ইতালিতে একদিনে মৃত্যু ৯শ, বিশ্ব পরিস্থিতি ভয়াবহ!

ইতালিতে একদিনে মৃত্যু ৯শ, বিশ্ব পরিস্থিতি ভয়াবহ!

উত্তরদক্ষিণ অনলাইন: ২৮ মার্চ ২০২০ । ১৭:৪০

করোনাভাইরাসে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর শীর্ষ ৩টি দেশের একটি ইউরোপের দেশ ইতালি। তবে একদিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ডে বিশ্বে ইতালির নামই সবার উপরে। জানা গেছে, করোনাভাইরাসে একদিনে বিশ্বে রেকর্ড পরিমাণ ৯১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে ইতালিতে। এ নিয়ে দেশটিতে করোনাভাইরাসে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ১৩৪ জনে। মৃত্যুদের মধ্যে ৪৬ জন চিকিৎসক রয়েছেন।

ইউরোপের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ ইতালিতে প্রায় সবকিছু বন্ধ রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে মানুষকে ঘরে থাকতে বলা হয়েছে। পুরোদেশ লকডাউন করা হয়েছে। তারপরও মৃত্যুর মিছিল থামানো যাচ্ছে না। গত শুক্রবার (২৭ মার্চ) ইতালির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল যে, চলাফেরা এবং স্বাভাবিক কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা ৩ এপ্রিল পর্যন্ত বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান টেড্রোস ঘেব্রেয়েসাস কিছুদিন আগে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে, করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে সুরক্ষা উপকরণের ‘বৈশ্বিক ঘাটতি’ দেখা দিতে পারে। যা হবে জীবন বাঁচানোর সক্ষমতার ক্ষেত্রে ‘সবচেয়ে ভয়াবহ হুমকি’গুলোর একটি।

ইতালির সবশেষ পরিস্থিতি: ইতালির উত্তরাঞ্চলীয় এলাকা লোমবার্দিতে, যেটি দেশটির সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা, এই লোমবার্দিতে কোভিড-১৯ এ মৃত্যুর সংখ্যা ব্যাপক হারে বেড়েছে বলে ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসির খবরে উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী গণমাধ্যমটি বলছে, যদিও বৃহস্পতিবার মৃত্যুর সংখ্যা আগেরদিনের চেয়ে কমে যাওয়ায় আশা করা হচ্ছিল যে, ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আসা শুরু হয়েছে। ইতালিতে নতুন করে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে ৫ হাজার ৯৫৯ জনের মধ্যে। দেশটির অপেক্ষাকৃত দরিদ্র দক্ষিণাঞ্চলীয় এলাকায় ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকায় আশঙ্কা আরও বাড়ছে।

নেপলসের কাছের বৃহস্পতিবার ক্যাম্পানিয়া অঞ্চলের প্রেসিডেন্ট ভিনসেনজো ডে লুকা বলেন, কেন্দ্রীয় সরকার ভেন্টিলেটরসহ গুরুত্বপূর্ণ জীবন রক্ষাকারী উপাদান সরবরাহ করার আশ্বাস দিলেও তারা এখনও তা দেয়নি। তিনি জানান, দক্ষিণাঞ্চলের পরিস্থিতি লোমবার্দির মতো হতে পারে বলে এ মুহূর্তে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সেদিনই ইতালির প্রেসিডেন্ট গুইসেপ্পে কন্টে মন্তব্য করেন যে, পুরো ইউরোপই অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যে দিয়ে যেতে পারে।

দ্বিতীয় দফায় ইতালির অর্থনীতিতে আড়াই হাজার কোটি ইউরো তহবিল ঘোষণা করেন তিনি। ইতালির পরিস্থিতি এখন এমন হয়েছে যে, প্রতিদিনই যেন একটি গ্রামের লোকসংখ্যার সমান মানুষ মারা যাচ্ছে সেখানে।

শনিবার দুপুরে বিবিসির খবরে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় শুধু লোমবার্দি অঞ্চলেই ৫৪১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আশার আলো দেখা প্রায় অসম্ভব হলেও ইতালির গত কয়েকদিনের সংক্রমণের হার কিছুটা হলেও আশাবাদী করছে দেশের মানুষকে। গত কয়েকদিন ধরে সংক্রমণের হার কিছুটা কমের দিকে। কিন্তু দু্ই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে পুরোদেশ লকডাউন পরিস্থিতিতে থাকায় সব ধরণের কাজই হচ্ছে ধীরগতিতে।

প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ৪৬ জন চিকিৎসক মারা গেছেন। দেশটির জাতীয় স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, অবরুদ্ধ পরিস্থিতি আরো দীর্ঘ সময়ের জন্য কার্যকর করা প্রয়োজন, প্রয়োজনে কয়েক মাসব্যাপী। তবে এ ধরণের পদক্ষেপের ফলে শুধু ইতালিতেই উদ্বেগ বাড়বে না, বিশ্বের অন্যান্য দেশে, যেখানে ইতালির মডেল অনুসরণ করা হচ্ছে ভাইরাস প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ করার জন্য, সেসব দেশেও মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হবে। অবরুদ্ধ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকায় হুমকির মুখে পড়েছে ইতালির অর্থনীতি।

ভাইরাস ছড়ানোর মাত্রা ও লকডাউনের দিক থেকে হিসাব করলে ইতালি বাকি ইউরোপের চেয়ে এক বা দুই সপ্তাহ এগিয়ে রয়েছে। অর্থাৎ আগামী কিছুদিনের মধ্যেই ইউরোপের অন্যান্য দেশেও একই ধরণের পরিস্থিতি ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কাজেই ইতালিতে কী ধরণের পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে- তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে বাকি ইউরোপ।

ইউরোপের অন্যান্য দেশের পরিস্থিতি: পশ্চিমা দেশের নেতাদের মধ্যে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনই প্রথম করোনাভাইরাস আক্রান্ত হয়েছেন বলে এখন পর্যন্ত জানা যাচ্ছে। তিনি জানিয়েছেন তার মধ্যে ‘মৃদু উপসর্গ’ দেখা গেছে এবং তিনি নিজেকে ডাউনিং স্ট্রিটে সেল্ফ আইসোলেট বা বিচ্ছিন্ন করে রেখেছেন। তবে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ‘ভাইরাস মোকাবিলা করার লক্ষ্যে সরকারে কার্যক্রমের নেতৃত্ব’ দেবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

ইতালির পর ইউরোপের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশ স্পেনে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়লেও নতুন সংক্রমণের সংখ্যা স্থিতিশীল হয়ে আসছে বলে জানিয়েছেন দেশটির কর্মকর্তারা। ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া মানুষের হার আগের দিনের চেয়ে বেড়েছে ১৪%, যেই সংখ্যাটি বৃহস্পতিবার ছিল ১৮%। শেষ ২৪ ঘণ্টয় স্পেনে মারা গেছে ৭৬৯ জন, যা দৈনিক মৃত্যুর হিসাবে সর্বোচ্চ রেকর্ড। এ পর্যন্ত স্পেনে মোট মারা গেছেন ৪ হাজার ৮৫৮ জন। স্পেনের সরকার জরুরি অবস্থা ১২ এপ্রিল পর্যন্ত বাড়িয়েছে। মানুষের চলাফেরার ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে এবং দোকানপাট, ব্যবসা বাণিজ্য বন্ধ রয়েছে।

শুক্রবার ফ্রান্স সরকার জানায়, আগের ২৪ ঘণ্টয় তাদের দেশে ২৯৯ জন মারা গেছে, যা আগের দিনের দৈনিক পরিসংখ্যানের হিসেবে কম। এ নিয়ে ফ্রান্সে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯৯৫ জনে। প্রায় ৩৩ হাজার মানুষের মধ্যে ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। গত শুক্রবার ফরাসী প্রধানমন্ত্রী এডুয়ার্ড ফিলিপ জানান, মানুষকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত ঘরে থাকতে হবে।

ব্রিটেনে করোনাভাইরাসে এখন পর্যন্ত ১১ হাজার ৬৫৮ জন আক্রান্ত হয়েছেন। এরমধ্যে মারা গেছেন ৫৭৮ জন। আর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১৩৫ জন।

বিশ্ব পরিস্থিতি: এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি সংখ্যক কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হয়েছে আমেরিকায়। শুক্রবার জানানো হয়, দেশটিতে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখ ছাড়িয়েছে। সারাদেশে এখন পর্যন্ত মারা গেছে অন্তত ১ হাজার ৩০০ মানুষ।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয়ভাবে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার নির্দেশনা প্রকাশ করার পরিকল্পনা করছে তার দল, যেখানে কয়েকটি রাজ্যে অবরুদ্ধ থাকার আদেশ শিথিল করা হতে পারে। আমেরিকায় বর্তমানে করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের কেন্দ্র নিউইয়র্ক শহর। তবে নিউ অরলিন্স, শিকাগো ও ডেট্রয়েটে দ্রুত এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে বলে সেসব অঞ্চলের মেয়ররা জানিয়েছেন।

চীনের ভিসা বা চীনে থাকার অনুমতি থাকলেও বিদেশ থেকে আসার ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে চীন। চীনে এখন পর্যন্ত ৩ হাজার ২৯২ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং দেশে মোট ৮১ হাজার ৩৪০ জনের মধ্যে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। চীনে গত কিছুদিন নতুন করে করোনাভাইরাস আক্রান্তদের অধিকাংশই বিদেশ থেকে এসেছেন।

জন্স হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী সারাবিশ্বে ৫ লাখ ৪০ হাজারের বেশি মানুষের মধ্যে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে এবং ২৪ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছেন। প্রায় ১ লাখ ২৪ হাজার মানুষ সুস্থও হয়েছেন।

আমেরিকায় লক্ষাধিক করোনায় আক্রান্ত, বিশ্ব রেকর্ড

Md Enamul

One thought on “ইতালিতে একদিনে মৃত্যু ৯শ, বিশ্ব পরিস্থিতি ভয়াবহ!

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading