শ্রীলংকার রাজনীতিতে ওলট-পালট
উত্তরদক্ষিণ মুদ্রতি সংস্করন । ১৮ নভেম্বর ২০১৯ । প্রকাশ ০০:০১। আপডেট ১০:২৮
বিবিসি অবলম্বনে হিল্লোল বাউলিয়া : শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী গোটাবায়া রাজাপাকসে বিজয়ী হয়েছেন। গোটাবায়া রাজাপাকসে- যিনি দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট মহিন্দা রাজাপাকসের ভাই। কট্টরপন্থী ও ‘বিতর্কিত’ এই রাজনীতিক ৫২ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে দেশটির নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। তার মূল প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী সাজিথ প্রেমাদাসা পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছেন। আজ সোমবারই গোটাবায়া রাজাপাকসের শপথ নেয়ার কথা রয়েছে। তবে গোটাবায়ার এই বিজয়ের মধ্যে দিয়ে শ্রীলংকার রাজনীতিতে বড় ধরনের ওলট পালট সৃষ্টি হলো। কারণ, গোটাবায়া কট্টরপন্থী বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী হিসেবে বিভিন্ন মহলে পরিচিত। তাছাড়া আঞ্চলিক রাজনীতিতে রাজাপাকসের পরিবার ও দল চীনপন্থী হিসেবে পরিচিত। দেশটিতে ইন্ডিয়াপন্থীরা এর আগে সরকার পরিচালনা করে আসছিল। নতুন এই চীনপন্থী প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় দেশটির রাজনীতিতে কী ধরনের পরিবর্তন আসছে তা হয়তো সময় বলে দেবে। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গোটাবায়া রাজাপাকসে প্রতিরক্ষামন্ত্রী থাকার সময় তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহীদের যেভাবে দমন করেছিলেন তা নিয়ে মানবাধিকার লংঘনের অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু একজন বিতর্কিত রাজনীতিবিদ হয়েও কেন বিজয়ী হলেন তিনি? এ প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গেলে দেখা যাবে, এই নির্বাচনকে ঘিরে শ্রীলংকার জনগণের মধ্যে বিভক্তি ছিল স্পষ্ট। বিশ্লেষকরা বলছেন, গোটাবায়া রাজাপাকসে সিংহলি সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায় বেশি ভোট পেয়েছেন। অন্যদিকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রেমাদাসার জনপ্রিয়তা ছিল সংখ্যালঘু তামিল ও মুসলিমদের মধ্যে। কিন্তু নির্বাচনের আংশিক ফল বেরুনোর পরই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, গোটাবায়া রাজাপাকসেই বিজয়ী হতে যাচ্ছেন। গোটাবায়া রাজাপাকসে শ্রীলংকার বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী সিংহলিদের মধ্যে খুবই জনপ্রিয়। তার ভাই মাহিন্দা রাজাপাকসে প্রায় ১০ বছর শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন এবং শ্রীলংকায় তামিলদের সঙ্গে গৃহযুদ্ধের অবসানের কৃতিত্ব দেয়া হয় তাদের। সেসময় গোটাবায়া রাজাপাকসে ছিলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী। তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদীদের যেরকম কঠোর এবং নিষ্ঠুরভাবে তিনি দমন করেছিলেন, সেজন্যে তিনি বেশ বিতর্কিত। তাদের বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লংঘনেরও অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু গোটাবায়া রাজাপাকসে বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দেন। এবারের নির্বাচনী প্রচারাভিযানেও গোটাবায়া রাজাপাকসে নিরাপত্তার বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তার বিজয়ে শ্রীলংকার সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলিরা বেশ উত্ফুল্ল। সাংবাদিকদেরকে একজন ভোটার বলেন, তিনি সবসময়ই চেয়েছিলেন রাজাপাকসেই যেন প্রেসিডেন্ট হন। আরেকজন বলেন, রাজাপাকসে শ্রীলংকার নিরাপত্তার ব্যাপারে যেসব অঙ্গীকার করেছেন, তার সঙ্গে তিনি একমত বলেই তিনি তাকে সমর্থন দিয়েছেন। অন্যদিকে এক টুইটে গোটাবায়া রাজাপাকসে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে বলেন, শ্রীলংকার সব মানুষ এই নতুন যাত্রার সাথী। অন্যদিকে সাজিথ প্রেমাদাসা ভালো করেছেন কর্মকর্তারা জানান, ৮০ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছেন এ নির্বাচনে। এক চতুর্থাংশ ভোট গণনার পর নির্বাচন কমিশন থেকে বলা হয়েছিল, রাজাপাকসে ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ ভোট পেয়ে এগিয়ে আছেন এবং প্রেমাদাসা ৪৫ দশমিক ৩ শতাংশ ভোট পেয়ে তাকে অনুসরণ করছিলেন। তার কিছুক্ষণ পরই প্রকাশ্যে পরাজয় মেনে নেন সাজিথ প্রেমাদাসা। তিনি বলেন, ‘জনগণের সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান জানিয়ে শ্রীলংকার সপ্তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় গোটাবায়া রাজাপাকসেকে অভিনন্দন জানাচ্ছি।’ ৭০ বছর বয়সী গোটাবায়া রাজাপাকসে শ্রীলংকার গৃহযুদ্ধকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপাকসের ভাই। ১০ বছর আগে গোটাবায়া রাজাপাকসের ভাই মাহিন্দা রাজাপাকসে শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন। মহিন্দা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর গোটাবায়া রাজাপাকসে তাদের দল পিপলস ফ্রন্ট পার্টির প্রধান হিসেবে আছেন। নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি শক্তিশালী নেতৃত্বের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মোট ৩৫ জন প্রার্থী ছিলেন। ২০০৯ সালে গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর এটি ছিল শ্রীলঙ্কার তৃতীয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। এ নির্বাচনে গোটাবায়া শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় কিছুটা অস্বস্তিতে পড়েছে ইন্ডিয়া। কারণ, রাজাপাকসে ও তার পরিবারকে চীনের ঘনিষ্ঠ হিসেবেই মনে করা হয়। তাই গোটোবায়া রাজাপাকসের আমলে ইন্ডিয়ার তুলনায় চীনকেই শ্রীলংকা বেশি গুরুত্ব দেবে বলে মনে করছে মোদিরা।

