মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী শাসক কাবুসের অজানা গল্প

মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী শাসক কাবুসের অজানা গল্প

উত্তরদক্ষিণ অনলাইন । ১১ জানুয়ারি ২০২০ । আপডেট ১৫:১০

মধ্যপ্রাচ্য বা আরব বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী শাসক ওমানের সুলতান কাবুস বিন সাইদ আল সাইদ মারা গেছেন। তার বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর। ১৯৭০ সালে ব্রিটিশদের সহায়তা নিয়ে তিনি তার পিতাকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ করে নিজে ক্ষমতা দখল করেন। এরপর দেশটির তেল সম্পদকে কাজে লাগিয়ে তিনি ওমানকে উন্নয়নের পথে আনেন। সুলতান কাবুস ওমানের জনগণের কাছে জনপ্রিয় ছিলেন এবং তার হাতেই ছিল সম্পূর্ণ রাজতন্ত্র। যেকোনও বিরোধী মতকে তিনি কঠোরভাবে দমন করতেন।

তার মৃত্যুর কারণ এখনো নিশ্চিত করা হয়নি। তার চাচাতো ভাই হাইথাম বিন তারিক আল সাঈদ এখন ক্ষমতা গ্রহণ করেছেন। এর আগে তিনি ওমানের সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য বিষয়ক মন্ত্রী ছিলেন। সুলতান কাবুস-এর মৃত্যুর পর রাজপরিবারে এক বৈঠক হয় এবং তারপর শপথ গ্রহণ করেন হাইথাম বিন তারিক আল সাঈদ।

ওমানে যেকোনও সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষেত্রে সুলতানের সর্বোচ্চ ক্ষমতা রয়েছে। ওমানের সুলতান একাধারে দেশটির প্রধানমন্ত্রী, সামরিক বাহিনী সর্বাধিনায়ক, প্রতিরক্ষামন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সুলতান কাবুস-এর কোনও উত্তরাধিকারী (সন্তান) নেই। তার উত্তরাধীকারী হিসেবে তিনি কাউকে নির্বাচনও করেননি। চিকিৎসার জন্য গত সপ্তাহে তিনি বেলজিয়াম গিয়েছিলেন। তখন খবর বেরিয়েছিল যে, তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত। তবে সেটিও রাজপরিবার থেকে নিশ্চিত করা হয়নি।

নিরপেক্ষ নীতি: মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক উত্থান-পতনের মধ্যেও ওমান এবং সুলতান কাবুসের ক্ষমতায় তার আচর লাগেনি। গত প্রায় ৫০ বছর যাবত সুলতান কাবুস ওমানের রাজতন্ত্র একচ্ছত্রভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছেন। ওমানের জনসংখ্যা প্রায় ৪৬ লাখ, যার মধ্যে ৪৩ শতাংশ বিদেশি নাগরিক। ২৯ বছর বয়সে তিনি তার বাবা সাঈদ বিন তৈমুরকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। তার বাবা ছিলেন ভীষণ রক্ষণশীল। তিনি ওমানে অনেক বিষয় নিষিদ্ধ করেছিলেন। এর মধ্যে ছিল- রেডিও শোনা এবং সানগ্লাস নিষিদ্ধ করা। ওমানে কে বিয়ে করতে পারবে, কে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবে, এমনকি কে দেশত্যাগ করবে – এসব কিছুর সিদ্ধান্ত তিনি দিতেন। এমন পরিস্থিতিতে দেশের মানুষের মধ্যে কিছুটা সুলতানের প্রতি ক্ষোভ ছিল। সেটাকে পুঁজি করে পিতাকে ক্ষমতাচ্যুৎ করে সুলতান বনে যান পুত্র কাবুস। আর ক্ষমতা দখল করেই তিনি ওমানে আধুনিক সরকার প্রতিষ্ঠা করার ঘোষণা দেন। এর পেছনে ব্রিটেনসহ পশ্চিমাদের সমর্থন থাকায় কাবুসকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। নিজের যোগ্যতা, দক্ষতা দিয়ে তেল, স্বর্ণসহ খনিজ সম্পদ সমৃদ্ধ ওমানকে উন্নত দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সফল হন এই রাজতন্ত্রের সুলতান। ছোট দেশ হওয়ায় আর সৌদি এবং পশ্চিমাদের মন যোগিয়ে চলায় ক্ষমতা হারাতে হয়নি জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও। ফলে সুলতান হিসেবেই মৃত্যু হয় তার।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কাবুস যখন তার বাবাকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করেন, তখন ওমানে মাত্র ১০ কিলোমিটার পাকা সড়ক এবং তিনটি স্কুল ছিল। সুলতান কাবুস তখন ঘোষণা করেন, দেশটির তেল সম্পদ কাজে লাগিয়ে তিনি দেশের আধুনিকায়ন করবেন।

আর তিনি ক্ষমতাগ্রহণের কয়েক বছরের মধ্যেই ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের সাহায্য নিয়ে ওমানের দক্ষিণাঞ্চলে উপজাতিদের বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা দমন করেন। সুলতান কাবুসকে মনে করা হতো একজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন শাসক। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে তিনি নিরপেক্ষ নীতি গ্রহণ করেছিলেন। ২০১৩ সালে ইরান এবং আমেরিকার মধ্যে পর্দার আড়ালে আলোচনার সূত্রপাত করাতে ভূমিকা রাখেন সুলতান কাবুস। সে ধারাবাহিকতায় ঐতিহাসিক পরমাণু অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ চুক্তি হয়েছিল।

সম্পূর্ণ কর্তৃত্ববাদী শাসন: ২০১১ সালে আরব বসন্তের সময় ওমানেও কিছু অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু দেশটিতে বড় ধরণের কোনও বিক্ষোভ হয়নি। কিন্তু ওমানের বিভিন্ন জায়গায় হাজার-হাজার মানুষ ভালো মজুরির দাবিতে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেন। তাদের দাবির মধ্যে আরো ছিল অধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এবং দুর্নীতি বন্ধ করা। নিরাপত্তা বাহিনী প্রথম দিকে সে বিক্ষোভের প্রতি কিছুটা নমনীয় ভাব দেখিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার গ্যাস, রাবার বুলেট এবং তাজা গুলি ছুঁড়েছে। তখন দুজন বিক্ষোভকারী নিহত হয়। ‘বেআইনি সমাবেশ’ এবং ‘সুলতানকে অপমান’ করার অভিযোগে শতশত মানুষকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে ওই ঘটনার পর।

বিক্ষোভকারীরা বড় ধরণের পরিবর্তন আনতে সক্ষম না হলেও দুর্নীতিবাজ বলে মনে করা হয় এবং একই সাথে দীর্ঘ সময় ধরে মন্ত্রিত্বে থাকা কিছু ব্যক্তিকে সরিয়ে দেন সুলতান। তিনি সরকারি চাকরির সুযোগ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতিও দেন আন্দোলনের প্রেক্ষিতে।

তখন থেকে কর্তৃপক্ষ সরকারের সমালোচক হিসেবে পরিচিত স্বাধীন সংবাদমাধ্যমগুলোকে বন্ধ করে দেয়। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, তখন বিভিন্ন বই বাজেয়াপ্ত এবং মানবাধিকার কর্মীদের হয়রানিও করা হয়।

কাবুসের মৃত্যুতে ওমানের সুলতানের পরিবর্তন হলেও রাজতন্ত্রের বিলোপের এ মুহূর্তে কোনো সম্ভাবনা নেই বলেই মনে করেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। তবে নতুন শাসক কতটা দক্ষতা ও যোগ্যতার পরিচয় দিতে পারবেন রাষ্ট্র শাসনে সেদিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সচেতন মহলের।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading