মেয়র খোকন আউট হওয়ার নেপথ্যের গল্প
উত্তরদক্ষিণ অনলাইন । ৩০ ডিসেম্বর ২০১৯ । আপডেট ১০:৫২
মোহাম্মদ শিহাব : ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী পরিবর্তন হচ্ছে- এমন গুঞ্জন ছিল আগে থেকেই। এ নিয়ে গত ২৬ ডিসেম্বর দৈনিক উত্তরদক্ষিণের প্রধান প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল- ’ঢাকার দুই সিটিতে ভোট: মেয়র প্রার্থীদের দৌড়-ঝাপ’। প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল, দক্ষিণে মেয়র পদে এবার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে যাচ্ছেন শেখ মনির পুত্র শেখ ফজলে নুর তাপস। একইসঙ্গে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, উত্তরে মেয়র পদে আতিকুল ইসলামই থাকছেন। শেষ পর্যন্ত উত্তরদক্ষিণের প্রতিবেদনটিই সত্য প্রমাণিত হয়েছে। এই প্রার্থী বদলে কপাল পুড়েছে ঢাকার সাবেক মেয়র মোহাম্মদ হানিফের পুত্র ও ঢাকা দক্ষিণের বর্তমান মেয়র সাঈদ খোকনের। জানা গেছে, রোববার (২৯ ডিসেম্বর) দুই সিটিতে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থীর নাম ঘোষণার পর নিজেকে স্বেচ্ছায় গৃহবন্দী করে নিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণের বর্তমান মেয়র সাঈদ খোকন। এর আগে ২৬ ডিসেম্বর দলীয় মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করতে গিয়ে গণমাধ্যমের সামনে কান্নায় কপোল ভিজে ছিল এই মেয়রের। কারণ, তিনি আগেই নিশ্চিত হয়েছিলেন যে, এবার আর দলীয় মনোনয়ন তার কপালে জুটবে না। দলীয় মনোনয়ন ছাড়া যে, মেয়র হওয়ার স্বপ্ন দেখার কোনো সুযোগ নেই- সেকথাও খোকনের বুঝতে বাকি ছিল না। তাই কান্নাটা আগেই সেরে নিয়েছেন। আর মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়ার পর তিনি এখন গণমাধ্যমের সামনে বা নগরবাসীর সামনেও আসতে চাচ্ছেন না লজ্জা, ক্ষোভ আর বেদনায়।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, মেয়র খোকনের কপাল পোড়ার পেছনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। তিনি ২০১৫ সালে ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন পেয়ে অপ্রত্যাশিতভাবে তরুণ ব্যক্তি হিসেবে ঢাকার মেয়র নির্বাচিত হন। তখন সাঈদ খোকনের নামও ভালো করে জানতো নগরবাসী। তার বাবা মোহাম্মদ হানিফ অবিভক্ত ঢাকার মেয়র ছিলেন, দলে তার অনেক অবদান ছিল- সেকারণেই পুত্র খোকনকে প্রতিদান হিসেবে মনোনয়ন দেন বঙ্গবন্ধুকন্যা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তখন দলীয় প্রতীক ব্যবহারের সুযোগ না থাকায় ইলিশ মাছ প্রতীক নিয়ে বিএনপি প্রভাবশালী প্রার্থী মির্জা আব্বাসকে হারিয়ে মেয়র নির্বাচিত হন খোকন। কিন্তু গত ৫ বছরে কাজের চেয়ে কথা বলেছেন বেশি মেয়র খোকন। তারা অতিরিক্ত কথাবার্তা বিভিন্ন সময় সরকার ও আওয়ামী লীগকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে। তবে খোকন গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছেন বিভিন্ন সময়ে অতিকথনের সুবাদে। বিশেষ করে চলতি বছর এডিস মশা নিধনে ও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সাঈদ খোকনের ব্যর্থতা সরকারকেই অনেকটা বেকায়দায় ফেলে দেয়। এমনকি মশা নিধন ইস্যুতে অর্থনৈতিক দুর্নীতিরও অভিযোগ উঠে। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। দুদকও একাধিকবার সিটি ভবনে অভিযান করতে বাধ্য হয়। কিন্তু তারপরও মেয়র খোকনের কথার কমতি ছিল না। সূত্র বলছে, এ বিষয়টি দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পিড়া দিয়ছে। এছাড়াও সাঈদ খোকন নিজেকে আওয়ামী লীগের কর্মীর চেয়ে মোহাম্মদ হানিফের পুত্র পরিচয় দিতে বেশি গর্ববোধ করতেন। তার ভেতর কিছুটা অহংকারবোধ তৈরি হয়েছিল। ফলে দলের কেন্দ্রীয় নেতারাও অনেক সময় পাত্তা পেতেন না মেয়র খোকনের কাছে। তার এমন আচরণে কিছুটা ক্ষুব্ধ ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। ফলে বেশ কিছুদিন থেকে অনেক চেষ্টা করেও তিনি প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ পাননি বলে দলের একটি সূত্র জানিয়েছে। এর মধ্যে দলের মনোনয়ন ফরম বিতরণ শুরু হলে যখন শেখ ফজলে নুর তাপস ঢাকা দক্ষিণে মেয়র পদে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন, তখনই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। কারণ, বঙ্গবন্ধু পরিবারের ঘনিষ্ঠজন, টানা তিনবারের নির্বাচিত এমপি ও পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত তাপসের সামনে সাঈদ খোকন যে টিকতে পারবেন না- সেটি রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বুঝতে দেরি হয়নি। বিষয়টি আঁচ করতে পেরেই সাঈদ খোকন দলীয় মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন, আমার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে সবচেয়ে খারাপ সময় যাচ্ছে। নগরবাসীর দোয়াও চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই দোয়ায় তার ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। অর্থাৎ তার বর্ণনায় খারাপ সময়ের পরিবর্তন হয়নি। বরং এ মুহূর্তে তার চূড়ান্ত ধসই প্রতিফলিত হলো।
যেসব কারণে সাঈদ আউট: কিন্তু কেন রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে চূড়ান্ত ধস নামলো বঙ্গবন্ধুর সহযোদ্ধা সাবেক মেয়র হানিফের পুত্র মেয়র খোকনের? এখন সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছেন নগরবাসীসহ দেশের রাজনীতি সচেতন মহল। এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের দলীয় সূত্রে জানা গেছে, নগরবাসীর আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে না পারা, বিভিন্ন সময়ে বেফাঁস মন্তব্য, মশা নিধনে ব্যর্থতা ও নগরবাসীকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে না পারা- ইত্যাদি কারণে দলীয় মনোনয়ন পাননি খোকন। যেমনটি গত কয়েকদিন ধরেই বলে আসছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেছিলেন, ঢাকা সিটি নির্বাচনে কোনো বিতর্কিত ব্যক্তিকে মনোনয়ন দিবে না আওয়ামী লীগ। আর সাঈদ খোকন যে বিতর্কিত ছিলেন- তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যদিও সাঈদ খোকনের দাবি ছিল, তিনি কখনও কর্তব্যে অবহেলা করেননি।
আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারণী সূত্র জানায়, সাঈদ খোকন মেয়র হিসেবে পুরো একটি টার্ম দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়েছেন। কিন্তু এসময় ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতি ও বেফাঁস কিছু মন্তব্যের কারণে অনেকবার নেতিবাচক খবরের শিরোনাম হয়েছেন খোকন। এছাড়া, দলীয় রাজনীতিতেও কোন্দলে জড়িয়ে পড়েন তিনি, যেটা ক্ষমতাসীন দলের ইমেজকে নষ্ট করেছে। মেয়র হিসেবে খোকন নগরবাসীর আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে পারেননি। মূলত এসব কারণেই তাকে বাদ দিয়ে ডিএসসিসির মেয়র পদে এবার নতুন প্রার্থী দিয়েছে আওয়ামী লীগ।
খোকনের আলোচিত কিছু মন্তব্য: গত ২৫ জুলাই রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে এক অনুষ্ঠানে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যাকে ‘গুজব’ বলে অবহিত করেন মেয়র খোকন। তিনি বলেন, ‘মশা নিয়ে রাজনীতি কাম্য নয়। সাড়ে তিন লাখ আক্রান্তের যে তথ্য এসেছে সেটি কাল্পনিক তথ্য। ছেলেধরা আর সাড়ে তিন লাখ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত একই সূত্রে গাঁথা।’ মেয়রের এমন মন্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ দলের ভেতরে সমালোচনার ঝড় ওঠে।
এর আগে ২০১৭ সালের ১৬ নভেম্বর আজিমপুরের পার্ল হারবাল কমিউনিটি সেন্টারের পাশে কর্মী সমাবেশ ডাকে আওয়ামী লীগ। তার পাশেই ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন পাল্টা কর্মসূচি দেন। পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি দেওয়ায় কে বা কারা সমাবেশস্থলের সামনে সিটি করপোরেশনের ট্রাক ভর্তি করে ময়লা রেখে যায়। ওইসময় মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন মেয়র খোকন। এ নিয়ে সংবাদ শিরোনাম হয়। তখন দলীয়ভাবে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন খোকন।
প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ব্যর্থ মেয়র: মেয়র খোকন নির্বাচনের আগে ও পরে নগরবাসীকে বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু সেগুলোর পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারেননি। তবে অনেক দূর এগিয়েছেন বলে মনে করেন নগর বিশেষজ্ঞরা। তার প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে ছিল—নাগরিকদের জন্য ফুটপাত উন্মুক্ত করে দেওয়া, বুড়িগঙ্গার স্বরূপ ফিরিয়ে আনা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিকায়ন, ডিজিটাল নগরী প্রতিস্থাপন, অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধ, মাঠ ও পার্ক উদ্ধার, বস্তি উন্নয়ন ও যানজটমুক্ত ঢাকা গড়া। এসব প্রতিশ্রুতির মধ্যে পুরোপুরিভাবে কোনোটাই বাস্তবায়ন হয়নি। বরং কিছু কাজ শুরু হলেও সময়মত শেষ না হওয়ায় নগরবাসীর ভোগান্তি আরও বেড়েছে। অবশ্য কিছু যে সফলতা নেই তা নয়। কিন্তু সফলতাগুলো ঢাকা পড়েছে ব্যর্থতার নিচে। এ বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ ও বিশিষ্ট স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সাঈদ খোকন কথা বলার সময় তার শব্দ চয়ন ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারেননি। যেটা তার জন্য কাল হয়েছে। তবে তিনি ঢাকার ৩১টি খেলার মাঠ উদ্ধার করে বিশ্বমানের করে দিয়েছেন। অন্ধকার থেকে ঢাকার সড়কগুলোকে আলোকিত করেছেন—যা কোনও মেয়র করতে পারেননি।’
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘মেয়র খোকনের সামনে ভালো কাজ করার অনেক সুযোগ ছিল। তিনি চেষ্টাও করেছেন। এখতিয়ারবহির্ভূত কিছু প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছিলেন। যে কারণে সব প্রতিশ্রুতি তিনি বাস্তবায়ন করতে পারেননি।’
যেভাবে উত্থান খোকনের: মেয়র সাঈদ খোকন ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ হানিফের ছেলে। তিনি পুরান ঢাকার অন্যতম ব্যক্তিত্ব মাজেদ সর্দারের নাতি। তবে বাবা মোহাম্মদ হানিফের পুত্র হিসেবেই সাঈদ খোকন রাজনীতিতে জায়গা করে নেন। তিনি আওয়ামী লীগে নাম লেখান ১৯৮৭ সালে ওয়ার্ড শাখার আইনবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে। ১৯৯৯ সালে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ২০০৪ সালে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে মনোনীত হন। সর্বশেষ তিনি মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি পদে ছিলেন। ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচনে ৫ লাখ ৩৫ হাজার ২৯৬ ভোট পেয়ে তিনি মেয়র নির্বাচিত হয়ে জাতীয় নেতা হিসেবে আবির্ভুত হন। তিনি আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে বিএনপির প্রার্থী মির্জা আব্বাসকে হারিয়ে মেয়র নির্বাচিত হন। ৬ মে তিনি মেয়র হিসেবে শপথ নেন।
তার ভবিষ্যৎ কী?: মেয়র পদে মনোনয়ন না পেলেও সাঈদ খোকনের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শেষ হয়ে গেছে- এটা মনে করেন না কেউই। কারণ, ঢাকার মেয়র না থাকলেও রাজনীতিতে ভালো জায়গা করে নেয়ার সুযোগ আছে তার। অবশ্য পুরো বিষয়টিও দলীয় প্রধানের সুদৃষ্টির উপর নির্ভর করে বলে অনেকে মনে করেন। দলের অনেকেই বলছেন, হয়তো দলীয় প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা- সাঈদ খোকনকে সংশোধনের সুযোগ দিবেন এবং দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে তাকে নিয়ে আসতে পারেন। এমনটি হলে সাঈদ খোকনও মেয়রের পদ হারানোর কষ্ট ভুলে জাতীয় রাজনৈতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হতে পারেন। তবে বাস্তবে কী ঘটবে- তা হয়তো সময়ই বলে দিবে।

