রাজধানীর ৮২% এলাকা কংক্রিটে ঢাকা!
উত্তরদক্ষিণ অনলাইন । ০৪ জানুয়ারি ২০২০ । আপডেট ১৭:৫৬
রাজধানী ঢাকার বেশ কয়েকটি এলাকায় প্রয়োজনের তুলনায় জলজ ভূমি ও সবুজ এলাকার পরিমাণ শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। সেসব এলকায় বেড়েছে কংক্রিটের আচ্ছাদন। এক গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে ঢাকার ৮২ ভাগ এলাকা কংক্রিটে ঢেকে গেছে। দুই দশক আগেও যা ছিল ৬৪ দশমিক ৯৯ ভাগ।
শনিবার (৪ জানুয়ারি) রাজধানীর বাংলামোটরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির পক্ষ থেকে ওই গবেষণা প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়। ‘ঢাকা শহরের সবুজ এলাকা, জলাশয়, খোলা উদ্যান ও কংক্রিট আচ্ছাদিত এলাকার বিদ্যমান অবস্থা ও বিগত ২০ বছরে পরিবর্তন’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয় সংবাদ সম্মেলনে।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকায় ১৯৯৯ সালে জলজ ভূমি ছিল ১৪ দশমিক ২৫ শতাংশ। ২০০৯ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছিল ৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। ২০১৯ সালে তা আরও কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৩৮ শতাংশে। সবুজ এলাকা ১৯৯৯ সালে ছিল ৬ দশমিক ৬৯ শতাংশ। ২০০৯ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৯ দশমিক ২৯ শতাংশে। কিন্তু ২০১৯ সালে তা আবারও কমে হয়েছে ৯ দশমিক ২০ শতাংশ।
কংক্রিট আচ্ছাদিত এলাকা ১৯৯৯ সালে ছিল ৬৪ দশমিক ৯৯ ভাগ, ২০০৯ সালে বেড়ে হয় ৭৭ দশমিক ১৮ ভাগ। আর ২০১৯ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৮১ দশমিক ৮২ শতাংশে। রাজধানীতে ১৯৯৯ সালে খোলা জায়গা ছিল ১৪ দশমিক ৭ ভাগ, ২০০৯ সালে ছিল ৭ দশমিক ৮০ শতাংশ; ২০১৯ সালে এসে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৬১ শতাংশে।
বিআইপির গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বারিধারা, বনানী, গুলশান, মহাখালী ও বাড্ডা এলাকায় কংক্রিট আচ্ছাদিত এলাকার শতকরা হার ৮৮ দশমিক ৪ শতাংশ, সেই তুলনায় সবুজ মাত্র শূন্য দশমিক ৮৪ ভাগ। এছাড়া ঢাকার মিরপুরের বড়বাগ, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া ও ইব্রাহিমপুর এলাকায় কংক্রিট আচ্ছাদিত এলাকা ৯৯ দশমিক ১৪ ভাগ। খিলগাঁও, গোড়ান, মেরাদিয়া, বাসাবো ও রাজারবাগ এলাকায় কংক্রিট আচ্ছাদিত এলাকা ৯৭ দশমিক ৬০ ভাগ, সেই তুলনায় সবুজ মাত্র শূন্য দশমিক ৯০ ভাগ।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি পুরান ঢাকার। সেখানে সোয়ারী ঘাট ও বংশাল এলাকার ১০০ ভাগই কংক্রিট আচ্ছাদিত। সিদ্দিকবাজার ও শাঁখারীবাজার এলাকায় কংক্রিট আচ্ছাদিত এলাকার শতকরা হার ৯৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। সেই তুলনায় এসব এলাকায় কোনো সবুজ নেই, জলজ এলাকার পরিমাণও অতি নগণ্য।
প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিআইপি সাধারণ সম্পাদক আদিল মুহাম্মদ খান জানান, আমেরিকার ভূতাত্ত্বিক জরিপ পদ্ধতি ইউএসজিএস আর্থ এক্সপ্লোরার ডেটাবেইজ সিস্টেম থেকে সংগৃহীত ল্যান্ডসেট ডেটা ব্যবহার করে এই প্রতিবেদন তৈরি করেছেন তারা। আধুনিক নগরের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে কর্তৃপক্ষ নজর দিতে ব্যর্থ হয়েছে মন্তব্য করেন এই নগর পরিকল্পনাবিদ। তিনি বলেন, নগরে উন্মুক্ত স্থানগুলো আমরা নগরায়নের নামে ভরাট করে ফেলছি। নগরে ৩০ ভাগ জলাশয় ও সবুজ এলাকা বাড়ানোর কথা থাকলেও সে জায়গায় আমরা গুরুত্ব দেইনি। সিটির ডেভেলপমেন্ট প্ল্যানের কতটুকু পারমিট হবে… শহরের ইন্টিগ্রেটেড সিচুয়েশনের সঙ্গে তার সম্পর্ক- এসব নিয়ে চিন্তা করার মতো নীতিনির্ধারক পর্যায়ে আমাদের অবশ্যই পৌঁছাতে হবে।
নগরে ওয়ার্ডভিত্তিক জলাশয় ও সবুজ ‘পাবলিক স্পেস’ তৈরির পাশাপাশি নগরীকে ঘিরে থাকা চার নদী বুড়িগঙ্গা, বালু, শীতলক্ষ্যা ও তুরাগের তীরে সবুজ বেষ্টনী তৈরির প্রস্তাব করেন বিআইপি সাধারণ সম্পাদক। আদিল মুহাম্মদ বলেন, জমি পাওয়া না গেলে ওয়ার্ডগুলোতে ছোট ছোট স্পেস তৈরি করা যেতে পারে। ঢাকাকে বাঁচাতে হলে এর কোনো বিকল্প নেই।
রাজধানীতে নতুন করে আর যাতে আবাসিক এলাকা না হয়, সে ব্যবস্থা নিতেও সরকারের প্রতি অনুরোধ জানানো হয় সংগঠনটির পক্ষ থেকে। এ বিষয়ে আদিল বলেন, স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে নগরীর অবকাঠামোর সঙ্গে সবুজ ও জলাশয় এলাকার মধ্যে একটা ভারসাম্য তৈরি করতে হবে।
অপরদিকে, রাজধানীর নাগরিক সুবিধাগুলো ধীরে ধীরে মফস্বলেও দেওয়ার ব্যবস্থা করতে নিয়ন্ত্রিত কর্মপদ্ধতি গ্রহণের সুপারিশ করেন বিআইপি সভাপতি আকতার মাহমুদ। তিনি বলেন, কর্মসংস্থানের পাশাপাশি মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ নাগরিক সুযোগ সুবিধাগুলো যদি আমরা পৌরসভা পর্যায় পর্যন্ত নিশ্চিৎ করতে পারি, তাহলে ঢাকার ওপর চাপ কমে আসবে। এর জন্য আমাদের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও স্থানিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে।
রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসন ও নাগরিক বিনোদন কেন্দ্র নির্মাণের লক্ষ্যে রাজউকের ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান ও ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যানের মধ্যে পাঁচটি বৃহৎ জলাধার তৈরির পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের অনুরোধ করেন তিনি। বিআইপির সাবেক সভাপতি এ কে এম আবুল কালাম, সাবেক সহ-সভাপতি মো. ফজলে রেজা সুমন সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।

