বাড়িভাড়া মওকুফের দাবি ও বাস্তবতা

বাড়িভাড়া মওকুফের দাবি ও বাস্তবতা

উত্তরদক্ষিণ অনলাইন। ৩১ মার্চ ২০২০ । ১৬:০০

হিল্লোল বাউলিয়া: নভেল করোনাভাইরাসের কারণে দেশে অঘোষিত ‘লকডাইন’ চলছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর পরই ২৬ মার্চ দেশ কার্যত লকডাউন হয়ে যায়। প্রথম দিকে (শনিবার, ২৮ মার্চ পর্যন্ত) পুলিশ প্রশাসনের কড়াকড়িতে রাজধানীসহ সারাদেশের বন্দর, হাট-বাজার বা সড়কে মানুষের খুব একটা দেখা মেলেনি। অবশ্য পুলিশসহ স্থানীয় প্রশাসনের কিছু বাড়াবাড়ির বিষয়ে সোশ্যাল মিডিয়া ও গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর নমনীয় হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ফলে ২৯ মার্চ থেকে রাজধানীর সড়ক ও বাজারে কমবেশি মানুষের আনাগোনা দেখা যাচ্ছে। তার মধ্যে কেউ কেউ যে খুব প্রয়োজন ছাড়াই বের হয়েছেন- তা দেখলেই বোঝা যাচ্ছে। করোনাভাইরাসের ভয়াবহতা সম্পর্কে তারা হয়তো সচেতন নন। কিংবা বিষয়টি পাত্তা দিচ্ছেন না। তবে রাস্তায় দেখা যাওয়া মানুষের উল্লেখযোগ্য অংশ রিকশাচালক বা শ্রমিক শ্রেণির। তাদের দেখলে সহজেই বোঝা যায়, তাদের খাবার খোঁজার তাগাদা রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা রয়েছে, যাতে কেউ খাবারের জন্য কষ্ট না পান; তা নিশ্চিত করতে সরকারি কর্মকর্তা ও দলীয় নেতাকর্মীদের কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার। পাশাপাশি বিত্তবানদের প্রতি প্রধানমন্ত্রী আহ্বান, তারা যেন জাতির এই দুর্যোগকালে অসহায় মানুষের কল্যাণে ও সাহায্যার্থে এগিয়ে আসেন। দেশবাসীর সঙ্গে আমরাও আশা করছি, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা, আহ্বান ও সরকারের পাশাপাশি বিত্তবানদের সার্বিক সহযোগিতায় অসহায় মানুষগুলো দুর্যোগকালীন সময়ে খাবারের জন্য কষ্ট পাবেন না। সেই সঙ্গে যারা পেটের তাগিদে রাস্তায় নামছেন, তাদের আর রাস্তায় নামতে হবে না। দেশে করোনা মহামারির ঝুঁকি দ্রুতই কমে আসবে- সেটাও প্রত্যাশা সবার।

এ মুহূর্তে আরও একটি দাবি উত্থাপিত হচ্ছে, ‘বাড়িভাড়া মওকুফ করা হোক’। বিশেষ করে রাজধানীর নিম্নবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো যারা ঢাকায় ভাড়া থাকেন, তাদের কেউ কেউ এরই মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন দাবি তুলছেন। মোবাইল ফোনে ব্যক্তিগত যোগাযোগের সময়ও অনেকে এমনটাই বলছেন। তাদের কথা হচ্ছে, অন্তত ‘লকডাউন’ বা সাধারণ ছুটি চলাকালীন সময় যেন বাড়িভাড়া মওকুফ করা হয়। কেউ আবার কমপক্ষে ৩ মাসের বাড়িভাড়া/বাসাভাড়া মওকুফের দাবি তুলছেন।

বুধবার থেকে নতুন মাস- এপ্রিল শুরু হচ্ছে। ইংরেজি নতুন মাস মানেই নগরবাসীর জন্য নতুন খরচের তালিকা। এ মুহূর্তে গ্যাস আর বিদ্যুতের বিল পরিশোধের টেনশন না থাকলেও বাড়িভাড়া মেটানোর চিন্তায় হাজার হাজার ভাড়াটিয়া চিন্তিত। তাদের বিষয়টি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিবেচনা করবেন, সেই প্রত্যাশা সবার

দেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ার পর সরকার যখন সাধারণ ছুটির সিদ্ধান্ত জানায়, সেই সময় থেকে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন নগরীতে মুষ্টিমেয় বাড়িওয়ালা মানবিক দৃষ্টি ভঙ্গি পোষণ করে ভাড়াটিয়াদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তারা ২/৩ মাসের বাড়িভাড়া মওকুফ করার পাশাপাশি খাদ্য উপকরণও দিয়েছেন ভাড়াটিয়া পরিবারগুলোকে। এমন তথ্য সোশ্যাল মিডিয়ায় বিশেষ করে ফেসবুকে তারা নিজেরাই শেয়ার করেছেন, যাতে তাদের দেখে অন্যরাও মানবিক দৃষ্টি ভঙ্গি নিয়ে এগিয়ে আসেন। কিন্তু সেই এগিয়ে আসার সংখ্যা হাতে গোনা। খুব একটা উল্লেখ করার মতো নয়।

সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন, বাড়িভাড়া মওকুফ করলে সিটি করপোরেশন বাড়িওয়ালাদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে পানি বিল মওকুফ করবেন। সিলেটের বাড়িওয়ালাদের প্রতি মেয়রের মানবিক আহ্বান হচ্ছে, আপনারা বাড়িভাড়া মওকুফ করে দিন। সিটি করপোরেশন পানি বিল মওকুফ করে দেবে। যদি এ আহ্বানে সারা না দিয়ে পুরো বাড়িভাড়া আদায় করা হয়, তবে ভাড়াটিয়াদের প্রতি মেয়র আরিফুল হকের আহ্বান, সেই তালিকা ও তথ্য প্রমাণ জানান। সিটি করপোরেশন বাড়িওয়ালাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। মেয়র আরিফ এক্ষেত্রে কতটা সফল হবেন সেটা নিয়ে এ মুহূর্তে কথা না বলাই শ্রেয়।

বাড়িভাড়া নেয়া যাবে না, এটি বন্ধ করতে হবে- এমন নির্দেশ হয়তো সরকারের পক্ষেও এভাবে দেয়া সম্ভব নয়। তবে সরকার মানবিক দৃষ্টি কোণ ও বাস্তবার নিরিখে একটি সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এক্ষেত্রে ক্ষুদ্র কিছু পরামর্শ রাখছি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সদয় বিবেচনার জন্য-

১. ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ সারাদেশের সিটি ও পৌরসভার মেয়ররা একবছরের জন্য বাড়িওয়ালাদের জন্য পানি বিল/হোল্ডিং ট্যাক্স মওকুফ করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। আর বাড়িওয়ালাদের জন্য নির্দেশনা দিতে পারেন অন্তত ৩ মাস/করোনা দুর্যোগকালীন বাড়িভাড়া না নেয়ার জন্য। অথবা
২. সরকার নির্বাহী আদেশে গ্যাস/পানি/বিদ্যুৎ বিল দুর্যোগকালীন মওকুফ করতে পারেন। পাশাপাশি বাড়িভাড়া না নিতে বাড়িওয়ালাদের নির্দেশ দিতে পারেন।
৩. বাড়িওয়ালাদের মধ্যে যারা ১ লাখ টাকার নিচে আয়কর দেন তাদেরকে এক বছরের আয়কর মওকুফ করতে পারে সরকার। বিনিময়ে বাড়িভাড়া মওকুফের নির্দেশনা দেয়া যেতে পারে। অথবা
৪. সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে অন্যকোনোভাবে ভাড়াটিয়াদের পাশে দাঁড়াতে পারেন করোনা নামক দুর্যোাগকালীন সময়ের জন্য। বিশষ করে নিম্নবিত্ত/নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এ মুহূর্তে বাড়িভাড়াসহ সংশ্লিষ্ট বিল পরিশোধের বিষয়টি নিয়ে খুবই দুশ্চিন্তায় ভুগছেন। সরকারের পক্ষ থেকে যদিও গ্যাস বিল ও বিদ্যুৎ বিল দু’মাস বিলম্বে পরিশোধের সুযোগ দেয়া হয়েছে। কিন্তু এটিই তাদের জন্য যথেষ্ট নয়। কারণ, অনেকের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। ২/৩ মাস পর আয়ের পথ খুলবে কিনা তা এ মুহূর্তে কারো পক্ষেই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। আর খুললেও মাঝখানের কেটে যাওয়া মাসগুলোর ঘাটতি তাদের পুষিয়ে নেয়ার কোনও পথ নেই। বিষয়টি সহজে বোঝার জন্য বলছি-

কোর্ট বন্ধ থাকায় একজন অ্যাডভোকেট বেকার হয়ে পড়েছেন। আইনজীবীদের একটি বড় অংশ যারা কোর্টের প্রতিদিনের আয় দিয়ে চলেন। তাদের উল্লেখযোগ্য কোনো সম্পদ গচ্ছিত নেই। তাছাড়া আইনজীবীদের সঙ্গে যারা সহকারী (মুহুরী) থাকেন তাদের অবস্থা তো আরও খারাপ। একইভাবে দলিল লেখক, তৈরি পোষাকের দোকানী ও তার কর্মচারী, বাস/ট্রাকের বা পরিবহনের চালক ও শ্রমিক, এমনকি সাংবাদিকদের মধ্যেও অনেকে করোনাভাইরাস বা কভিড-১৯ নামক দুর্যোগের কারণে বেকার হয়ে পড়েছেন। যারা চাকরি হারাননি তাদের অনেকেরও বেতন-ভাতার পরিমাণ কমিয়ে দেয়া হচ্ছে। এভাবে দেশের অসংখ্য মানুষ তারা বেকার হয়ে পড়েছেন। তাদের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে গেছে, সংকোচিত হয়ে পড়েছে। তাদের মধ্যে যারা ভাড়াটিয়া তাদের জীবন এখন দুর্বিসহ হয়ে পড়ছে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading