সড়কে নিরাপত্তায় নতুন আইন – বাস্তবতা ও করণীয়

সড়কে নিরাপত্তায় নতুন আইন – বাস্তবতা ও করণীয়

উত্তরদক্ষিণ মুদ্রতি সংস্করন । ০২ নভেম্বর ২০১৯ । প্রকাশ ০০:০১। আপডেট ১০:০৮

মোহাম্মদ শিহাব : দেশের ইতিহাসে প্রথমবার কার্যকর হলো সড়ক পরিবহন আইন। আইনটি গত বছর সংসদে পাস হয়। কার্যকর করতে এক বছর লেগে গেল। তবুও সড়কের মতো বিশাল একটি সেক্টর ব্যবস্থাপনায় যেখানে বাস্তবে কোনো আইনই ছিল না, সেখানে একটি আইন অবশেষে জাতি পেয়েছে সেটিই বড় কথা। এতদিন সড়ক পরিহন ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে প্রয়োগ হতো ৭৯ বছরের পুরনো মোটরযান অধ্যাদেশ। বিষয়টি আশ্চর্যজনক হলেও এটিই বাস্তব। সেই অধ্যাদেশ বাতিল করে দেশের সড়ক পরিবহন খাতে নতুন আইনটি গতকাল শুক্রবার (১ নভেম্বর) থেকে কার্যকর হয়েছে।

এই আইনটি তৈরি প্রেক্ষপট হয়তো দেশবাসী সবারই কম-বেশি মনে আছে। গত বছরের ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থীর প্রাণহানির ঘটনায় গড়ে উঠা নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর সড়ক পরিবহন আইনটি জাতীয় সংসদে পাস হয়। কিন্তু এর বিরুদ্ধে পরিবহন মালিক শ্রমিকরা আইনটি সংশোধনের জন্য তত্পর হয়। তবে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় আইন কার্যকরের ঘোষণা দেয়। এবং শেষ পর্যন্ত কার্যকারও হলো।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এর জন্য বঙ্গবন্ধুকন্যা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানাতেই হবে। কারণ, তার দৃঢ় সিদ্ধান্তেই আইনটি পাস ও কার্যকর হয়েছে। অবশ্য আইনের প্রয়োগ বা বাস্তবায়নে কিছুটা সময় প্রয়োজন। সেই সঙ্গে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, পরিবহন মালিক-শ্রমিক ও পবিহন শ্রমিক সংগঠনসহ পথচারী তথা সংশ্লিষ্ট সবাইকে নতুন আইনটি সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে। সবার সচেতনতা ও সমন্বিত উদ্যোগে মাধ্যমে আইনটি বাস্তবায়ন সহজ হবে। এর মাধ্যমে সড়কে দীর্ঘকালের নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলাও দূর হবে বলে বিশ্বাস অভিজ্ঞ মহলের। পাশাপাশি তারা বলছেন, এর পর প্রয়োজনে সময়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে আইনটি সংশোধনও হতে পারে।

‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’ ১৪ মাস পর সেটা কার্যকর হওয়ায় এর প্রয়োগ নিয়ে মানুষের মধ্যে ভিন্ন মত রয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী আসমা আক্তার সেলিনা মনে করেন, নতুন এই আইনের ফলে মানুষ আগের চাইতে বেশি সচেতন হবে। প্রতিদিন এতো অ্যাকসিডেন্ট হয়, তারপরও কোনও চেঞ্জ নাই। কে কার আগে যাবে প্রতিযোগিতা করতে থাকে। আর মারা যায় সাধারণ মানুষ। আবার পথচারীরাও ইচ্ছামতো রাস্তা পার হয়ে যাচ্ছে। এই দু’টাই বন্ধ হওয়া উচিত। নতুন আইনে শাস্তি বাড়ানোয় মানুষ এখন আগের চাইতে ভয় পাবে, সাবধান হবে।’ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেন এই আইন প্রয়োগে তত্পর থাকে সে ব্যাপারে নজর দেয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন উম্মে সালমা সাথি। তিনি বলেন, ‘আইন তো অনেক আছে। কিন্তু সেটা বাস্তবায়ন হয় কিনা- সেটা নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য পুলিশকে অ্যাকটিভ হতে হবে। বিদেশে দেখেন রাস্তায় এতো মানুষ, এতো গাড়ি-কেউ কিন্তু আইন ভাঙে না। কারণ পুলিশ অনেক টাকা জরিমানা করে। আসলে ভয় দেখানোর মতো আইন প্রয়োগ করলে শৃঙ্খলা আপনা আপনি আসবে।’

নতুন আইনে প্রধানত ১৪টি বিধান:

১. সড়কে গাড়ি চালিয়ে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে হত্যা করলে ৩০২ অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

২. বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানো বা প্রতিযোগিতা করার ফলে দুর্ঘটনা ঘটলে ৩ বছরের কারাদণ্ড অথবা ৩ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। আদালত অর্থদণ্ডের সম্পূর্ণ বা অংশবিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে দেয়ার নির্দেশ দিতে পারবে।

৩. মোটরযান দুর্ঘটনায় কোনও ব্যক্তি গুরুতর আহত বা প্রাণহানি হলে চালকের শাস্তি দেয়া হয়েছে সর্বোচ্চ ৫ বছরের জেল ও সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা।

৪. ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া মোটরযান বা গণপরিবহন চালানোর দায়ে ছয় মাসের জেল বা ২৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধার রাখা হয়েছে।

৫. নিবন্ধন ছাড়া মোটরযান চালালে ৬ মাসের কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে।

৬. ভুয়া রেজিস্ট্রেশন নম্বর ব্যবহার এবং প্রদর্শন করলে ৬ মাস থেকে দুই বছরের কারাদণ্ড অথবা এক লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেয়া হবে।

৭. ফিটনেসবিহীন ঝুঁকিপূর্ণ মোটরযান চালালে ৬ মাসের কারাদণ্ড বা ২৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দেয়া যাবে।

৮. ট্রাফিক সংকেত মেনে না চললে এক মাসের কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দণ্ডিত করা হবে।

৯. সঠিক স্থানে মোটরযান পার্কিং না করলে বা নির্ধারিত স্থানে যাত্রী বা পণ্য ওঠানামা না করলে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে।

১০. গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোনে কথা বললে এক মাসের কারাদণ্ড এবং ২৫ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

১১. একজন চালক প্রতিবার আইন অমান্য করলে তার পয়েন্ট বিয়োগ হবে এবং এক পর্যায়ে লাইসেন্স বাতিল হয়ে যাবে।

১২. গণপরিবহনে নির্ধারিত ভাড়ার চাইতে অতিরিক্ত ভাড়া, দাবি বা আদায় করলে এক মাসের কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দণ্ডিত করা হবে।

১৩. প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে হলে অষ্টম শ্রেণি পাস করতে হবে। চালকের সহকারীর পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকতে হবে। আগে শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনও প্রয়োজন ছিল না।

১৪. গাড়ি চালানোর জন্য বয়স অন্তত ১৮ বছর হতে হবে। অবশ্য একই বিধান আগেও ছিল। এছাড়া সংরক্ষিত আসনে অন্য কোনও যাত্রী বসলে এক মাসের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

শাস্তি বাড়ানোর বিরোধিতা: সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর নামে পরিবহন শ্রমিকদের বিরুদ্ধে শাস্তি বাড়ানোর বিরোধিতা করেছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খান। শ্রমিকদের জন্য নতুন এই আইন নমনীয় করার দাবি জানান তিনি। শাহাজাহান খানের ভাষ্য, ‘যদি সব মামলায় ৩০২ ধারা (মৃত্যুদণ্ড) রাখা হয়, ড্রাইভারকে যদি যাবজ্জীবন সাজা দেয়া হয় ওই চালকের গরিব পরিবারের কী অবস্থা হবে? তাছাড়া আমাদের দেশে এমনিতেই লাখ লাখ ড্রাইভার কম আছে। জামিনযোগ্য শাস্তি না হলে ড্রাইভারের সংকট আরও বাড়বে। এই বিষয়গুলো বিবেচনা করা দরকার।’ তার মতে, ‘আইন কার্যকর করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে শ্রমিকদের যেন হয়রানি হতে না হয়।’

মন্দের ভালো আইন: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে ৫৫ জন মানুষের প্রাণহানি হচ্ছে। আর বাংলাদেশ রিসার্চ ইন্সটিটিউটের গবেষণা বলছে, দেশে প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় গড়ে ১২ হাজার মানুষ নিহত ও ৩৫ হাজার জন আহত হন। এমন প্রেক্ষাপটে নতুন আইনটি সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী। তবে আইনটি আরও যাত্রীবান্ধব হওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। মোজাম্মেল হক বলেন, ‘আমাদের দেশ দীর্ঘদিন যাবত যেখানে আইনের শাসন অনুপস্থিত ছিল। সেখানে এই আইনে অপরাধ ও দণ্ডের পরিমাণটা যুগোপযোগী করা হয়েছে। তবে যাত্রী স্বার্থে দিকটা এখানে নজরে আনা হয়নি। তাই বলবো মন্দের ভালো আইন হয়েছে।’ ‘এই আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে এই আইনটি সড়ক পরিবহনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হতে পারে’ বলেন মোজাম্মেল হক চৌধুরী।

দীর্ঘদিন থেকে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন। নতুন আইন কার্যকর প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, “বাস্তবায়ন হলো বহুল কাঙ্খিত ‘সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮’। এখন সড়কে শৃঙ্খলা ফিরে আসার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। সড়কে অনিয়মের কোনও সুযোগ নেই। বিশেষ করে আইনে জরিমানার বিধান রয়েছে শক্তভাবে। আমি সকল মহলকে অতীতে যেভাবে সড়ককে ব্যবহার করেছেন সেই পথ থেকে সরে আসার আহবান জানাই।’ নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)র পক্ষ থেকে গতকাল শুক্রবার বিকালে রাজধানীর কাকরাইল মোড়ে আইনের ওপর জনগণকে সচেতন করতে, জানতে ও মানতে উদ্বুদ্ধকরণ ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা হয়। ক্যাম্পেইন চলাকালে বক্তব্য রাখেন ইলিয়াস কাঞ্চন সেসময় তিনি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানো, দ্রুত গতি, বেপরোয়া এবং বিপজ্জনকভাবে গাড়ি চালানো, যত্রতত্র দিয়ে রাস্তা পারাপার, আইন না মানা এই সংস্কৃতি থেকে সকলকে বেরিয়ে আসতে হবে। নতুবা শাস্তির আওতায় আসা অবধারিত। ইলিয়াস কাঞ্চন সড়কে চলাচলে সকলকে সচেতন হতে আহ্বান জানান। তিনি মোটরসাইকেল চালকদের উদ্দেশ্যে বলেন, হেলমেট ছাড়া বাইক চালালে ১০ হাজার টাকা ও ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকলে ২৫ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। আপনারা অবশ্যই বাইক চালানোর সময় হেলমেট ব্যবহার করবেন।

নতুন সড়ক আইনের পরিক্রমা: গত বছর ঢাকায় বাসচাপায় দুই ছাত্র-ছাত্রীর মৃত্যুর পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনের মুখে ২০১৮ সালে আগের আইন কঠোর করে এই আইনটি করা হয়েছিল। এই আইন অনুযায়ী, মোটরযান চালনাজনিত কোনো দুর্ঘটনায় কোনো ব্যক্তি গুরুতর আহত বা নিহত হলে এ সংক্রান্ত অপরাধ দণ্ডবিধি-১৮৬০ এর এ সংক্রান্ত বিধান অনুযায়ী অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। তবে দণ্ডবিধির ৩০৪বি ধারাতে যা-ই থাকুক না কেন, কোনো ব্যক্তির বেপরোয়া বা অবহেলাজনিত মোটরযান চালনার কারণে সংঘটিত কোনো দুর্ঘটনায় কোনো ব্যক্তি গুরুতরভাবে আহত বা নিহত হলে চালক সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

আইনের ১১৪ ধারায় বলা হয়েছে, এই আইনের অধীন অপরাধের তদন্ত, বিচার, আপিল ইত্যাদির ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধি (১৮৯৮) প্রযোজ্য হবে। গত বছর ৮ অক্টোবর ‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’ এর গেজেট জারি করা হলেও তার কার্যকারিতা এতদিন ঝুলে ছিলো। এ নিয়ে আদালতে একটি রিট আবেদনও হয়েছিল।

আইনটি প্রণয়নের পর থেকে তার প্রবল বিরোধিতা করে আসছিল পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলো। তাদের দাবি, সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঘটনার মামলায় নতুন আইনে শাস্তির মাত্রা ‘অযৌক্তিক’ বেশি। এরপর গত ২৫ সেপ্টেম্বর পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল ও আইনমন্ত্রী আনিসুল হক আইন সংশোধনের সুপারিশ সম্বলিত একটি প্রতিবেদন জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের কাছে দেবেন বলে জানিয়েছিলেন। তবে পরে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের আইনটি সংশোধনের প্রস্তাব নাকচ করে দেন। এরপরই আইনটি কার্যকরের তারিখ ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ হয়।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading