‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’: ফুটবল জ্বরে কাঁপছে বিশ্ব!
উত্তরদক্ষিণ। বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬, আপডেট ১৬:১৫
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ আসরের পর্দা উঠছে আজ
আজ বৃহস্পতিবার (১১ জুন) পর্দা উঠছে ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের আসরের। ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো ৪৮ দল নিয়ে আমেরিকা, কানাডা ও মেক্সিকোতে হতে যাচ্ছে ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ খ্যাত এই বৈশ্বিক টুর্নামেন্ট। তিন দেশের যৌথ আয়োজনে এটিই প্রথম বিশ্বকাপ। আকার ও আয়োজনের দিক থেকে এটি ইতিহাসের সবচেয়ে বৃহৎ বিশ্বকাপ। আজ বৃহস্পতিবার মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক এস্তাদিও আজটেকা স্টেডিয়ামে টুর্নামেন্টের উদ্বোধন হবে। সহ-আয়োজক মেক্সিকো স্থানীয় সময় বিকেল ৩টা ও বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় দক্ষিণ আফ্রিকার মুখোমুখি হবে। প্রায় ছয় সপ্তাহব্যাপী এই বিশাল আয়োজনের পরিসমাপ্তি ঘটবে ১৯ জুলাই আমেরিকার নিউ জার্সির ৮২,৫০০ আসনবিশিষ্ট মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ফাইনালের মাধ্যমে। বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬ এর বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বিশেষ প্রতিবেদন…
মঞ্চ প্রস্তুত উত্তর আমেরিকায়: তিন দেশের ১৬ ভেন্যুতে ৪৮ দলের ‘মহাযুদ্ধ’
মো. আসাদুজ্জামান : আজ পর্দা উঠতে যাচ্ছে ক্রীড়া বিশ্বের অন্যতম জাঁকজমকপূর্ণ আসর ফিফা বিশ্বকাপের। প্রথমবারের মতো তিনটি আয়োজক দেশ আমরিকা, মেক্সিকো এবং কানাডা একসঙ্গে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপের আনুষ্ঠানিক সূচনা করবে। আমেরিকা ১৯৯৪ সালে এবং মেক্সিকো ১৯৭০ ও ১৯৮৬ সালে টুর্নামেন্টটি আয়োজন করলেও, এবারই প্রথমবারের মতো কানাডা বিশ্বকাপ আয়োজন করতে যাচ্ছে। এবার তিন দেশের মোট ১৬টি ভেন্যুতে বিশ্বকাপের মোট ১০৪টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। আজ বৃহস্পতিবার (১১ জুন) ম্যাক্সিকোর ঐতিহাসিক এস্তাদিও আজতেকায় (আজটেকা স্টেডিয়াম) ম্যাক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যকার ম্যাচ দিয়ে শুরু হচ্ছে বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের খেলা। আর ১৯ জুলাই আমেরিকার নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ফাইনালের মধ্য দিয়ে শেষ হবে ৩৯ দিনের এই আসর।
বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান উত্তর আমেরিকার তিনটি দেশ-মেক্সিকো, কানাডা ও আমেরিকায় একসঙ্গে আয়োজিত হবে। এই প্রথমবারের মতো একটি বিশ্বকাপ তিন দেশে সমান্তরালভাবে উদ্বোধন করা হচ্ছে। প্রতিটি অনুষ্ঠান শুরু হবে সংশ্লিষ্ট আয়োজক দেশের উদ্বোধনী ম্যাচের ৯০ মিনিট আগে। তিনটি অনুষ্ঠান আলাদা হলেও এগুলো একটি অভিন্ন থিমের মাধ্যমে যুক্ত থাকবে—যেখানে ফুটবলের মাধ্যমে মানুষকে সীমান্ত পেরিয়ে একত্রিত করার বার্তা তুলে ধরা হবে। অনুষ্ঠানগুলোর প্রযোজক হিসেবে দায়িত্বে আছেন মার্কো বালি। তিনি একাধিক অলিম্পিক উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও বড় আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ইভেন্টের ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করেছেন।

মেক্সিকো সিটির এস্তাদিও আজতেকায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে, এতে শাকিরা অংশ নেবেন
তিনি জানিয়েছেন, প্রতিটি শো আলাদা বৈশিষ্ট্য বহন করলেও সবগুলোই ফুটবলের ঐক্যের বার্তার সঙ্গে যুক্ত থাকবে। প্রতিটি দেশ নিজেদের সংস্কৃতি ও ভিজ্যুয়াল পরিচয় তুলে ধরবে। কানাডা: ‘কালচারাল মোজাইক’ বা সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য। মেক্সিকো: ঐতিহ্যবাহী ‘পাপেল পিকাডো’ শিল্প। আমেরিকা: ‘ঝলমলে, উজ্জ্বল’ কাপ থিম ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো বলেন, ‘বিশ্বকাপের সূচনা এমন একটি মুহূর্ত, যা পুরো বিশ্ব একসঙ্গে ভাগ করে নেয়। মেক্সিকো সিটি থেকে শুরু হয়ে টরন্টো ও লস অ্যাঞ্জেলেসে এই অনুষ্ঠানগুলো অনুষ্ঠিত হবে, যা সংগীত, সংস্কৃতি ও ফুটবলের এক অভিন্ন উদ্যাপন হবে।’ সময় ও স্থানভিত্তিক আয়োজন: মেক্সিকো সিটি (১১ জুন)-মেক্সিকো সিটির এস্তাদিও আজতেকায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে স্বদেশীয় সংস্কৃতি, আধুনিক লোকশিল্প এবং ‘পাপেল পিকাডো’ প্রদর্শিত হবে। এতে শাকিরা, জে বালভিন, মানা, লিলা ডাউনসসহ আরও অনেক আন্তর্জাতিক সংগীতশিল্পী অংশ নেবেন। টরন্টো (১২ জুন)- কানাডার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান টরন্টো স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে।
এখানে দেশটির বৈচিত্র্য ও সাংস্কৃতিক মিশ্রণ তুলে ধরা হবে। এতে পারফর্ম করবেন আলানিস মরিসেট, মাইকেল বুবলে, এলেসিয়া কারা, জেসি রেইজস, নোরা ফাতেহি, সঞ্জয়সহ অনেকে। এটি কানাডার জন্য ঘরের মাটিতে প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচের আগে একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত হবে। লস অ্যাঞ্জেলেস (১২ জুন)- আমেরিকার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আয়োজিত হবে লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়ামে। এতে থাকবে বৃহৎ ভিজ্যুয়াল শো এবং কেটি পেরি, ফিউচার, আনিতা, এলএলএ ও রেমার মতো প্রমুখ শিল্পিদের পারফরম্যান্স। প্রতিটি অনুষ্ঠানের পর মাঠে খেলোয়াড়দের ওয়ার্ম-আপ, প্রি-ম্যাচ অনুষ্ঠান এবং আনুষ্ঠানিক কিক-অফ প্রোটোকল সম্পন্ন হবে। মেক্সিকো সিটির অনুষ্ঠান প্রায় ১৬ মিনিট ৩০ সেকেন্ড, আর টরন্টো ও লস অ্যাঞ্জেলেসের অনুষ্ঠান প্রায় ১৩ মিনিট করে চলবে।
ইতিহাস সৃষ্টিতে আত্মবিশ্বাসী ফিফা, তবুও নানা সংশয়!
আবদুল্লাহ সিফাত : ৩৮ বছর বয়সে লিওনেল মেসি কি আর্জেন্টিনাকে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জিতিয়ে সর্বকালের সেরা ফুটবলার হওয়া নিয়ে বাকি বিতর্কের অবসান ঘটাতে পারবেন? নাকি তার চিরপ্রতিদ্ব›দ্বী ৪১ বছর বয়সী ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো সময়কে হার মানিয়ে প্রতিভাবান পর্তুগাল দলকে প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপা এনে দেবেন? অথবা হ্যারি কেনের নেতৃত্বে ইংল্যান্ড কি ১৯৬৬ সালের একমাত্র বিশ্বকাপ জয়ের পর দীর্ঘ ৬০ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে দ্বিতীয় বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা জিতবে? এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে এবারের বিশ^কাপ ফুটবল ২০২৬ আসরের বিভিন্ন পর্যায়ে। বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এই আসরকে ‘পৃথিবী কখনও দেখেনি এমন সর্বশ্রেষ্ঠ প্রদর্শনী’ বলে অভিহিত করেছেন। তবে ইনফান্তিনোর এই আশাবাদকে চ্যালেঞ্জ করেছে নানা সংশয়।
টুর্নামেন্ট শুরুর আগে থেকেই টিকিটের মূল্য, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সংঘাত নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। টিকিটের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি বিশ্বজুড়ে সমর্থকদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। ফিফা ও ইনফান্তিনা এ নিয়ে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। ২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালের সবচেয়ে দামি টিকিটের মূল্য ছিল প্রায় ১৬০০ ডলার। অথচ ২০২৬ সালে ফিফার বিক্রি করা সবচেয়ে দামি টিকিটের মূল্য ৩২৯৭০ ডলার। ১০৪টি ম্যাচজুড়ে এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব দেখা গেছে। ব্যাপক চাহিদা থাকা সত্তে¡ও অনেক ম্যাচের টিকিট এখনও পুনর্বিক্রয় বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। এমনকি ইনফান্তিনোর ঘনিষ্ঠ মিত্র খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এই মূল্য নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।

শুক্রবার লস অ্যাঞ্জেলেসে আমেরিকা ও প্যারাগুয়ের ম্যাচের টিকিটের মূল্য ১,০০০ ডলার শুনে তিনি বলেন, সত্যি বলতে, আমিও এত টাকা দিয়ে টিকিট কিনতাম না। ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা-ইসরায়েলের সামরিক হামলার প্রভাবও বিশ্বকাপের ওপর পড়েছে। ইরানের তিনটি গ্রæপ ম্যাচই আমেরিকায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা, যার প্রথমটি ১৫ জুন নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে।ইরান তাদের বেস ক্যাম্প অ্যারিজোনার টাকসন থেকে সরিয়ে মেক্সিকোর তিহুয়নায় নিয়ে গেছে। খেলোয়াড়রা আমেরিকায় প্রবেশের অনুমতি পেলেও, দলের প্রায় ১৫ জন প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনা কর্মীকে মার্কিন কর্তৃপক্ষ ভিসা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ইরান এ ঘটনাকে “ইচ্ছাকৃত ও বৈষম্যমূলক আচরণ” বলে নিন্দা করেছে।
এবারের আসরে দলসংখ্যা ৩২ থেকে বাড়িয়ে ৪৮ করায় গ্রæপ পর্বের প্রতিযোগিতামূলক উত্তেজনা কিছুটা কমে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রথম রাউন্ডে মোট ৭২টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে, অথচ বাদ পড়বে মাত্র ১২টি দল। নকআউট পর্বে উঠবে ৩২টি দল- প্রতিটি গ্রæপের শীর্ষ দুই দল এবং সেরা আটটি তৃতীয় স্থানধারী দল। এই বিশ্বকাপে আরও বেশ কিছু নতুনত্ব দেখা যাবে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রতিটি ম্যাচে দুই অর্ধের মাঝামাঝি সময়ে কুলিং ব্রেক থাকবে, যাতে তীব্র গরম ও আর্দ্রতার প্রভাব কমানো যায়। আগামী মাসের ফাইনাল ম্যাচটি ইতিহাসের দীর্ঘতম ফাইনালগুলোর একটি হতে পারে। কারণ এতে সুপার বোল-ধাঁচের হাফটাইম শো আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যেখানে ম্যাডোনা, শাকিরা ও বিটিএস প্রধান আকর্ষণ হিসেবে থাকবেন। এর ফলে প্রচলিত ১৫ মিনিটের বিরতির পরিবর্তে হাফটাইম বিরতি প্রায় ২৫ মিনিট দীর্ঘ হবে।
দুই অবিসংবাদিত মহাতারকার ‘দ্য লাস্ট ড্যান্স’
আরাফাত রহমান : দুই দশকের এক অবিশ্বাস্য দ্বৈরথ। ফুটবল বিশ্বের চেনা সমীকরণগুলো যখন একটু একটু করে বদলে যাচ্ছে, ঠিক তখনই আরও একবার একই বিন্দুতে এসে মিলছেন লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। ২০২৬ সালের উত্তর আমেরিকার বিশ্বকাপ কেবল আরেকটি টুর্নামেন্ট নয়, ফুটবল ইতিহাসের দুই অবিসংবাদিত মহাতারকার জন্য এটিই হতে যাচ্ছে ‘দ্য লাস্ট ড্যান্স’ বা শেষ নৃত্য। প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার এক অনন্য কীর্তি গড়ার অপেক্ষায় আছেন তারা। তবে এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর আকর্ষণ লুকিয়ে আছে নকআউট পর্বের এক সম্ভাব্য সমীকরণে। যদি আর্জেন্টিনা ও পর্তুগাল-দুই দলই নিজ নিজ গ্রুপে চ্যাম্পিয়ন হয়ে নকআউট পর্বের বাধা পেরোতে পারে, তবে আগামী ১১ জুলাই ক্যানসাস সিটিতে কোয়ার্টার ফাইনালেই মুখোমুখি হবেন মেসি ও রোনালদো।
ফুটবল ইতিহাসের শেষ ও সবচেয়ে বড় মঞ্চে এই দুই চিরপ্রতিদ্ব›দ্বীর লড়াই দেখার চেয়ে আকর্ষণীয় আর কী হতে পারে! মেসির সামনে দুটি বড় মাইলফলক: ২০২২ সালে কাতারের দোহায় যখন ফ্রান্সকে টাইব্রেকারে হারিয়ে আর্জেন্টিনা বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হলো, অনেকেই ভেবেছিলেন মেসির ক্যারিয়ারের গল্পটা ওখানেই শেষ। মেসি নিজেও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, এরপর আর খেলা চালিয়ে যাওয়ার খুব একটা মানে হয় না। পিএসজির পাট চুকিয়ে ইন্টার মায়ামির সঙ্গে আমেরিকার মেজর লিগ সকারে যোগ দেওয়ার পরও তার জাদুকরি ফর্ম অক্ষুণ্ন। গত বছর মায়ামিকে এমএলএস কাপ জেতানো এই বার্সেলোনা কিংবদন্তি ২০২৪ সালেও আর্জেন্টিনাকে কোপা আমেরিকা জিতিয়েছেন। দক্ষিণ আমেরিকান অঞ্চলের বিশ্বকাপ বাছাইপর্বেও ছিলেন সর্বোচ্চ গোলদাতা। ৩৯ ছুঁইছুঁই মেসি স¤প্রতি বলেছেন, আমি ফুটবল খেলতে ভালোবাসি এবং যতদিন পারব, ততদিন খেলে যাব। ২০০ আন্তর্জাতিক ম্যাচ: মাইলফলকটি ছুঁতে তাঁর প্রয়োজন আর মাত্র দুটি ম্যাচ। ক্লোসার রেকর্ড: বিশ্বকাপে মেসির বর্তমান গোল ১৩টি।

লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো
গ্রুপ পর্বে আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া ও জর্ডানের মতো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মিরো¯øাভ ক্লোসার ১৬ গোলের রেকর্ডটি ভেঙে দেওয়া তার জন্য অসম্ভব কিছু নয়। বয়সের বিচারে মেসির চেয়ে দুই বছরের বড় ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। তবে ৪১ বছর বয়সে এসেও আন্তর্জাতিক ফুটবল এবং আল নাসরের সঙ্গে সৌদি প্রো লিগের শিরোপা জয়ের দৌড়ে সমান ক্ষুধার্ত এই পর্তুগিজ উইঙ্গার। ২০০৬ সালে পর্তুগালকে সেমিফাইনালে তোলার পর থেকে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে তার দল খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি। ২০২২ সালেও সুইজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে নকআউটের ম্যাচে তাকে সাইডবেঞ্চে বসে থাকতে হয়েছিল। তবে রবার্তো মার্টিনেজ কোচের দায়িত্ব নেওয়ার পর রোনালদোকে আবার দলের প্রধান স্ট্রাইকার হিসেবে ফিরিয়ে আনেন। ২২৬টি ম্যাচ খেলে পুরুষ ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা
এই সাবেক রিয়াল মাদ্রিদ তারকা সম্প্রতি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, আমি ৪১ বছরে পদার্পণ করতে যাচ্ছি এবং আমার মনে হয় এটাই (বিশ্বকাপ) শেষ করার সঠিক সময়। পর্তুগাল এবার কলম্বিয়া, উজবেকিস্তান ও ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর সঙ্গে একই গ্রæপে থেকে মাঠে নামবে। রোনালদোর উপস্থিতি নিয়ে দলে কিছু বিতর্ক থাকলেও কোচ মার্টিনেজ তার ওপর পূর্ণ আস্থা রাখছেন, ‘তিনি আমাদের অধিনায়ক এবং দেশের প্রতি এক অনুকরণীয় দায়বদ্ধতা প্রদর্শন করেন।’ রোনালদোর লক্ষ্য এখন একটাই—বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে নিজের প্রথম গোলের দেখা পাওয়া এবং শেষবারের মতো সোনালি ট্রফিটা উঁচিয়ে ধরা। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর চোখ এখন গ্রæপ পর্বের হিসাব-নিকাশের দিকে। যদি হিসাব মিলে যায়, তবে ১১ জুলাই ক্যানসাস সিটির কোয়ার্টার ফাইনালটি আর কেবল একটি ম্যাচ থাকবে না; সেটি হবে দুই দশকের এক রাজকীয় দ্বৈরথের চূড়ান্ত এবং শেষ অধ্যায়। এক পাশে বিশ্বজয়ের পর মুকুট ধরে রাখার মিশন, অন্য পাশে ক্যারিয়ারের শেষ বেলায় এসে শ্রেষ্ঠত্বের শেষ অধ্যায় লেখার লড়াই। ফুটবল বিশ্ব কি তৈরি হচ্ছে ইতিহাসের সেরা ‘লাস্ট ড্যান্স’ দেখার জন্য?
নেইমারকে শুরুতেই কী পাচ্ছে সেলেসাওরা?
রিন্টু হাসান : নেইমার কবে সুস্থ হবেন- এ নিয়ে সমর্থকদের উৎকণ্ঠা কম নয়। তবে আশার খবর মিলেছে। পায়ের পেশির চোট থেকে দ্রæত সেরে উঠছেন ব্রাজিলের অন্যতম ফরোয়ার্ড। ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (সিবিএফ) নিশ্চিত করেছে, নেইমারের চোটের জায়গায় ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। গত ২৮ মে স্ক্যান রিপোর্টে নেইমারের পায়ে গ্রেড-টু পেশি ছিঁড়ে যাওয়ার তথ্য মিলেছিল। তখন ধারণা করা হয়েছিল, বিশ্বকাপ শুরুর আগে অন্তত তিন সপ্তাহ মাঠের বাইরে থাকতে হবে ৩৪ বছর বয়সী এই তারকাকে। তবে ব্রাজিলের মেডিকেল টিম তার আরও একটি স্ক্যান করার পর ইতিবাচক রিপোর্ট পেয়েছে। এক সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে সিবিএফ জানায়, নতুন স্ক্যান রিপোর্টে নেইমারের চিকিৎসার ভালো অগ্রগতি দেখা গেছে, যা আমাদের প্রত্যাশার ভেতরেই আছে। জাতীয় দলের মেডিকেল স্টাফদের পরিকল্পনা অনুযায়ী সে এখন পুনর্বাসন এবং শারীরিক ফিটনেস ফিরে পাওয়ার প্রক্রিয়া চালিয়ে যাবে। স্ক্যান রিপোর্টে পজিটিভ আসায় নেইমার দ্রত অনুশীলনে ফিরে মরক্কোর বিপক্ষে স্কোয়াডে অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন।

নেইমার কবে সুস্থ হবেন- এ নিয়ে সমর্থকদের উৎকণ্ঠা কম নয়
এর আগে চোটের কারণে ব্রাজিলের খেলা গত দুটি প্রস্তুতি ম্যাচেই মাঠে নামতে পারেননি তিনি। তাকে ছাড়াই পানামাকে ৬-২ এবং মিশরকে ২-১ ব্যবধানে হারায় সেলেসাওরা। ব্রাজিলের জার্সিতে ১২৮ ম্যাচে ৭৯ গোল করে সেলেসাওদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা নেইমার। ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২২ সংস্করণের পর এই তারকার সামনে এবার চতুর্থ বিশ্বকাপ রাঙানোর সুযোগ। আগের তিনবার বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে ১৩ ম্যাচে ৮ গোল করেছেন তিনি। ১৩ জুন মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করবে ব্রাজিল। গ্রæপ পর্বে মরক্কো ছাড়াও সেলেসাওদের অন্য দুই প্রতিপক্ষ স্কটল্যান্ড ও হাইতি।
এমবাপে যা বলছেন তা কী সত্যি হতে পারে?
মহোসু : বিশ্বকাপে ফ্রান্সের লক্ষ্য নিয়ে কোনো ধরনের ধোঁয়াশা রাখলেন না কিলিয়ান এমবাপে। রিয়াল মাদ্রিদের এই তারকা ফরোয়ার্ড স্পষ্ট জানিয়ে রাখলেন, অন্য কিছু নয়-দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থে ফরাসিদের একমাত্র লক্ষ্য থাকবে শিরোপা জেতা। বিশ্বকাপে ‘আই’ গ্রæপে ফ্রান্সের প্রতিপক্ষ সেনেগাল, ইরাক ও নরওয়ে। সেনেগালের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে আগামী ১৭ জুন বিশ্বকাপ মিশন শুরু করবে দুইবারের চ্যাম্পিয়নরা। বিশ্বকাপের মূল পর্ব শুরুর আগে প্রস্তুতিতে মিশ্র অভিজ্ঞতা হলো দিদিয়ের দেশমের দলের। গা গরমের প্রথম ম্যাচে আইভোরি কোস্টের কাছে ২-১ গোলে হেরে যায়। তবে ঘুরে দাঁড়িয়ে নর্দান আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ৩-১ ব্যবধানের জয় তুলে নিয়েছে গত আসরের রানার্সআপরা। নর্দান আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে এমবাপে গোল করতে পারেননি। তুলনামূলকভাবে নীরব পারফরম্যান্স সত্তে¡ও তিনি এখনো জাতীয় দলের সবচেয়ে বড় ভরসা।

কিলিয়ান এমবাপে
বিশ্বকাপ চলাকালে ফ্রান্সের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা অলিভিয়ের জিরুর রেকর্ড ছুঁতে বা ছাড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকছে এমবাপে সামনে। শেষ প্রীতি ম্যাচে জয়ের পর সাংবাদিকদের এমবাপে বলেন, আমাদের একমাত্র লক্ষ্য হলো বিশ্বকাপ জেতা। আমরা আমেরিকা যাচ্ছি বিশ্বকাপ জিততে। বাইরে থেকে যেভাবে বলা হচ্ছে-সেমিফাইনালে পৌঁছানোই নাকি লক্ষ্য। আমি এটা বুঝতে পারি না। যদি লক্ষ্য শুধু সেমিফাইনালই হতো, তাহলে কি আমরা সেখানে পৌঁছে খেলা থামিয়ে বাড়ি ফিরে আসতাম? না। লক্ষ্য হলো বিশ্বকাপ জেতা। এটা সবার স্বপ্ন। এমবাপে এমন সময় এসব মন্তব্য করলেন, যখন ফরাসি সংবাদমাধ্যমে দলের লক্ষ্য ও পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তর আলোচনা চলছে। স্থানীয় প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফরাসি ফুটবল ফেডারেশন সেমিফাইনালে পৌঁছানোকে ন্যূনতম লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছে-যা খেলোয়াড়দের বোনাস কাঠামোর সঙ্গেও সম্পর্কিত। তবে এমবাপে পরিষ্কার করে দিলেন, মাঝারি মানের লক্ষ্য নিয়ে বিশ্বকাপে যেতে চান না তিনি। সবশেষ দুই বিশ্বকাপে টানা ফাইনালে ওঠেছিল ফ্রান্স। রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত ২০১৮ বিশ্বকাপের ফাইনালে ক্রোয়েশিয়াকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ইউরোপের জায়ান্টরা। তবে কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে টাইব্রেকারে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয় দেশমের দলের।
ফুটবলের সবচেয়ে বড় মহোৎসব ঘিরে বাংলাদেশেও উন্মাদনা তুঙ্গে
ভৌগোলিক দূরত্বের হিসাবে উত্তর আমেরিকা বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে। কিন্তু ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬-এর উন্মাদনার পারদ মাপলে মনে হবে, মারাকানা কিংবা বুয়েনস আইরেস বুঝি ঢাকা শহরেরই কোনো এক পাড়া-মহল্লায় এসে ঠাঁই নিয়েছে! বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় এই মহোৎসব ঘিরে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া মজেছে ফুটবল ক্রেজে। পাড়ার দেয়ালে নতুন রঙের প্রলেপ, ছাদে ছাদে উড়তে থাকা বিশাল পতাকা, আর গুলিস্তান-নিউ মার্কেটের উপচে পড়া ভিড় জানান দিচ্ছে বাঙালি তার প্রিয় ‘ফুটবল উৎসব’ উদযাপনে পুরোপুরি প্রস্তুত। রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন ইলেকট্রনিক্স ও ডেকোরেটরের দোকানে প্রজেক্টর এবং সাউন্ড সিস্টেম ভাড়ার ধুম পড়েছে। বিশ্বকাপ মানেই জার্সির বাজারে নতুন প্রাণ। রাজধানীর গুলিস্তান, নিউ মার্কেট, বায়তুল মোকাররম সংলগ্ন ক্রীড়া সামগ্রীর দোকানগুলো এখন ফুটবলপ্রেমীদের পদচারণায় মুখর।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ১১ জুন ২০২৬ । প্রথম পৃষ্ঠা
আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা আর ব্রাজিলের হলুদ-সবুজ জার্সির চাহিদা সবচেয়ে বেশি। দোকানগুলোতে থাই রেপ্লিকা থেকে শুরু করে প্লেয়ার এডিশন; সব ধরনের জার্সিই বিক্রি হচ্ছে দেদারসে। শুধু জার্সি নয়, দর্জি পাড়াগুলোতেও এখন দম ফেলার ফুসরত নেই। বিশ্বকাপ এলেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শুরু হয় বিশাল পতাকা তৈরির প্রতিযোগিতা। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। দর্জি ও টেইলার্স পাড়াগুলোতে চলছে নির্ঘুম কর্মযজ্ঞ। কেউ বানাচ্ছেন ১০০ ফুট দীর্ঘ পতাকা, কেউবা আরও বড় কিছু করার পরিকল্পনায় ব্যস্ত। বিভিন্ন জেলার সমর্থক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় পতাকা তৈরির অলিখিত প্রতিযোগিতাও শুরু হয়ে গেছে। বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো উত্তর আমেরিকার সময় অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হওয়ায় বাংলাদেশের দর্শকদের অনেক ম্যাচই গভীর রাত কিংবা ভোরে দেখতে হবে। কিন্তু তাতেও আগ্রহে এতটুকু ভাটা পড়েনি ফুটবলপ্রেমীদের। বাংলাদেশ দল বিশ্বকাপে না খেললেও, দেশের মানুষের এই ফুটবলপ্রেম প্রমাণ করে ফুটবল এখানে শুধু একটি খেলা নয়, এটি বাঙালির সংস্কৃতির অংশ, এক মাসব্যাপী এক সার্বজনীন উৎসবের অন্য নাম।
ইউডি/এজেএস

