রোনালদো জানিয়ে দিলেন এটাই শেষ বিশ্বকাপ

রোনালদো জানিয়ে দিলেন এটাই শেষ বিশ্বকাপ

উত্তরদক্ষিণ। সোমবার, ০৬ জুলাই, ২০২৬, আপডেট ১৬:৩৫

মঞ্চটা এবার সত্যিই শেষ বারের মতো সাজানো। বয়স ৪১, পায়ে দুই দশকেরও বেশি সময়ের ক্লান্তহীন দৌড়। আর সেই চিরচেনা আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠস্বরের ঘোষণা ‘হ্যাঁ, এটাই আমার শেষ বিশ্বকাপ।’

স্পেনের বিপক্ষে পর্তুগালের মহাগুরুত্বপূর্ণ শেষ ষোলোর লড়াই। মাঠের যুদ্ধ শুরুর আগে অবধারিতভাবেই সংবাদ সম্মেলনের সব আলো কেড়ে নিলেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। নিজের ভবিষ্যৎ, তুমুল সমালোচনা আর ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্ন নিয়ে কথা বললেন একদম খোলামেলা মেজাজে।

শুরুতেই ধেয়ে এসেছিল সমালোচকদের বাণ। বিশেষ করে প্রথম ম্যাচের পর থিয়েরি অঁরি যখন বলেছিলেন, ‘দলের গোল দরকার, শুধু তোমার গোল নয়’ তখন থেকেই একাদশে রোনালদোর জায়গা পাওয়া নিয়ে উঠছিল প্রশ্ন।

তবে সিআরসেভেন বরাবরের মতোই অবিচল। বিগত ২৩ বছর ধরে সমালোচকেরা তাকে শেষ করে দিতে চেয়েও যে পারেনি, তা মনে করিয়ে দিয়ে রোনালদো স্পষ্ট জানান, তার সতীর্থরা সব সময় তার পাশেই আছেন। বাকি দুনিয়া কী বলল, তা তার কাছে স্রেফ ‘মূল্যহীন আবর্জনা’। বারবার ঘুরেফিরে আসা সেই একটি প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে পর্তুগিজ মহাতারকা অবশেষে মেনে নিলেন বিদায়ের অমোঘ সত্যকে। আলতো হেসে জানালেন, তিনি প্রতিটি দিন যতটা সম্ভব উপভোগ করছেন। এরপরই উচ্চারণ করলেন সেই কাঙ্ক্ষিত বাক্য, ‘হ্যাঁ, এটাই আমার শেষ বিশ্বকাপ।’

তবে বিদায়ের সুরের মাঝেও নিজের চিরকালীন অহংবোধ হারাতে দেননি। রোনালদো পরিষ্কার করে দিয়েছেন, বুটজোড়া তুলে রাখার সিদ্ধান্তটা কেবলই তার একান্ত ব্যক্তিগত। সাংবাদিকদের উদ্দেশ্য করে রসিকতার সুরে তিনি বলেন, ‘আমি আগেও বলেছি, আমি তখনই শেষ করব যখন আমি চাইব। তোমরা যখন চাইবে তখন নয়।’ হাসতে হাসতে যোগ করেন, সমালোচকেরা যে তাকে আর মাঠে দেখতে চান না, সে কথাও তিনি বেশ ভালোই বোঝেন।

রোনালদোর কাছে এখন ফুটবলের চেয়েও কঠিন কাজ হলো সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হওয়া, বিশেষ করে যারা তাকে পছন্দ করে না। নিজের প্রখর স্মৃতির কথা উল্লেখ করে তিনি মজার ছলে বলেন, মানুষের মুখ তিনি খুব ভালো মনে রাখতে পারেন।

বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফিটা ক্যাবিনেটে না উঠলে কি রোনালদোর প্রাপ্তি অপূর্ণ থেকে যাবে? এই প্রশ্নের জবাবে ট্রফি আর শ্রেষ্ঠত্বের চিরন্তন সমীকরণটা এক ফুঁৎকারে উড়িয়ে দিলেন সিআরসেভেন। তার মতে, ট্রফি জয়-পরাজয় দিয়ে তার মহত্ত্ব মাপা অসম্ভব। নিজের ভেতরের তৃপ্তির কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিশ্বকাপ জিতলে আমি আরও বেশি ক্রিস্টিয়ানো হয়ে যাব না। আর না জিতলেও আমি কম ক্রিস্টিয়ানো হয়ে যাব না। সোমবার যা-ই হোক, আমি একদম পরিষ্কার বিবেক নিয়ে মাঠ ছাড়ব। ১০০ শতাংশ নয়, ১,০০০ শতাংশ।’

চল্লিশের কোঠা পার করে জীবনকে এক নতুন আলোয় দেখছেন এই কিংবদন্তি। আর তাই চিরশত্রু সমালোচকদের প্রতিও এবার তার কণ্ঠে ঝরল অন্যরকম কৃতজ্ঞতা। রোনালদো অকপটে স্বীকার করেন যে, সবচেয়ে বড় সমালোচনা থেকেই মানুষ হিসেবে সবচেয়ে বেশি বেড়ে ওঠা যায়। তাকে প্রতিদিন আরও উন্নত করার পেছনে পরোক্ষ অবদানের জন্য সমালোচকদের ধন্যবাদ জানাতেও ভুললেন না তিনি।

ম্যাচের প্রতিপক্ষ স্পেনকে এবারের আসরের অন্যতম দাবিদার মেনে নিয়ে স্প্যানিশ তরুণ তুর্কি লামিনে ইয়ামালকে এক মূল্যবান পরামর্শ দিলেন রোনালদো। ১৮ বছর বয়সী এই বিস্ময় বালকের দারুণ ভবিষ্যতের শুভকামনা জানিয়ে তিনি বলেন, ইয়ামালকে যত দ্রুত সম্ভব সমালোচনার সঙ্গে মানিয়ে নিতে শিখতে হবে। ফুটবলাররাও যে মানুষ এবং তাদের জীবনেও যে খারাপ দিন আসতে পারে, সেই রূঢ় বাস্তবতার কথাও মনে করিয়ে দেন তিনি।

এবারের বিশ্বকাপ রোনালদোর কাছে আবেগের দিক থেকে একদম ভিন্ন। এক বছর আগে না-ফেরার দেশে চলে যাওয়া সতীর্থ ডিয়োগো জোটার স্মৃতিকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে পুরো পর্তুগাল দল। মাঠের ফুটবল তো বটেই, ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে এসে দুনিয়াজুড়ে ভক্তদের যে অকৃত্রিম ভালোবাসা তিনি পেয়েছেন, তা-ই এই বিশ্বকাপকে তার হৃদয়ের সবচেয়ে কাছে টেনে নিয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনের ইতি টানলেন সেই চেনা চওড়া হাসিতে। চিরকাল চাপের মুখে বুক চিতিয়ে লড়াই করা ফুটবল জাদুকর শেষ পাতে সাংবাদিকদের একটু খোঁচা দিয়ে বললেন, ‘ঈশ্বর চাইলে আগামীকাল যেন আমার শেষ ম্যাচ না হয়। তাহলে তোমরা আমাকে আরও একটু ‘মেরে ফেলতে’ পারবে! চেষ্টা করে যাও।’

রোনালদো লড়বেন, তবে মাঠের ফল যা-ই হোক, ইতিহাসে রোনালদোর নাম লিখা হয়ে গেছে সর্বকালের সেরাদের একজন হিসেবে।

ইউডি/রেজা

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading