শেয়ার মার্কেটঃ বিনিয়োগকারীরা নিঃস্ব হয়ে পড়ছে!
উত্তরদক্ষিণ মুদ্রিত সংস্করণ । বৃহস্পতিবার, ৩১ অক্টোবর ২০১৯ । ১২ঃ০১ । আপডেট ১০ঃ৩৮
পুঁজিবাজারে অস্থিরতা ও কারসাজি
অস্বাভাবিকভাবে দরপতন চলছে
মোহাম্মদ শিহাব : কতিপয় দুর্নীতিবাজ রাঘব বোয়ালের বিরুদ্ধে দেশের ব্যাংক খাতসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে লুটপাটের অভিযোগ আছে। যার প্রভাব পড়ছে পুঁজিবাজারেও। তাছাড়া পুঁজিবাজারেও অসাধু সিন্ডিকেট, দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ী ও কর্মকর্তা, নিয়ন্ত্রণ সংস্থার দুর্বলতাসহ নানা কারণে অস্থিরতা বিরাজ করছে। দীর্ঘদিন ধরে এমন পরিস্থিতির কারণে এরই মধ্যে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের একটা অংশ নিঃস্ব হয়ে বাজার থেকে বিদায় নিয়েছে। এখন যারা পুঁজিবাজারে আছেন তারাও নিঃস্ব হওয়ার পথে। অথচ একটি প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজচক্র পুঁজিবাজার থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা নানা কৌশলে হাতিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। এমন অভিযোগ ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের। পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারীরা পর্দার আড়ালের রাঘব বোয়ালদের বিচারের দাবি জানিয়েছেন। পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য ক্যাসিনোর মতো পুঁজিবাজারে শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদ। গত মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়। এসময় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বিনিয়োগকারীদের পক্ষ থেকে ২১ দফা দাবি উপস্থাপন করা হয়। পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সভাপতি মিজান উর রশিদ বলেন, অব্যাহত দর পতনে পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীরা নিয়মিত পুঁজি হারাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের ১৮ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর বরাবরে বাজারের সার্বিক প্রেক্ষাপট, সমস্যা ও সমাধান নিয়ে একটি স্মারক লিপি পেশ করি। কিন্তু পুঁজিবাজারে স্থায়ী স্থিতিশীলতা আজও ফিরে আসেনি। তিনি বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ, আইসিবি, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের বেশ কিছু অসাধু কর্মকর্তার সীমাহীন দুর্নীতি ও লুটপাট পুঁজিবাজার ধসের মূল কারণ। এছাড়া সেকেন্ডারি মার্কেটের আদলে বা সমান্তরালে অনৈতিক প্লেসমেন্ট বাণিজ্য ও দুর্বল কোম্পানির আইপিওতে তালিকাভুক্তির মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের সর্বশান্ত করা হয়েছে। এমন পরিস্থতিতে পুঁজিবাজারের সাথে যুক্ত দুর্নীতিবাজ ও অসাধু ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে মেধাবী ও যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের দিয়ে কমিশন পুনর্গঠনের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। পাশাপাশি পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য ক্যাসিনো মার্কেটের মতো বিএসইসি, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ, আইসিবি ও বিভিন্ন ইস্যু ম্যানেজারদের বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা ও অভিযুক্তদের বিচারের আওতায় আনার দাবি করা হয় সংবাদ সম্মেলনে।
দাবিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো – বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খায়রুল হোসেনসহ সকল কমিশনারদের অপসারণ করে সত্, মেধাবী ও যোগ্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে কমিশন পুনঃগঠন, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান, বাইব্যাক আইন পাস ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ। অর্থনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, এর মধ্যে কিছু রাঘব বোয়াল পূর্বের তদন্তে চিহ্নিত হলেও প্রভাবশালী হওয়ায় তাদেরকে এ পর্যন্ত আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। ফলে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরেনি। ফেরেনি স্থিতিশীলতাও। ফলে দিনের পর দিন ধ্বংস হতে চলেছে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার। এমন প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছেন, ব্যাংক লুট ও শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারিতে জড়িতদেরকেও ধরা হবে। যেভাবে ধরা হয়েছে ক্যাসিনোকাণ্ডে জড়িতদের। দুর্নীতি করে ‘কেউ ছাড় পাবে না’। সূত্র বলছে, প্রধানমন্ত্রীর এমন ঘোষণায় নতুন করে আশার সৃষ্টি করেছে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। একই সঙ্গে আতঙ্কে আছে শেয়ারবাজার কারসাজির সঙ্গে জড়িত দুর্নীতিবাজরা। পুঁজিবাজার বিশ্লেষকরা বলে মনে করছেন- পুঁজিবাজারকে বর্তমান অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য ব্যাংক ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা জরুরি। তাদের মতে, ব্যাংক ও আর্থিক খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনতে হলে রাজনৈতিক প্রভাব বন্ধ করতে হবে। সেই সঙ্গে আর্থিক খাতের আইনি দুর্বলতা দূর করে প্রভাবশালীদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করতে হবে। অন্যথায়, পুঁজিবাজারের বর্তমান অবস্থা থেকে উত্তরণ করা সম্ভব হবে না। এ ব্যাপারে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম এক সাক্ষাত্কারে বলেন, ব্যাংক ও আর্থিক খাতের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে পুঁজিবাজারে। কারণ অধিকাংশ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত। অধিকাংশ ব্যাংক খেলাপি ঋণের কারণে বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এই অবস্থার উত্তরণ ঘটাতে না পারলে পুঁজিবাজার স্বাভাবিক হবে না। অন্যদিকে, অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে পিপলস লিজিং বন্ধ হয়ে গেছে। আরো কয়েকটি লিজিং কোম্পানি আমানতকারীর টাকা ফেরত দিতে পারছে না। ফলে ব্যাংক ও আর্থিক খাতের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে পুঁজিবাজারে। তিনি বলেন, ব্যাংক ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হলে এই খাতে সব ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি আর্থিক খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনতে হবে। এছাড়া আইনি দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে প্রভাবশালীরা ঋণ পরিশোধ করছে না। এই ধরনের সুযোগ বন্ধ করতে হবে। মির্জ্জা আজিজ বলেন, বড় বড় ভালো কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করতে হবে। এই সমস্যাগুলোর সমাধান না হলে পুঁজিবাজারের কোনো কাজে আসবে না। পুঁজিবাজারে উন্নতির জন্য ১ বা ২ হাজার কোটি টাকা দিলে কোনো লাভ হবে না। কারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট হয়ে গেছে, তা ফিরিয়ে আনতে হবে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে ব্যাংকিং খাতের সমস্যা সবার আগে সমাধান করতে হবে বলেও মত এই অর্থনীতিবিদের। তার মতে, গত কয়েক বছরে পুঁজিবাজারে যেসব কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়েছে সবই ছোট ছোট কোম্পানি। এসব কোম্পানি বাজারে কোনো ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারেনি। অপরদিকে গ্রামীণফোন ও রবির সঙ্গে সরকারের টানাপড়েনেরও প্রভাব পড়েছে পুঁজিবাজারে। সব বীমা কোম্পানি শেয়ারবাজারে আসার কথা থাকলেও সম্প্রতি বাহিরে থাকা ৪৪টি বীমা কোম্পানি জানিয়েছে, চলতি বছর অর্থাত্ ডিসেম্বরের মধ্যে তারা শেয়ারবাজারে আসছে না। ব্যাংক সুদে নয়ছয় হিসাবও একটি বড় জটিলতা তৈরি করেছে শেয়ারবাজার ধসে। সূত্রেমতে, সরকারের নির্ধারিত সুদ হার নয়/ছয় পরিবর্তনে ব্যাংকগুলো কৌশলে শেয়ারবাজারে চাপ সৃষ্টি করেছে। ফলে সরকার নানা উদ্যোগ নিলেও ব্যাংকগুলোর কারণে তার সুফল মিলছে না এ মুহূর্তে। এখানে ব্যাংক মালিক ও কর্মকর্তাদের বড় ধরনের কারসাজি রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। এসব বিষয়ে পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পুঁজিবাজারের একটা সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় বেশ কয়েকটি ব্যাংকে তারল্য সঙ্কট দেখা দিয়েছে। এই অবস্থায় পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকের শেয়ারের দরপতন হচ্ছে। তিনি বলেন, তারল্য সঙ্কটের কারণে ব্যাংকগুলো উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহ করছে। এর ফলে ব্যাংকের সুদের হার বেড়ে গেছে। অন্যদিকে আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠান পিপলস লিজিং অবসায়নের কারণে এই খাতের সব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম পড়ে গেছে। ফলে ব্যাংক ও আর্থিক খাত দুর্বল হয়ে পড়ায় পুঁজিবাজারে দরপতন অব্যাহত রয়েছে। তিনি আরো বলেন, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে আর্থিক খাত আগে ঠিক হতে হবে। ডিএসইর সাবেক সভাপতি মো: শাকিল রিজভী মনে করেন, বর্তমানে ব্যাংকের সুদের হার বেশি। ফলে অনেকে পুঁজিবাজারের পরিবর্তে ব্যাংকের দিকে ঝুঁকছে। তিনি বলেন, সুদের হার কখনো এক অঙ্ক আবার কখনো দুই অঙ্কে চলে যাচ্ছে। ব্যাংকের সুদের হার বেড়ে গেলে পুঁজিবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তিনি বলেন, বাজারে প্রচুর প্লেসমেন্ট ও বোনাস শেয়ার আসায় সরবরাহ বেড়েছে। এতে করে চাহিদার সাথে সরবরাহের সমন্বয় হচ্ছে না। ফলে বাজার নিম্নমুখি হয়ে পড়ছে। শাকিল রিজভী বলেন, পুঁজিবাজারে অনেক খারাপ কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়েছে। এই সব কোম্পানি ঠিকমত লভ্যাংশ দিতে পারছে না। ওই কোম্পানির শেয়ার বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
গত দুই মাসে ডিএসইর বাজার চিত্র: গত ২২ আগস্ট ডিএসইর প্রধান সূচক ছিল ৫ হাজার ২৩৬ পয়েন্ট এবং বাজার মূলধন ছিল ৩ লাখ ৮৮ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা। টানা দরপতনে গত দুই মাসে ডিএসইর প্রধান সূচক ৫৩৭ পয়েন্ট কমে গত ২৮ অক্টোবর ৪ হাজার ৬৯৯ পয়েন্টে নেমে আসে। একই সময়ে ডিএসইর বাজার মূলধন কমেছে ৩২ হাজার ২৩৫ কোটি টাকা। সর্বশেষ ৪৫ কার্যদিবসের মধ্যে ২৯ দিনই শেয়ারের দাম কমেছে, বেড়েছে মাত্র ১৬ দিন।
পুঁজিবাজারে সূচক তিন বছরে সর্বনিম্ন: পুঁজিবাজারে টানা দরপতনের কারণে গত ২৮ অক্টোবর ডিএসই’র প্রধান সূচক ৪ হাজার ৬৯৯ পয়েন্টে নেমে আসে। এটি আগের তিন বছরের মধ্যে সূচকের সর্বনিম্ন অবস্থান। এর আগে ২০১৬ সালের ১৭ নভেম্বর ডিএসইর প্রধান সূচক ছিল ৪ হাজার ৮৯৮ পয়েন্ট নেমেছিল।
এমন প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘যারা দুর্নীতি করছে তাদেরই ধরা হচ্ছে। এখানে কোনো ক্রাইটেরিয়ায় ধরা হচ্ছে না। যে অপরাধী সে অপরাধীই। আমি আপন-পর দেখছি না।’ তিনি বলেন, ‘শুধু ক্যাসিনো নয়, ব্যাংক জালিয়াতি ও শেয়ারবাজারে জালিয়াতির হোতাদেরও ধরা হবে।’ গত মঙ্গলবার বিকালে গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। দেশের পুঁজিবাজার দুর্নীতিবাজচক্রের কারণে যখন তলানিতে, সে মুহূর্তে সরকারপ্রধানের দৃঢ় ঘোষণায় দ্রুতই বাজারে ভালো চিত্র ফিরবে- সেটাই প্রত্যাশা ক্ষতিগ্রস্ত নিয়োগকারীদের। তারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দেয়ার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব- শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা। যাতে তাদের মুখোঁশ উম্মোচন হয়, আস্থা ফিরে পান বিনিয়োগকারীরা।

