ফ্রান্সে দাবানল বোর্দো শহরের কাছে, স্পেনে জাতীয় জরুরি অবস্থা
উত্তরদক্ষিণ। মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬, আপডেট ১১:৫৫
ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় বোর্দো শহর থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার (৯ মিটার) দূরে নতুন করে একটি ভয়াবহ দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বোর্দোর মেয়র তোমা কাজনাভ সতর্কবার্তা জারি করে জানিয়েছেন, যেকোনো ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় শহর প্রশাসন প্রস্তুতি নিচ্ছে। বড় আকারের স্থানান্তরের প্রয়োজন হলে বিপুলসংখ্যক মানুষকে আশ্রয় দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত এক সপ্তাহ ধরে ফ্রান্স ও স্পেনে দাবানল তাণ্ডব চালাচ্ছে। এই দুই দেশে এখন পর্যন্ত ৩ লাখ ৩০ হাজারের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
সোমবার (২৭ জুলাই) ক্ষতিগ্রস্ত জিরোন্দ অঞ্চল পরিদর্শন করে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাঁখো জানান, দেশটিকে একটি ‘সম্পূর্ণ নজিরবিহীন দাবানলের’ মুখোমুখি হতে হচ্ছে, যা ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতি’।
ফ্রান্সের আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, মঙ্গলবার (২৯ জুলাই) থেকে আবার নতুন করে তীব্র তাপপ্রবাহ শুরু হওয়ায় আগুন নেভানোর প্রচেষ্টা আরো বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাঁখো জানান, লঁদ অঞ্চলের অপেক্ষাকৃত ছোট একটি আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে, তবে পার্শ্ববর্তী জিরোন্দ অঞ্চলে আগুন নেভানোর লড়াই এখনো চলছে।
রবিবারের তুলনায় সোমবার দমকলকর্মীরা পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত করতে পারলেও তিনি সতর্ক করে বলেন, “তাপমাত্রা আবারো বাড়তে চলেছে, বাতাসও বইছে, তাই আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।”
এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ বলেছিলেন, এই আগুনের ‘যেন নিজস্ব এক জীবন রয়েছে’।
বোর্দোর দক্ষিণের শহর সেস্তার মেয়র জেরোম স্টেফ বিবিসিকে বলেন, এটি হতে যাচ্ছে ‘শতাব্দীর ভয়াবহ দাবানল’।
দুই দিন আগে আগুন বেড়ে যাওয়ার পর কীভাবে তার শহরের ১৭ হাজারের বাসিন্দাকে রাতের বেলা সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল, সেই বর্ণনা দেন তিনি। তিনি জানান, এ পর্যন্ত এই অঞ্চলে ৪২ হাজার হেক্টর (১ লাখ ৩ হাজার একর) জমি পুড়ে গেছে এবং ২৪০টি বাড়ি ধ্বংস হয়েছে।
তিনি আরও যোগ করেন, “আমার শহরে পরিস্থিতি সত্যিই ভয়াবহ।”
যদিও আগুন এখন আগের চেয়ে ধীরগতিতে ছড়াচ্ছে, তবে তার মতে, তার প্রশাসন ‘ছোট একটি লড়াইয়ে জিতেছে মাত্র’। উড়ন্ত অঙ্গার কিংবা বাতাসের দিক হঠাৎ পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকি থেকেই যায় বলে তিনি জোর দেন।
তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, “আমরা সুরক্ষা বলয় তৈরি করতে আমাদের সব শক্তি দিয়ে চেষ্টা করছি”, তবে স্বীকার করে নেন যে “এই পরিস্থিতির সামনে আমরা সবাই ভীত।”
ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্টিয়ান ল্যকরনু সতর্ক করে বলেন, দেশটিতে ‘নজিরবিহীন এক দাবানলের মৌসুম চলছে’। জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ১ লাখ ১৬ হাজার ৮৫ হেক্টর (২ লাখ ৮৬ হাজার ৮৫২ একর) জমি পুড়ে গেছে এবং ১৩ হাজার ৫৬৬ স্থানে আগুন লাগার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে তিনি জানান, “প্রতি ১০টির মধ্যে ৯টি দাবানলই মানুষের কারণে সৃষ্টি হয় এবং বেশিরভাগই অসাবধানতার ফল- যেমন জ্বলন্ত সিগারেটের টুকরো, বার্বিকিউ কিংবা অসতর্কভাবে কাজ করা।”
তবে তিনি এটাও বলেন যে, সব আগুন দুর্ঘটনাবশত নয়, কিছু আগুন ইচ্ছাকৃতভাবেও লাগানো হয়েছে। এ ধরনের অভিযোগে ৬ জুলাই থেকে এ পর্যন্ত ১৬২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
ফ্রান্সের আরও কয়েকটি অঞ্চলে দাবানল জ্বলছে, যার মধ্যে ভার এবং লদ অঞ্চল এবং কর্সিকা দ্বীপের ওত-কর্স উল্লেখযোগ্য।
এদিকে, ফ্রান্সের প্রতিবেশী দেশ স্পেনে দাবানলের কারণে জারি করা জাতীয় জরুরি অবস্থা পঞ্চম দিনে গড়িয়েছে। রাজধানী মাদ্রিদের পশ্চিমে দাবানল তীব্র আকারে ছড়িয়ে পড়েছে।
স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, মাদ্রিদের পশ্চিমে প্রায় ২৭ হাজার হেক্টরের বেশি এলাকা ছাইয়ে পরিণত হয়েছে।
রবিবার স্পেনের পরিবেশগত রূপান্তর বিষয়ক মন্ত্রী সারা আগেসেন জানান, স্পেনে আগুনে প্রায় ৭৭ হাজার হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি আরও যোগ করেন, আভিলা অঞ্চলে জ্বলতে থাকা দাবানলটি দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দাবানল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিসের তথ্যমতে, ইউরোপ বিশ্ব গড়ের চেয়ে দ্বিগুণ গতিতে উত্তপ্ত হচ্ছে, যার ফলে ইউরোপজুড়ে অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহ ও দাবানলের পুনরাবৃত্তি ঘটছে।
ইউডি/রেজা

