নারী মরদেহের ময়নাতদন্তে নারী ডোম নিয়োগ দিতে হাইকোর্টের রুল

নারী মরদেহের ময়নাতদন্তে নারী ডোম নিয়োগ দিতে হাইকোর্টের রুল

উত্তরদক্ষিণ। রবিবার, ১৯ জুলাই, ২০২৬, আপডেট ১৫:৫০

সড়ক দুর্ঘটনা বা অন্যান্য কারণে নিহত নারীদের মৃতদেহের ময়নাতদন্তের (পোস্টমর্টেম) কাজে কেন ‘নারী ডোম’ নিয়োগ দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট।

জনস্বার্থে দায়ের করা এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে বিচারপতি ফাহমিদা কাদের এবং বিচারপতি মো. আসিফ হাসানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রুল জারি করেন।

আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. মনির উদ্দিন।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্টদের এই রিটে বিবাদী করা হয়েছে এবং তাদের রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।

হাসপাতালগুলোতে নারী লাশের ময়নাতদন্তের জন্য অন্তত একজন করে নারী ডোম নিয়োগের নির্দেশনা চেয়ে গত ৩০ জুন জনস্বার্থে রিটটি দায়ের করেন আইনজীবী মনির উদ্দিন।

রিট আবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ একটি ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ রাষ্ট্র। ইসলাম ধর্মসহ সব ধর্মে নারীর মৃতদেহ সতর বা পর্দার অন্তরালে রাখার বিধান রয়েছে। ময়নাতদন্ত একটি আইনি প্রক্রিয়া হলেও নারীর ক্ষেত্রে পরপুরুষের স্পর্শ বা উপস্থিতি গ্রহণযোগ্য নয়।

মানবাধিকার সনদ অনুযায়ী, মৃত্যুর পরও একজন মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন নিশ্চিত করা জরুরি। নারী ডোম থাকলে মৃত নারীর গোপনীয়তা ও মর্যাদা রক্ষা পাবে এবং বৈষম্য দূর হবে।

আবেদনে পরিবারের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকটি তুলে ধরে বলা হয়, সড়ক দুর্ঘটনা বা অন্য কোনো কারণে কোনো নারী মারা গেলে তার পরিবার এমনিতেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকে। এহেন পরিস্থিতিতে যখন তারা জানতে পারে কোনো পুরুষ সদস্য তাদের পরিবারের প্রিয় নারী সদস্যের ময়নাতদন্ত করবে, তখন তা আরও হৃদয়বিদারক হয়ে ওঠে। কোনো নারী ডোম কাজটি করলে ওই দুঃসময়ে তারা অন্তত একটু সান্ত্বনা পেত। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আধুনিক সমাজে নারীরা সব ক্ষেত্রেই পুরুষের পাশাপাশি কাজ করছে, তাই নারী রোগীর বা মৃতদেহের সুরক্ষা নিশ্চিত করা একটি যুগোপযোগী চাহিদা।

মর্গে পুরুষ ডোমদের দ্বারা নারী মৃতদেহের সঙ্গে বিকৃত যৌনাচারের (নেক্রোফিলিয়া) অতীত ঘটনাগুলোই এই রিট দায়েরের অন্যতম কারণ।

রিট আবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২২ সালের ২৫ অক্টোবর ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের মর্গে ময়নাতদন্তের জন্য রাখা এক তরুণীর মৃতদেহের সঙ্গে বিকৃত যৌনাচার করার অভিযোগ ওঠে ডোম আবু সাঈদের (২৯) বিরুদ্ধে। মর্গের চিকিৎসক বিষয়টি নিশ্চিত করার পর তাকে গ্রেফতার করা হয়।

এর আগে ২০২০ সালের ২০ নভেম্বর রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গে লাশের সঙ্গে যৌনাচারের অভিযোগে মুন্না ভগত (২০) নামের এক ডোমকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতার পর সে নিজের দোষ স্বীকার করেছিল।

শুধু বাংলাদেশেই নয়, আন্তর্জাতিক পরিসরেও এমন জঘন্য ঘটনার উদাহরণ দেওয়া হয়েছে রিটে। যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইওর মর্গ রক্ষী কেনেথ ডগলাস (৬০) ১৯৭৬ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত রাতের শিফটে কাজ করার সময় ১০০টি নারী লাশের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের কথা নিজের মুখে স্বীকার করেছিল।

হাইকোর্টের আদেশের পর রিটকারী আইনজীবী মো. মনির উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, ‘গত ১৩ মে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালককে নারী ডোম নিয়োগের দাবিতে একটি আইনি নোটিশ দিয়েছিলাম। সেখানে কোনো সাড়া বা ফিডব্যাক না পেয়ে গত ৩০ জুন আমরা হাইকোর্টে এই রিট দায়ের করি।

বাংলাদেশে নারী ডোম পর্যাপ্ত আছে কি না বা নারীরা এই পেশায় আসবেন কি না— সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যেই ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নারী ডোম নিয়োগ হয়েছে। আমাদের দেশেও যদি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি (সার্কুলার) দেওয়া হয়, তাহলে অবশ্যই নারী ডোম পাওয়া যাবে। কারণ বাংলাদেশে এখন সব ক্ষেত্রেই নারীরা কাজ করছেন। একসময় স্কুল-কলেজে নারীদের সংখ্যা কম থাকলেও, এখন শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতের সব জায়গায় নারীরা এগিয়ে গেছেন। সুতরাং সার্কুলার দিলে অবশ্যই প্রার্থী পাওয়া যাবে।’

ইউডি/কেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading