভিন্ন পরীক্ষার অনিয়ম কেন্দ্র করে ক্ষোভ আরও বেড়েছে। যার বড় প্রমাণ হলো ককরোচ বা তেলাপোকা জনতা পার্টির উত্থান। সামান্য একটি ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন আন্দোলন শেষ পর্যন্ত বাস্তবে রূপ নিলো।

তেলাপোকারা ভয় পায় না, লড়াই চলবে: দীপকে

আরাফাত রহমান : প্রথমবারের মতো রাজপথের বিক্ষোভে নেতৃত্ব দিতে আমেরিকা থেকে গত শনিবার নয়াদিল্লিতে এসেছেন সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা ৩০ বছর বয়সী অভিজিৎ দীপকে। দিল্লির যন্তরমন্তরে শনিবার অনুষ্ঠিত কর্মসূচিতে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে সরব হলো ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। দলের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে সমর্থকদের উদ্দেশে বলেন, তেলাপোকারা ভয় পায় না, লড়াই চলবে। তিনি বলেন, রাষ্ট্রব্যবস্থার কাছে আমরা শুধুই ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ। আমরা তুচ্ছ, সহজেই অবহেলাযোগ্য ও পুরোপুরি আবর্জনার মতো। কিন্তু তেলাপোকা সব পরিবেশেই টিকে থাকে। আপনারা আমাদের দমিয়ে রাখার চেষ্টা করতে পারেন, কিন্তু একেবারে মুছে ফেলতে পারবেন না। দীপকে বলেন, তার দল ‘অলস, বেকার ও চিরসত্যবাদীদের’ প্রতিনিধিত্ব করে। ইন্ডিয়ার ১৪২ কোটি মানুষের অর্ধেকের বেশির বয়স ৩০ বছরের নিচে। এ তরুণদের উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠাই তার দলকে এগিয়ে নিচ্ছে। দেশের পরীক্ষাব্যবস্থায় চলমান সংকট এ তরুণদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিয়েছে।দীপকের মতে, সিজেপি আন্দোলন মূলত বেকারত্ব, গণতন্ত্রের পতন ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি বড় ধরনের অসন্তোষের প্রতিফলন। তিনি বলেন, আমি মনে করি, ইন্ডিয়ার তরুণেরা আজ নিজেদের চরম অবহেলিত ভাবছেন। আমাদের দেশে এখন রেকর্ড বেকারত্ব। শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে এবং সরকারি পরীক্ষা ব্যবস্থা পুরোপুরি কলুষিত হয়ে গেছে। দীপকে বলেন, স¤প্রতি এসব সমস্যা চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে। আর এর বিস্ফোরণ ঘটেছে পরীক্ষার নানা কেলেঙ্কারির মধ্য দিয়ে। মানুষ শুধু হতাশই নয়, বরং তারা দেখছে যে সরকার ও নেতৃত্ব এসব নিয়ে মোটেও মাথা ঘামাচ্ছে না।

সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা ৩০ বছর বয়সী অভিজিৎ দীপকে

ইন্ডিয়ার প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের মন্তব্য পড়ার পর তিনি এ ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক দল গঠন করেন। নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নামের সঙ্গে মিলিয়ে তিনি এর নাম দিয়েছেন সিজেপি। প্রতিবছর লাখ লাখ শিক্ষার্থী ভীষণ প্রতিযোগিতামূলক সরকারি পরীক্ষাগুলোতে অংশ নেন। উচ্চশিক্ষা ও সরকারি চাকরি পাওয়ার কয়েকটি উপায়ের এটি একটি। কিন্তু প্রশ্নপত্র ফাঁস, নম্বর দেওয়ায় ভুল ও কারিগরি ত্রæটি শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ বাড়িয়ে দিয়েছে। এসব ঘটনাকে তারা প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতা হিসেবে দেখছেন। দীপকে বলেন, এসব ব্যর্থতা তরুণদের গভীর হতাশাকে উন্মোচিত করেছে, যা শুধু পরীক্ষার গÐিতে আটকে নেই। ইন্ডিয়া বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম দ্রæত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ। তবু তরুণেরা বলছেন, তাদের আকাক্সক্ষা অনুযায়ী সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। বারবার পরীক্ষা নিয়ে বিতর্কের দায় এড়ানোর জন্য দীপকে সরাসরি সরকারকে অভিযুক্ত করেন। তিনি বলেন, এত বড় একটি বিশৃঙ্খলার পরও একজন শিক্ষামন্ত্রী কীভাবে পদে বহাল থাকেন? এ নির্লিপ্ত ব্যবস্থা আমাদের সবাইকে বিভ্রান্তিতে ফেলছে। রাজধানীর রাজপথে মিছিল করার সময় বিক্ষোভকারীরা ¯েøাগান দেন, ‘তেলাপোকা আসছে, ধর্মেন্দ্র প্রধান যাচ্ছে’।দীপকের প্রতি তরুণদের এ আকর্ষণের অন্যতম কারণ, তার সাদামাটা জীবনকাহিনি। ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য মহারাষ্ট্রের সম্ভাজি নগরে তিনি বেড়ে উঠেছেন। দলিত পরিবারের সন্তান দীপকে জানান, জাতিগত বৈষম্য ও সামাজিক অসমতার অভিজ্ঞতা তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করেছে। দীপকে বলেন, একজন দলিত হিসেবে আমি জীবনকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। তাই বৈষম্য ও অসমতাকে প্রত্যাখ্যান করার বিষয়টি আমার ভেতরে প্রাকৃতিকভাবেই চলে এসেছে।

সিজেপি’র উত্থান বিজেপি’র জন্য কী রাজনৈতিক হুমকি

সাদিত কবির : মোদির জন্য সিজেপির এই উত্থান বেশ অস্বস্তিকর এক সময়ে ঘটেছে। এক দশকের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা তার দল বিজেপি এখনো ইন্ডিয়ার প্রধান রাজনৈতিক শক্তি। তবে ক্রমবর্ধমান এই হতাশা তরুণদের সরাসরি প্রতিবাদের একটি নতুন পথ খুলে দিয়েছে। ‘তেলাপোকা’ আন্দোলন তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বড় রাজনৈতিক হুমকি তৈরি করছে কি না, তা বিচার করতে হবে পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করে। মোদি এখনো বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় নির্বাচিত নেতা।

গত মার্চে প্রকাশিত ‘মর্নিং কনসাল্ট’-এর এক জরিপে দেখা যায়, ইন্ডিয়ার ৬৮ শতাংশ মানুষ তার কাজের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। এটি তাকে বিশ্বের অন্যান্য বড় গণতান্ত্রিক নেতার চেয়ে এগিয়ে রেখেছে। একই সঙ্গে এটি যেকোনো বিরোধী আন্দোলনের জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জও বটে। তারপরও সিজেপির দ্রæত প্রসার বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। মোদির শাসনামলে বেড়ে ওঠা এ নতুন প্রজন্মের কাছ থেকে বিজেপি কোনো বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন এখন সামনে আসছে। তবে সিজেপি মোদির জন্য সরাসরি কোনো নির্বাচনী হুমকি তৈরি করছে, এমন দাবি করা থেকে বিরত থেকেছেন দীপকে। তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো নির্বাচনী দল নই। তবে পরিসংখ্যানই সব বলে দিচ্ছে। পরীক্ষা নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কে ক্ষতিগ্রস্ত লাখ লাখ শিক্ষার্থীর দিকে ইঙ্গিত করেন দীপকে। তিনি বলেন, ‘লাখ লাখ পরিশ্রমী তরুণের ভবিষ্যৎ নষ্ট করে যে নেতৃত্ব একজন অযোগ্য মন্ত্রীকে রক্ষা করে, আপনি সেই নেতৃত্বের প্রতি একটি পুরো প্রজন্মের অনুগত থাকার প্রত্যাশা করতে পারেন না।’ নাগরিক সমাজের প্রচার গোষ্ঠী ‘ভারত জোড়ো অভিযান’-এর জাতীয় আহŸায়ক যোগেন্দ্র যাদব সিজেপি আন্দোলনের তাৎপর্য নিয়ে অতিরিক্ত উচ্ছ¡াস প্রকাশ করতে নিষেধ করেছেন।

‘তেলাপোকা’ আন্দোলন বড় রাজনৈতিক হুমকি তৈরি করছে!

দ্য টেলিগ্রাফকে তিনি বলেন, আমি এখনো সিজেপিকে কোনো আন্দোলন (মুভমেন্ট) হিসেবে দেখি না; এটিকে একটি মুহূর্ত (মোমেন্ট) হিসেবে ধরাই ভালো। যোগেন্দ্র যাদব বলেন, এটি এমন এক মুহূর্ত, যা মোদি সরকারের প্রতি, বিশেষ করে তরুণদের ক্রমবর্ধমান অস্বস্তিকে তুলে ধরে। এটি বিরোধী দলের শূন্যতা এবং তৃণমূল পর্যায়ে জমে থাকা ক্ষোভ, ক্লান্তি ও অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিফলন। যাদব বলেন, সিজেপি সমসাময়িক ইন্ডিয়ার এক গভীর বৈপরীত্যকে সামনে এনেছে। তিনি বলেন, একদিকে মানুষের অসন্তোষ দানা বাঁধছে, অন্যদিকে সরকার ভিন্নমত প্রকাশের সব মাধ্যম (নির্বাচন, গণমাধ্যম, বিচারব্যবস্থা) প্রায় পুরোপুরি নিজেদের কবজায় নিয়ে নিয়েছে। ‘ভারত জোড়ো অভিযান’-এর আহŸায়ক মনে করেন, সিজেপি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বাস্তবতাকে উন্মোচিত করেছে। তিনি আরও বলেন, সংসদীয় বিরোধী দলগুলো মানুষের এই ক্ষোভকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারছে বলে মনে হয় না। আর এ শূন্যস্থান থেকেই হঠাৎ করে এমন একটি প্রতিবাদের জায়গা তৈরি হয়েছে। দীপকে বলেন, আজকের তরুণেরা দলমত-নির্বিশেষে পুরো রাজনৈতিক কাঠামোর প্রতিই এক গভীর ও পদ্ধতিগত অসন্তোষ অনুভব করছেন। প্রথাগত রাজনৈতিক দলগুলো তরুণদের সমস্যা নিয়ে যথাযথভাবে কথা বলে না। তাই তরুণেরা মনে করেন, রাজনীতিতে তাদের কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। প্রথাগত রাজনীতি তরুণদের শুধু একটি ভোটব্যাংক হিসেবে দেখে। তাদের শুধু পাঁচ বছর পর পর নির্বাচনের সময় কাজে লাগানো হয়। দীপকে আরও বলেন, ‘কিন্তু রাজনীতি কোনো মৌসুমি বিষয় নয়; এটি প্রতিনিয়ত জবাবদিহি চাওয়ার একটি দৈনন্দিন কাজ।

শিক্ষা ও কর্মসংস্থান সুযোগের বিশাল ফারাক

মহোসু : সরকারি তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫ সালে ১৫ থেকে ২০ বছর বয়সী ইন্ডিয়ার মধ্যে বেকারত্বের হার ৯ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে এসেছে। আগের বছর এটি ছিল ১০ দশমিক ৩ শতাংশ। তবে বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, গত বছর ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ছিল প্রায় ১৬ শতাংশ। এদিকে আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের সা¤প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০ থেকে ২৯ বছর বয়সী বেকার ইন্ডিয়ানদের ৬৭ শতাংশই স্নাতক পাস। এটি শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগের মধ্যে বিশাল ফারাক তুলে ধরে। তরুণেরা ক্রমাগত অভিযোগ করছেন, নিরাপদ ও ভালো বেতনের চাকরি পাওয়া এখন অনেক কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৪ সালে স্নাতকোত্তর পড়তে আমেরিকায় যাওয়ার আগে দীপকে আম আদমি পার্টির যোগাযোগ কৌশলবিদ হিসেবে কাজ করেছেন। দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন থেকে গড়ে ওঠা এই রাজনৈতিক দলটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের জন্য বেশ পরিচিত। দীপকে বলেন, আমি কোনো ব্যতিক্রমী মানুষ নই। আমার গল্পটা ইন্ডিয়ার লাখ লাখ তরুণেরই গল্প।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ০৮ জুন, ২০২৬ । প্রথম পৃষ্ঠা

অনেক শিক্ষিত ইন্ডিয়ানদের মতো দীপকেও উন্নত ভবিষ্যতের খোঁজে দেশ ছেড়েছিলেন। চাকরি, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিয়ে তাঁর অনুসারীরাও ঠিক একই রকম উদ্বেগের মধ্যে আছেন। তাই তারা খুব সহজে দীপকের সঙ্গে নিজেদের মেলাতে পারেন। দীপকে জানান, তার অনুসারীরা বারবার দুটি আবেগ-উদ্বেগ ও আশার কথা বলেছেন। বছরের পর বছর প্রস্তুতির পর পরীক্ষা বাতিল হয়ে যাওয়ায় অনেকে তাকে নিজেদের কষ্টের কথা লিখেছেন। আবার অনেকে কথা দিয়েছেন, তিনি দিল্লিতে নামলেই তাঁরা আন্দোলনে যোগ দেবেন। দীপকে আরও জানান, কর্তৃপক্ষ আন্দোলন দমানোর চেষ্টা করতে পারে ভেবে অনেকে তাঁকে সতর্ক থাকতে বলেছেন।

ইউডি/এজেএস

Asadujjaman

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading