ভাইয়ের সম্পত্তিতে বোনের উত্তরাধিকার দাবি গ্রহণযোগ্য নয়: হাইকোর্ট

ভাইয়ের সম্পত্তিতে বোনের উত্তরাধিকার দাবি গ্রহণযোগ্য নয়: হাইকোর্ট

উত্তরদক্ষিণ। শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬, আপডেট ১৪:০৩

হিন্দু ভাইয়ের সম্পত্তিতে কোনো বোন উত্তরাধিকারী (রিভার্সনার) হিসেবে স্বত্ব দাবি করতে পারবে না– মর্মে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।

ভাইয়ের সম্পত্তিতে বোনের উত্তরাধিকারী (রিভার্সনার) হওয়ার অধিকার চেয়ে এক দেওয়ানি রিভিশনে জারি করা রুল খারিজ করে দেওয়া রায়ে এমন তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট। রায়ে অধস্তন আদালতের দেওয়া রায় ও ডিক্রি বহাল রেখেছেন আদালত।

অমর কুমার দাসের উত্তরাধিকারী লিলি রানী দাস এবং অন্যান্য বনাম ড. মনোরঞ্জন মহুরী এবং অন্যান্য শীর্ষক মামলায় হাইকোর্ট এমন পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন।

গত ৯ জুলাই বিচারপতি শেখ আবদুল আউয়াল এবং বিচারপতি মো. রাফিজুল ইসলামের হাইকোর্ট বেঞ্চের দেওয়া ওই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি বৃহস্পতিবার প্রকাশিত হয়েছে।

উক্ত মামলার মূল রায়টি লিখেছেন বেঞ্চের কনিষ্ঠ বিচারপতি মো. রাফিজুল ইসলাম। রায় প্রদানকালে আদালতে রিভিশন আবেদনের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী সমীরণ দাস গুপ্ত। বিবাদী পক্ষে ছিলেন আইনজীবী তৌফিক আনোয়ার চৌধুরী।

চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার একটি জমি সংক্রান্ত সিভিল রিভিশন মামলার শুনানি শেষে বিচারপতি শেখ আবদুল আউয়াল এবং বিচারপতি মো. রাফিজুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করেন।

আদালত ২০০৮ জারি করা রুল খারিজ করে অধস্তন আদালতের দেওয়া রায় ও ডিক্রি বহাল রেখেছেন।

মামলার প্রেক্ষাপট ও অধস্তন আদালতের সিদ্ধান্ত

চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া উপজেলার অধিবাসী রামকান্ত বিশ্বাসের এক পুত্র ও তিন কন্যা সন্তান ছিল। তিনি ১৯২০ সালে নিজের অর্থ দিয়ে ছেলে সতীশ চন্দ্র বিশ্বাসের নামে পটিয়া উপজেলাধীন ১.৩৫ একর নালিশি জমি ক্রয় করেন। পরে সতীশ চন্দ্র বিশ্বাস তার বাবার জীবদ্দশাতেই মারা যান। আর ১৯৩৩ সালে রামকান্ত বিশ্বাস মারা যান।

এরপর মৃত রামকান্ত বিশ্বাসের কন্যা শৌল বালা দাস উক্ত জমির মালিকানা (উত্তরাধিকারী হিসেবে) দাবি করেন। অন্যদিকে সতীশ চন্দ্র বিশ্বাসের স্ত্রী সাবিত্রী বালা জীবিত থাকাকালীন ১৯৯৬ সালে ড. মনোরঞ্জন মহুরী নামে একজনের কাছে জমিটি বিক্রি করে দেন।

পরে ১৯৯৮ সালে পটিয়ার আদালতে (চৌকি আদালত) এই জমির উত্তরাধিকার দাবি করে দেওয়ানি মামলা দায়ের করেন শৌল বালা দাস। বাদীপক্ষের অভিযোগ ছিল, উক্ত বিক্রয় দলিলটি জাল, প্রতারণামূলক এবং আইনি বাধ্যবাধকতা ছাড়া হস্তান্তরিত হয়েছে। পটিয়ার সাব-অর্ডিনেট জজ আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ বিচার-বিশ্লেষণ করে ২০০০ সালের ২২ জুন বাদীপক্ষের মামলাটি খারিজ করে দেন।

এরপর বাদী বিচারিক আদালতের উক্ত রায় ও ডিক্রির বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম জেলা জজের আদালতে আপিল দায়ের করেন। চূড়ান্ত শুনানি শেষে চট্টগ্রামের ১ম অতিরিক্ত জেলা জজ ২০০৭ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর আপিলটি খারিজ করে রায় দেন।

আপিল আদালতের উক্ত রায় ও ডিক্রিতে সংক্ষুব্ধ ও অসন্তুষ্ট হয়ে বাদী (আপিলকারী) দেওয়ানি কার্যবিধির ১১৫(১) ধারার অধীনে ২০০৮ সালে হাইকোর্টে দেওয়ানি রিভিশন আবেদন দায়ের করেন। শুনানি শেষে একই বছর রুল জারি করেন আদালত। ২০০৮ জারি করা রুলটি গত ৯ জুলাই খারিজ করে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। রায়ে অধস্তন আদালতের রায় ও ডিক্রি বহাল রাখা হয়েছে।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ

হিন্দু দায়ভাগা আইনে ভাইয়ের বিধবা স্ত্রীর জীবদ্দশায় ভাইয়ের সম্পত্তিতে বোনের উত্তরাধিকারী হিসেবে অধিকার নেই।

রায়ে দায়ভাগা স্কুল অব হিন্দু আইনের অধীনে বিধবার অধিকার ও উত্তরাধিকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করে হাইকোর্ট বলেন, স্বামীর মৃত্যুর পর তার বিধবা স্ত্রী জীবদ্দশায় স্বামীর সম্পত্তির স্বত্ব বা অধিকার পান। তবে এই সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে তার ক্ষমতা সীমিত। বিধবা নারী যদি এই সম্পত্তি কারও কাছে হস্তান্তর করেন, তবে তা চ্যালেঞ্জ করার অধিকার সবার থাকে না। সেই হস্তান্তরের আইনি বৈধতা নিয়ে কেবল তিনিই প্রশ্ন তুলতে বা আদালতে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন, যিনি বিধবার মৃত্যুর পর উক্ত সম্পত্তির পরবর্তী প্রকৃত উত্তরাধিকারী (যাকে আইনি ভাষায় ‘রিভার্সনার’ বা Reversioner বলা হয়) হওয়ার অধিকারী।

যে ব্যক্তি বা যার উক্ত সম্পত্তিতে বর্তমানে বা ভবিষ্যতেও উত্তরাধিকারী হিসেবে কোনো আইনগত স্বার্থ বা অধিকার নেই, তিনি এই সম্পত্তি হস্তান্তরকে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন না। হস্তান্তরটি ‘আইনগত প্রয়োজনে’ করা হয়নি– কেবল এই যুক্তি দেখিয়ে সম্পত্তিতে অধিকারহীন কোনো ব্যক্তি আদালতে মামলা বা চ্যালেঞ্জ করতে পারেন না।

ইউডি/রেজা

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading