মোদির মসনদ হুমকি’র মুখে
উত্তরদক্ষিণ মুদ্রতি সংস্করন । ২০ ডিসেম্বর ২০১৯ । প্রকাশ ০০:০১। আপডেট ১০:৪০
‘মুসলিমবিরোধী’ নাগরিকত্ব আইনের প্রতিবাদে ইন্ডিয়াজুড়ে বিক্ষোভ
বিশ্বের সেরা গণতান্ত্রিক দেশের একটি বিবেচনা করা হয় ইন্ডিয়াকে। দীর্ঘকাল ধর্মনিরপেক্ষ দেশটিতে জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দেয়া হতো। সেই সঙ্গে মতামত প্রকাশে স্বাধীনতাও ছিল বিশাল দেশটিতে। মুসলিমবিরোধী হিসেবে বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনসহ সম্প্রতি ইন্ডিয়া সরকারের হিন্দুত্ববাদী কট্টরনীতির কারণে দেশটির দীর্ঘকালের ঐতিহ্য প্রশ্নের মুখে পড়েছে। ইন্ডিয়ার সবচেয়ে পুরোনো দল- কংগ্রেসের সঙ্গে অধিকাংশ রাজনৈতিক দল এবং ধর্মীয় ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে বিতর্কিত বিলটির বিরোধীতা করা হলেও পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে আইন পাস করিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে বিজেপি সরকার। সেই সঙ্গে গত ১২ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর বিতর্কিত বিলটি আইনে পরিণত হয়েছে। এর প্রতিবাদে ইন্ডিয়াজুড়ে গত এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে সহিংস বিক্ষোভ, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, গুলি এবং ধরপাড়ক চলছে। দিন যতই যাচ্ছে পরিস্থিতি ততই ঘোলাটে হচ্ছে। এরই মধ্যে বিতর্কিত ওই আইন পাসের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর বাতিল করা হয়েছে। এর পর জাপানের প্রধানমন্ত্রীর ইন্ডিয়ায় পূর্ব নির্ধারিত সফরও বালিত করা হয়। নতুন পাস হওয়া সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনটি বৈষম্যমূলক উল্লেখ করে তা বাতিলের আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। সেই সাথে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে ইন্ডিয়ার নতুন নাগরিকত্ব আইনটি নিয়ে উদ্যোগ প্রকাশ করা হয়। আইনটি বাতিলের আহ্বান জানিয়েছে মার্কিন আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্র। দেশটিতে ভ্রমণে সতর্কতা জারি করা হয়েছে ব্রিটেন ও আমেরিকার পক্ষ থেকে। কিন্তু গেরুয়া হিন্দুত্ববাদী দল তথা ইন্ডিয়ার ক্ষমতাসীন বিজেপি কোনওভাবেই আইন কার্যকরে আপষ করতে রাজি নয়। বিজেপি সভাপতি ও মোদি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ হুঙ্কার দিয়ে বলেছেন, যত যা কিছু ঘটুক, আইন কার্যকরে পিছ-পা হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এর পর ‘মুসলিমবিরোধী’ নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে ইন্ডিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করেছে দেশটির আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে ইন্ডিয়ার রাজধানী দিল্লি, উত্তর প্রদেশ, ব্যাঙ্গালুরুসহ কর্ণাটকের কিছু এলাকায়। কিন্তু পুলিশি নিষেধাজ্ঞা অগ্রাহ্য করে বিক্ষোভে নামায় হাজার হাজার বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এ খবর জানিয়েছে। বিবিসির খবরে আরও বলা হয়েছে, দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রাখা হয়েছে। এর আগেও কাশ্মীরের বিশেষ সুবিধা বাতিল করার পর সেখানে টানা ১০০ দিন কারফিউ দিয়ে রাখে নরেন্দ্র মোদি সরকার। সেই সঙ্গে বন্ধে করে দেয়া হয়েছিল ইন্টারনেট পরিষেবা। এবার মোদি সরকারের রোষাণলের শিকার প্রায় পুরো ইন্ডিয়াবাসী। এদিকে, চলমান বিক্ষোভ ঠেকাতে সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বিজেপির কর্মীসহ কট্টরপন্থী হিন্দুসংগঠনগুলোকে মাঠে নামানোর পায়তারা করা হচ্ছে বলে আনন্দবাজারের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। দেশটির গণমাধ্যমগুলোর খবরে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান থেকে নিপীড়নের মুখে ভারতে পালিয়ে যাওয়া হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন, পার্সি ও খ্রিস্টানদের নাগরিকত্ব নিশ্চিতে সম্প্রতি আইন সংশোধন করেছে ভারত। গত ১২ ডিসেম্বর রাতে প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের পরেই আইনে পরিণত হয়েছে বিতর্কিত বিলটি। এই বিতর্কিত আইন প্রত্যাহারের দাবিতে দেশজুড়ে সরব একাধিক রাজনৈতিক দল। বিরোধীরা এই আইনকে ‘মুসলিমবিরোধী’ বলে আখ্যা দিয়েছে। দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি হামলার পর তা গণআন্দোলনের রূপ পেয়েছে। আন্দোলনের সমর্থনে ব্রিটেনের হার্ভার্ডসহ বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সমর্থন জানিয়েছেন। এদিকে, ইন্ডিয়ার উত্তর প্রদেশের পুলিশ প্রধান ওপি সিং জনগণকে বিক্ষোভ থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। পুলিশের পক্ষ থেকে বেশ কিছু নিষেধাজ্ঞামূলক নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। চারজনের বেশি লোকের জমায়েত নিষিদ্ধ করেছে। পুলিশের দাবি, সহিংসতা এড়াতে এই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। চেন্নাইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরে পুলিশ মিছিল, সমাবেশ বা কোনও ধরনের বিক্ষোভের অনুমতি দিচ্ছে না। তবে পুলিশি নিষেধাজ্ঞা অগ্রাহ্য করে উত্তর প্রদেশ, ব্যাঙ্গালুরু, মুম্বাই ও দিল্লিতে নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক দল, শিক্ষার্থী, অ্যাক্টিভিস্ট ও সাধারণ জনগণকে বিক্ষোভ প্রদর্শনের ইন্সটাগ্রাম ও টুইটারে আহ্বান জানাচ্ছেন। তারা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের ডাক দিচ্ছেন। আর সেই ডাকে সারা দিয়ে বিক্ষোভে জনগণের ঢল অব্যাহত রয়েছে পুরো ইন্ডিয়াজুড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গণগ্রেপ্তার শুরু করেছে। দিল্লি ও জয়পুরকে সংযুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ সব মহাসড়কে ব্যারিকেড দিয়েছে পুলিশ। রাজধানীতে প্রবেশ করা সবগুলো যানবাহনে তল্লাশী চালানো হচ্ছে। এতে বড় ধরনের যানজট তৈরি হয়েছে। অনেক যাত্রী তাদের বিমানের ফ্লাইট ধরতে পারেননি। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বেশ কিছু মেট্রো স্টেশন। সেই সঙ্গে ইন্টারনেট পরিষেবা অধিকাংশ অঞ্চলে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। রয়টার্স, বিবিসি, আনন্দবাজার, এনডিটিভিসহ প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে এমনটাই উঠে এসেছে। সাক্ষাত্কার দেওয়ার সময় ইতিহাসবিদ রামচন্দ্র গুহকে আটক: আনন্দবাজারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নাগরিকত্ব আইনের প্রতিবাদে গণমাধ্যমকে সাক্ষাত্কার দেওয়ার সময় ইন্ডিয়ার প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ রামচন্দ্র গুহকে ধাক্কা দিয়ে তাকে আটক করেছে পুলিশ। গতকাল বৃহস্পতিবার ব্যাঙ্গালুরুতে পুলিশি নিষেধাজ্ঞা অগ্রাহ্য করে বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইনবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নিলে তাকে আটক করা হয়। শহরটি টাউন হলে পুলিশ ১৪৪ ধারা জারি করেছে। এনডিটিভি-ও এ খবর জানিয়েছে। ইতিহাসবিদ রামচন্দ্র গুহ এনডিটিভি’কে বলেন, গান্ধীর একটি পোস্টার হাতে নিয়ে দাঁড়ানো এবং সংবিধান নিয়ে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলায় আমাকে আটক করেছে পুলিশ। তিনি আরও বলেন, পুলিশ কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে কাজ করছে। একটি বৈষম্যমূলক আইনের বিরুদ্ধে আমরা অহিংস আন্দোলন করছি সুশৃঙ্খল উপায়ে। এখানে দেখুন সবাই শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করছে। কিন্তু পুরো বাক্য শেষ করার পূর্বে পুলিশের একটি দল তার শরীরে ধাক্কা দিয়ে তাকে সেখান থেকে সরিয়ে নেয় এবং তাকে আটক করে। পরে তাকেও আটক অন্য বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে একটি বাসে তুলে নেওয়া হয়। প্রায় ৩০ জন বিক্ষোভকারীকে পতাকা ও প্ল্যাকার্ডসহ সেখান থেকে গ্রেপ্তার করেছে দাঙ্গা পুলিশ। এক উচ্চ পদস্থ পুলিশ কর্মকর্তাকে দেখা গেছে বিক্ষোভকারীদের কাছ থেকে পতাকা কেড়ে নিতে। এদিকে, বেঙ্গালুরুতে বিক্ষোভ-সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা ও ১৪৪ ধারা জারির সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে কর্নাটকের মুখ্যমন্ত্রী বিএস ইয়েদুয়ারাপ্পা কংগ্রেসের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন। তিনি বলেছেন, বিক্ষোভের নেপথ্যে কংগ্রেস রয়েছে। মুসলিমদের ভালোমন্দ দেখার দায়িত্ব আমাদের। শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানাচ্ছি। কংগ্রেস নেতারা যদি বিক্ষোভে সমর্থন দেওয়া অব্যাহত রাখেন, তাহলে তাদের ভুক্তভোগী হতে হবে।
নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে লাখো মানুষ রাস্তায়, কয়েক হাজার গ্রেপ্তার: বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইন্ডিয়ার বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করার পরও যারা অমান্য করে বিক্ষোভ দেখাচ্ছে তাদের গণহারে গ্রেপ্তার করছে দেশটির পুলিশ। এরই মধ্যে গ্রেপ্তার করা মানুষের সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়ে গেছে। বিবিসি বলছে, দিল্লির যেখানে বিক্ষোভ হচ্ছে সেখানে মোবাইল ডেটা (ইন্টারনেট) সেবা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বিতর্কিত আইনটি প্রসঙ্গে হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিজেপি সরকার বলছে, এটি ধর্মীয় সহিংসতা থেকে পার্শ্ববর্তী দেশের হিন্দুদের রক্ষা করবে।

