করোনা ছড়াচ্ছে ‘তাবলিগ’!
উত্তরদক্ষিণ অনলাইন। ৩১ মার্চ ২০২০ । ১৪:২০
হানজালা শিহাব: ইন্ডিয়া, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়াসহ বিশ্বের কয়েকটি দেশে তাবলিগ জামাতের মুসল্লিদের মাধ্যমে করোনাভাইরাস দ্রুত ছড়ানোর তথ্য মিলেছে। এরই মধ্যে একজন ইমামসহ তাবলিগ জামাতের ৭ জন মুসল্লি করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ইন্ডিয়ায়। অপরদিকে, পাকিস্তানে তাবলিগের অন্তত ৩৬ সদস্য ও ইন্দোনেশিয়ায় ১০ জন করোনায় আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে করোনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে ইন্ডিয়া, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়াসহ আরও বেশ ক’টি দেশে। এরই মধ্যে পাকিস্তানে তাবলিগ জামাত সাধারণ মানুষের কাছে আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি ও পাকিস্তানের ডন খবর দিয়েছে। ইন্ডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে এনডিটিভি ও আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে।
এদিকে, বাংলাদেশেও তাবলিগ জামাতের মাধ্যমে করোনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে সরকারের ধর্ম মন্ত্রণালয় দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেবে বলে আশা করছেন সাধারণ মুসল্লিসহ দেশের সচেতন মহল।

এনডিটিভি’র খবরে বলা হয়েছে, ইন্ডিয়ার রাজধানী দিল্লির একটি মসজিদে তাবলিগের এক জমায়েতে যোগ দিয়ে তেলেঙ্গানায় ফেরার পর পরীক্ষায় করোনাভাইরাস ধরা পড়া ৬ ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। চলতি মাসের মাঝামাঝি সময় দিল্লির নিজামুদ্দিনের ওই মসজিদের জমায়েতে দুই হাজারেরও বেশি লোক যোগ দিয়েছিল। তাদের মধ্যে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সৌদ আরব ও কিরগিজস্তান থেকে আসা প্রতিনিধিরাও ছিলেন বলে এনডিটিভি জানিয়েছে।
খবরে বলা হয়, ওই জমায়েতে যোগ দেওয়া কাশ্মীরের এক ইমামও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গত সপ্তাহে শ্রীনগরের একটি হাসপাতালে মারা গেছেন। তেলেঙ্গানায় যে ৬ জন মারা গেছেন তাদের মধ্যে চারজনের মৃত্যু হয়েছে নিজামাবাদ ও গাডওয়ালে। এদের মধ্যে দু’জন মারা গেছেন গান্ধী হাসপাতালে, একজন অ্যাপোলো হাসপাতালে ও আরেকজন গ্লোবাল হাসপাতালে। যারা এদের সংস্পর্শে এসেছিলেন স্পেশাল টিম তাদের শনাক্ত করে হাসপাতালে পাঠিয়েছে বলে তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী কে চন্দ্রশেখর রাওয়ের দপ্তর থেকে পাঠানো একটি নোটে বলা হয়েছে। পরীক্ষার পর তাদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বলে ওই নোটে বলা হয়েছে।
দিল্লির ওই জমায়েত শেষে সেখান থেকে তেলেঙ্গানায় যাওয়া অন্তত ১০ ইন্দোনেশীয়রও করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। ওই জমায়েত শেষ হওয়ার পর এবং ২৪ মার্চ ইন্ডিয়াজুড়ে লকডাউন শুরু হওয়ার পরও তাবলিগ জামাতের ওই ‘মার্কায’ মসজিদে প্রায় ১৪০০ লোক অবস্থান করছে। ইন্ডিয়ান পুলিশ জানিয়েছে, ভবনটি খালি করে দেওয়ার জন্য ২৪ মার্চ থেকে তারা উদ্যোক্তাদের বোঝানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু সেখানে অংশগ্রহণকারীদের অনেকেই লকডাউনের কারণে আটকা পড়ে আছে বলে জানিয়েছেন তারা।
পুলিশ জানায়, সেখান থেকে ৩০০ জনেরও বেশি লোককে করোনাভাইরাস পরীক্ষার জন্য দিল্লির বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে এবং তাদের আইসোলেশনে রাখা হয়েছে। ওই মসজিদ কমপ্লেক্সের ৬ তলা একটি ডরমেট্রিতে প্রায় ২৮০ জন বিদেশিও আছেন। সেখানে অংশগ্রণকারীদের অনেকে ২০ থেকে ৩০টি বাসে করে ইন্ডিয়ার বিভিন্ন রাজ্যে নিজ নিজ এলাকায় ফিরে গেছেন এবং তাদের নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
ওই জমায়েতে যোগ দিয়ে ফেরা আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের ৯জন ব্যক্তি ও তাদের একজনের স্ত্রীর দেহে করোনাভাইরাস ধরা পড়েছে বলে দেশটির পুলিশ জানতে পেরেছে।দক্ষিণ দিল্লির একটি এলাকার অনেকের মধ্যে করোনাভাইেরাস সংক্রমণের লক্ষণ প্রকাশ পাচ্ছে, এমন খবরের পর গত রবিবার রাতে দিল্লি পুলিশ, সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্সের (সিআরপিএফ) কর্মকর্তারা ও কয়েকটি মেডিকেল টিম ওই এলাকায় যায়। সেখানে কয়েকজন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন এমন আশঙ্কায় পুরো এলাকাটি সিল করে দেওয়া হয়েছে।
দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল তাবলিগ জামাতের যে ইমামরা ওই জমায়েতের আয়োজন করেছিলেন তাদের বিরুদ্ধে মামলার নির্দেশ দিয়েছেন। নিজামুদ্দিন ওয়েস্ট ও নিজামুদ্দিন বস্তি এলাকায় প্রায় ৩০ হাজার লোক বসবাস করে, জানিয়েছে বার্তা সংস্থা পিটিআই। ওই এলাকার পরিস্থিতি নাজুক হয়ে উঠতে পারে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দেওয়া প্রতিবেদনে জানিয়েছে পুলিশ। এদিকে, মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) দুপুর পর্যন্ত পাওয়া খবরে ইন্ডিয়ায় নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ১২৫১ জন। এর মধ্যে মৃতের সংখ্যা ৩২ জন বলে সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে এনডিটিভি।
পাকিস্তানে বিরোধিতার মুখে পড়েছে তাবলিগ: বিবিসির ৩০ মার্চের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের শহর থাত্তার করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে দু’দিন আগে একটি টেলিফোন আসে যে, গ্রামে তাবলীগ জামাতের একটি দল এসেছিল এবং এতে গ্রামবাসীরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। ওই তথ্যের ভিত্তিতে কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ সেখানে যায় এবং ১০ জন ব্যক্তিকে নিয়ে এসে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করে।
ওই অভিযোগ করেছিলেন স্থানীয় বাজোরা ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হাসান সোমরো। বিবিসির তিনি বলেন, করোনাভাইরাসের ছড়িয়ে পড়ার কারণে মানুষজন আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। যখন মিডিয়ার মাধ্যমে মানুষ জানতে পারে যে, রাইউইন্দে ধর্মীয় সমাবেশে অংশ নেয়া অনেকের মধ্যে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ছে, তখন সেই উদ্বেগ অনেকটাই বেড়ে যায়। এসব উদ্বেগের বিষয়ই তিনি কন্ট্রোল রুমকে জানিয়েছিলেন।
স্থানীয় সিভিল হাসপাতালের একজন কর্মকর্তার দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই ধর্মীয় গোষ্ঠীর সদস্যরা বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা ২০ জনকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন, যাদের মধ্যে অন্তত দু’জনের ক্ষেত্রে করোনাভাইরাসের লক্ষণ দৃশ্যমান ছিল। তাদেরকে ওয়ার্ডে স্থানান্তরিত করা হয়। তবে অন্যদের মধ্যে ভাইরাসের লক্ষণ দেখা যায়নি।
তাবলীগ জামাতের সদস্যদের নিয়ে এই ভীতি শুরু হয় রাইউইন্দে তাদের বাৎসরিক ইজতেমার পর থেকে। সিন্ধুর স্বাস্থ্য বিভাগ এটা নিশ্চিত করেছে যে ইজতেমা থেকে ফেরা চার জনের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত করা হয়। রাইউইন্দে মার্চ মাসের ১০ থেকে ১২ তারিখে তাবলীগ জামাত যে আন্তর্জাতিক ইজতেমার আয়োজন করেছিল, তাতে স্থানীয় মানুষের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি মিলিয়ে কয়েক হাজার মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। এরপরেই পাকিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় এমন ভীতি ছড়িয়ে পড়ে যে ওই ইস্তেমায় অংশ নেয়া অন্যদের মধ্যেও করোনাভাইরাস ছড়িয়ে থাকতে পারে। ফলে তারা এলাকার মসজিদে এলে কিংবা ধর্মপ্রচার করতে এলে তাদের মাধ্যমে ভাইরাসের বিস্তার ঘটতে পারে। এখন থাত্তাই সিন্ধুর একমাত্র জেলা নয়, যেখানে তাবলিগ জামাতের মানুষজন বিরোধিতা আর প্রতিরোধের মুখোমুখি হচ্ছেন। লারকানা জেলার সাইহার জেলার একটি মসজিদে তাবলিগ জামাতের সদস্যরা যাওয়ার পর স্থানীয় মানুষের বিরোধিতার মুখে পড়েন। শেষ পর্যন্ত ডোকরি তহসিল এলাকার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের এসে তাদের পরীক্ষা করে দেখতে হয়। তবে ডোকরি হাসপাতালের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আজিম শাহ বলছেন, তাদের কারো মধ্যেই করোনাভাইরাসের কোন লক্ষণ দেখা যায়নি। তা সত্ত্বেও তাবলিগ জামাতের সদস্যদের নিয়ে ভীতি কাটেনি।
ফেসবুক এবং টুইটারের মতো সোশ্যাল মিডিয়ায়ও অনেক মসজিদ ও বিভিন্ন এলাকায় থাকা তাবলিগ জামাত সদস্যদের চিহ্নিত করা হচ্ছে। অনেকে তাদের ছবি ও ভিডিও পোস্ট করে তাদের নিষিদ্ধ করার জন্য দাবি তুলেছেন।
পাকিস্তান পিপলস পার্টির সিনেটর সাস্সি পালেজু বিবিসিকে বলেছেন, তিনি মনে করেন তাবলিগ জামাতের লোকজনের উচিত তাদের বাড়িতে থাকা। তিনি বলেন, লকডাউন ও কড়াকড়ি সত্ত্বেও রাইউইন্দ থেকে তাদের সদস্যরা বেশ কয়েকটি জেলায় কাজ করছেন। রাইউইন্দের ইজতেমায় যারা অংশ নিয়েছিলেন, তাদের সবাইকে পরীক্ষা করে দেখা হয়নি। ফলে তাদের যে কারো মধ্যে করোনাভাইরাস থাকতে পারে। আমার থাত্তা জেলায় তাদের যে সদস্যরা এসেছেন, তাদের মধ্যে আফ্রিকান নাগরিক যেমন আছে, তেমনি খাইবার পাখতুনখাওয়া এবং পাঞ্জাবের লোকজনও আছে। তাদের উচিত এটা বুঝতে পারা যে, এখন এভাবে ধর্মপ্রচারের সময় নয়। তাবলিগ জামাতের সদস্যদের উচিত তাদের নিজেদের এলাকায় এবং বাড়িতে থাকা।
এদিকে ডনের খবরে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের হায়দারাবাদে তাবলিগ জামাতের ৩৬ সদস্যের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে।

