দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি বস্ত্রশিল্প
উত্তরদক্ষিণ মুদ্রতি সংস্করন । ০৪ ডিসেম্বর ২০১৯ । প্রকাশ ০০:০১। আপডেট ১০:৪০
বস্ত্রশিল্পে বাংলাদেশের ঐতিহ্য দীর্ঘদিনের। ঢাকাই মসলিন ও জামদানি, টাঙ্গাইলের তাঁত, কুমিল্লার খাদি, রাজশাহীর সিল্ক কিংবা মিরপুরের বেনারসি শিল্প বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। এসব শিল্পের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনে সরকারসহ বস্ত্রখাত সংশ্লিষ্ট সকলের আন্তরিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি বস্ত্রশিল্প দেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। প্রতিবছর বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার সিংহভাগ অর্জিত হয় বস্ত্র রপ্তানির মাধ্যমে। দেশের বস্ত্র শিল্পকে আরও আধুনিক, যুগোপযোগী ও লাভজনক করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে সরকারি উদ্যোগে জাতীয় বস্ত্র দিবস পালিত হচ্ছে। এবার প্রথমবারের মতো দিবসটি পালিত হচ্ছে আজ। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এবার থেকে প্রতিবছর ৪ ডিসেম্বর জাতীয় বস্ত্র দিবস পালিত হবে। এর মাধ্যমে বস্ত্র খাতে জড়িতদের জন্য সম্ভাবনা নতুন দিগন্ত উম্মোচিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। দিবসটি উপলক্ষে গতকাল মঙ্গলবার দেয়া বাণীতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ পরিবেশবান্ধব বস্ত্রশিল্প, রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণসহ এ খাতের সার্বিক উন্নয়নে সমন্বিত প্রচেষ্টা চালাতে মালিক-শ্রমিকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি বলেন, মানুষের মৌলিক চাহিদার একটি হলো বস্ত্র। বস্ত্রশিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। স্বাধীনতার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বস্ত্র ও পাট খাতকে জাতীয়করণ করে এ খাতকে সমৃদ্ধ করার উদ্যোগ নেন। বর্তমানে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ পোশাক শিল্প থেকে অর্জিত হচ্ছে। গ্রামীণ দারিদ্র্যমোচন, নারীর ক্ষমতায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও বস্ত্রখাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। জানা গেছে, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রথমবারের মতো ‘জাতীয় বস্ত্র দিবস ২০১৯’ এবং চার দিনব্যাপী ‘বহুমুখী বস্ত্র মেলা’র আয়োজন করেছে। জাতীয় বস্ত্র দিবসের প্রতিপাদ্য ‘বস্ত্রখাতের বিশ্বায়ন-টেকসই উন্নয়ন’। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান সরকার বস্ত্র ও পোশাক খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও পোশাকখাতের অগ্রগতিকে টেকসই করতে ‘বস্ত্র নীতি ২০১৭’ ও ‘বস্ত্র আইন, ২০১৮’ প্রণয়ন করেছে। পাশাপশি বস্ত্রখাতের জন্য দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির লক্ষ্যে বর্তমানে ৭টি টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, ৭টি টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট ও ৪২টি টেক্সটাইল ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট পরিচালিত হচ্ছে। অধিকন্তু এ ধরণের আরো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে বলেও সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে প্রথম জাতীয় বস্ত্র দিবস উপলক্ষে এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের সমৃদ্ধি ও অগ্রযাত্রায় বস্ত্রশিল্প খাত সংশ্লিষ্ট সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও অংশীজনেরা পারস্পরিক সুসম্পক বজায় রেখে গুরুত্বপূর্ণ অবদান নিশ্চিত করার পাশাপাশি এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ বিনির্মাণে কার্যকরী ভূমিকা রাখবে।’ গতকাল মঙ্গলবার সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা তার বাণীতে আরও বলেন, বর্তমানে বস্ত্রখাত দেশের বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত। সরকার এ খাতের সার্বিক উন্নয়নে ‘বস্ত্রনীতি ২০১৭’ ও ‘বস্ত্র আইন, ২০১৮’ প্রণয়ন করেছে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বস্ত্র পরিদপ্তরকে বস্ত্র অধিদপ্তরে উন্নীত করা হয়েছে। বস্ত্রশিক্ষার প্রসারের জন্য বেশ কয়েকটি টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ও টেক্সটাইল ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট স্থাপন করা হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে আরো নতুন নতুন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, টেক্সটাইল ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউট, টেক্সটাইল ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট এবং তাঁত প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট স্থাপন করা হচ্ছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চাহিদা অনুসারে দেশের বস্ত্রশিল্প খাতকে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান ও বস্ত্রশিক্ষার বিস্তারে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়কে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। জানা যায়, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সদ্য স্বাধীন যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সুখী-সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্যে তৃতীয় শিল্পবিপ্লবের কর্মসূচি হাতে নিয়েছিলেন। এ কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশীয় কাঁচামাল ও সম্পদ ব্যবহার করে শ্রমঘন শিল্পায়নের মাধ্যমে দেশকে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ করা। বঙ্গবন্ধু পরিত্যক্ত কলকারখানা জাতীয়করণ করে অর্থনীতিকে শক্তিশালী এবং শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করেছিলেন। ফলে বস্ত্রশিল্পে অধিকতর উন্নয়ন ও বিকাশ ঘটে এবং শ্রমিক-কর্মচারীদের চাকরি নিশ্চিত হওয়ার মাধ্যমে এক নতুন দিগন্তে উন্মোচন ঘটে।
সেই ধারা ৭৫ পরবর্তী সময়ে অনেকটা বিঘ্নিত হয়। তবে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সরকার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর বস্ত্র শিল্পের সুদিন ফিরতে শুরু করে। সরকারের এই আন্তরিক প্রচেষ্টায় এ খাতের হারানো ঐতিহ্য এরই মধ্যে ফিরে এসেছে। বস্ত্র শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা এখন নতুন সম্ভাবনার আলো দেখতে শুরু করেছেন। জাতীয়ভাবে বস্ত্র দিবস পালন সেই সম্ভাবনার দ্বারকে আরও প্রশস্ত করবে বলেই বিশ্বাস এ শিল্প সংশ্লিষ্টদের।

