করোনাভাইরাস মহামারি: বিশ্বব্যাপী জরুরি অবস্থা ঘোষণা
উত্তরদক্ষিণ অনলাইন ।৩১ জানুয়ারি ২০২০ । আপডেট ১৯ঃ১০
করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব চীনের বাইরেও অনেক দেশে ছড়িয়ে পড়ায় বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। এরই মধ্যে প্রাণঘাতি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ২ শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছেন হাজার হাজার মানুষ।
ডব্লিউএইচও- এর প্রধান টেড্রোস অ্যাধনম ঘেব্রেইয়েসাস বলেছেন, চীনে ঠিক কী হচ্ছে- সেটার জন্য এই ঘোষণা দেয়া হয়নি। বরং অন্যান্য দেশে যা ঘটছে, সেটাই এই ঘোষণার মূল কারণ।
এদিকে, চীনের উহান শহরে আটকে থাকা বাংলাদেশিদের দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তাছাড়া পদ্মাসেতু ও কয়লা খনিতে কর্মরত চীনা নাগরিকরা সম্প্রতি বাংলাদেশে এসেছেন। তাদেরকে আলাদা করে রেখে পর্যবেক্ষণ করার কথা জানানো হয়েছে সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে। তবে এ নিয়ে দেশবাসীর মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। সূত্রমতে, চীন ফেরতদের মধ্যে ক’জন, শাসকষ্ট ও সর্দি-কাঁশি নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, উদ্বেগ রয়েছে যে- এই ভাইরাস দুর্বল স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দেশগুলোতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। বাংলাদেশে এখনও ভাইরাসটি শনাক্ত না হলেও চীনের পাশাপশি ইন্ডিয়া, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, আমেরিকা, ব্রিটেন, ফ্রান্সসহ বিশ্বের অনেক দেশ আক্রান্ত করোনাভাইরাসে। এসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের নিয়মিত যাতায়াত থাকায় দেশেও এই প্রাণঘাতি ভাইরাসটি ঢুকে পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না। তাছাড়া পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার কারণেই বিশ্বব্যাপী জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমেরিকা তাদের নাগরিকদের বলেছে-তারা যেন চীনে ভ্রমণ করতে না যায়। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর চার স্তরের সতর্কতা জারি করেছে। এর আগে আমেরিকানদের চীনে ভ্রমণের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করার আহ্বান জানানো হয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছে যে, চীনে যেসব মার্কিন নাগরিক আছে তারা যেন সতর্ক থাকেন।
চীনে আক্রান্ত ১০ হাজার, মৃত ২১৩: চীনে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাসে এ পর্যন্ত ১০ হাজার জনের আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে অন্তত ২১৩ জনের।
ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, অন্যান্য ১৮টি দেশে আরও ৯৮জন মানুষের আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে চীনের বাইরে এখনও কারও মৃত্যু হয়নি। চীনের বাইরের দেশের যতো মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের বেশিরভাগ চীনের উহার শহরে ছিলেন, যেখান থেকে এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়। তবে জার্মানি, জাপান, ভিয়েতনাম এবং মার্কিন আমেরিকার মানুষে মানুষে-ভাইরাস সংক্রমণের ৮টি ঘটনা ঘটেছে বলে ডব্লিউএইচও নিশ্চিত হয়েছে।
জেনেভাতে এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখার সময় ড. টেড্রোস ভাইরাসটিকে একটি অভূতপূর্ব প্রাদুর্ভাব হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যাকে নিয়ে প্রতিক্রিয়াও অভূতপূর্ব। তিনি চীনা কর্তৃপক্ষের অসাধারণ পদক্ষেপ গ্রহণের প্রশংসা করেন এবং বলেছেন, চীনে বাণিজ্য বা ভ্রমণ সীমাবদ্ধ করার কোনও কারণ নেই। একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলি, এই ঘোষণাটি চীনের প্রতি অবিশ্বাস বা অনাস্থার জন্য নয়, তিনি বলেন।
তবে বিভিন্ন দেশ সীমান্ত বন্ধ করার পাশাপাশি বা ফ্লাইট বাতিল করার পদক্ষেপ নিয়েছে গুগল, আইকা, স্টারবাকস এবং টেসলার মতো সংস্থাগুলি । তারা তাদের দোকান বন্ধ করে দিয়েছে বা কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে। এই ভাইরাস যদি এমন একটি দেশে প্রবেশ করে যাদের এমন প্রাদুর্ভাব মোকাবিলার সক্ষমতা নেই, তখন কী হবে? অনেক নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে এই ভাইরাসের আক্রান্ত হওয়ার বিষয়ে শনাক্ত করা এবং আক্রান্ত ব্যক্তির দেখভাল করার সরঞ্জামের অভাব রয়েছে।
আশঙ্কা হলো- সেসব দেশে এই ভাইরাস অনিয়ন্ত্রিতভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং কিছু সময়ের জন্য বিষয়টি নজরে নাও পড়তে পারে। মনে রাখবেন এটি এমন একটি রোগ, যা কেবল গত মাসে উদ্ভূত হয়েছিল এবং ইতিমধ্যে চীনের প্রায় ১০ হাজার জনের এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার খবর নিশ্চিত হওয়া গিয়েছে।
২০১৪ সালে পশ্চিম আফ্রিকার ইবোলার প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়- যা ছিল মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রাদুর্ভাব। সেখান থেকে বোঝা যায় যে, এরকম প্রাদুর্ভাব দারিদ্র্যপীড়িত দেশগুলোর ওপর কত ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে। নভেল করোনাভাইরাস যদি এই জায়গাগুলিতে উল্লেখযোগ্য হারে ছড়িয়ে পড়ে, তবে এটি নিয়ন্ত্রণ করা অবিশ্বাস্য রকমভাবে কঠিন হয়ে পড়বে। আমরা এখনও সেই পর্যায়ে নেই – আক্রান্ত হওয়ার ৯৯% ঘটনাই ঘটেছে চীনে। এবং ডব্লিউএইচও এতোটুকু নিশ্চিত হতে পারছে যে, দেশটি সেখানকার এই প্রকোপ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। তবে বৈশ্বিক জরুরি অবস্থা ঘোষণার মাধ্যমে ডব্লিউএইচও নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোয় তাদের নজরদারি চালাতে পারবে। যেন তাদের রোগ নির্ণয় করার পদ্ধতি জোরদার করা যায় এবং এ ধরণের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় তাদের প্রস্তুত করা যায়।
বৈশ্বিক জরুরি অবস্থা ঘোষণা কেন?: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা- এর আগেও পাঁচবার বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। কোনও রোগ খুব দ্রুত এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছড়িয়ে পড়ার কারণে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি মুখে পড়লে এই জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়। বিশেষ করে যদি এই প্রাদুর্ভাবের এমন বড় কোন ঘটনা ঘটে- যা বৈশ্বিক উদ্বেগের সৃষ্টি করে।
বিবিসির খবরে বলা হয়, এইচ-ওয়ান-এন-ওয়ান ভাইরাসটি ২০০৯ সালে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল, এতে প্রায় ২ লক্ষাধিক মানুষ মারা যায়। ২০১২ সালে পোলিও প্রায় নির্মূলের পর্যায়ে চলে গেলেও ২০১৩ সালে পোলিওর সংখ্যা আবার বেড়ে যায়। আমেরিকা অঞ্চলে জিকা রোগটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পরে ডব্লিউএইচও ২০১৬ সালে জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে। এছাড়া পশ্চিম আফ্রিকাতে প্রায় ৩০ হাজার লোক সংক্রামিত হওয়ায় এবং ১১ হাজার মানুষ ইবোলায় প্রাণ হারানোর কারণে ভাইরাসটির বিরুদ্ধে প্রথম জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয় ২০১৪ সালে আগস্টে। যা ২০১৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল। ডিআর কঙ্গোতে এই প্রাদুর্ভাব পুনরায় ছড়িয়ে পড়ায় গত বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালে দ্বিতীয়বারের মতো জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়।
চীন কীভাবে মহামারী মোকাবিলা করছে?: তিব্বতে একজনের করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার অর্থ হলো এই ভাইরাস চীনের মূল ভূখণ্ড প্রতিটি অঞ্চলে পৌঁছে গিয়েছে। দেশটির জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশনের তথ্য অনুযায়ী- ৯ হাজার ৬৯২ জনের স্বাস্থ্য পরীক্ষায় এই ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। প্রায় সমস্ত মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে চীনের কেন্দ্রীয় হুবেই প্রদেশে। এজন্য সেখানে সবাইকে একপ্রকার আটক অবস্থায় রাখা হয়েছে।
৬ কোটি মানুষের ওই প্রদেশটির উহান শহর থেকে ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়। শহরটিকে চারিদিক থেকে কার্যকরভাবে আটকে রাখা হয়েছে এবং চীন ভাইরাসটির বিস্তার রোধে পরিবহনে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। হুবেইতে থাকা মানুষদের বলা হয়েছে, তারা যেন ঘরের ভেতরে থেকেই সব ধরণের কাজ করেন। যতক্ষণ না পরিস্থিতি তাদের ফিরে আসার জন্য নিরাপদ হচ্ছে। এই ভাইরাসটি চীনের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে, যেটা কিনা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম। কেননা অনেক দেশ ইতিমধ্যে তাদের নাগরিকদের খুব বেশি প্রয়োজন ছাড়া চীনে ভ্রমণ না করার পরামর্শ দিচ্ছে।
বৈশ্বিক পরিস্থিতি: উহান থেকে কয়েক শতাধিক বিদেশি নাগরিককে বের করে আনার কাজ চলছে। যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর এবং নিউজিল্যান্ড- এই বের করে আনা মানুষদের থেকে সংক্রমণ এড়াতে অন্তত দুই সপ্তাহের জন্য তাদের আলাদা করে রাখবে বলে জানা গেছে। এই ১৪ দিন তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা নীরিক্ষা করা হবে, তাদের কেউ আক্রান্ত কিনা বোঝার জন্য। অস্ট্রেলিয়া তাদের মূল ভূখণ্ড থেকে ২ হাজার কিলোমিটার (১,২০০ মাইল) দূরে ক্রিসমাস দ্বীপের একটি আশ্রয় শিবিরে তাদের ফিরিয়ে আনা নাগরিকদের আলাদা করে রাখার পরিকল্পনা করছে। ওই শিবিরটি আশ্রয় প্রত্যাশিদের রাখার জন্য ব্যবহৃত হয়।
ইতালি: রোমে দু’জন চীনা পর্যটক ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পরে চীনে যাওয়ার ফ্লাইট স্থগিত করে ইতালি। এর আগে একটি ক্রুজ জাহাজ থেকে ৬০০০ যাত্রীর নামার ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।
যুক্তরাষ্ট্র: যুক্তরাষ্ট্রেপ্রথম কারও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার খবরটি নিশ্চিত করে , শিকাগোর স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা। মানুষ থেকে মানুষে ভাইরাস সংক্রমণের খবরটি ওই রাজ্য থেকে জানা যায়। প্রায় ২০০ মার্কিন নাগরিককে উহান থেকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে এবং কমপক্ষে ৭২ ঘন্টার জন্য তাদেরকে ক্যালিফোর্নিয়ার একটি সামরিক ঘাঁটিতে আলাদা করে রাখা হয়েছে।
রাশিয়া: রাশিয়া, তাদের পূর্বদিকে চীনের সাথে ৪,৩০০ কিলোমিটার (২.৬৭০ মাইল) সীমান্ত বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
জাপান: জাপানের দুটি ফ্লাইট ইতিমধ্যে টোকিওতে অবতরণ করেছে। জাপান এখন চীনের জন্য তাদের সংক্রামক রোগের পরামর্শের স্তর বাড়িয়েছে।
ফ্রান্স: প্রায় ২৫০জন ফরাসি নাগরিককে উহান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে
ইন্ডিয়া: ইন্ডিয়ায় ভাইরাসটির প্রথম ঘটনাটি নিশ্চিত করেছে – দক্ষিণে কেরালা রাজ্যের এক ছাত্র, যিনি উহান শহরে পড়াশোনা করতেন, তার শরীরে এই ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে।
ইসরায়েল: চীনের সাথে সমস্ত ফ্লাইট সংযোগ নিষিদ্ধ করেছে ইসরায়েল। আর পাপুয়া নিউ গিনি, এশিয়ান বন্দর থেকে সমস্ত ভ্রমণকারীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে। তবে বাংলাদেশের সঙ্গে এখনও চীনের ফ্লাইট আসা-যাওয়া অব্যাহত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, প্রতিদিন ঢাকা-বেইজিং ৪টি ফ্লাইটে ৪০০ শতাধিক মানুষ আসা-যাওয়া করে।

