ইন্ডিয়া-নেপালের কালাপানি বিরোধ চীনের উস্কানিতে?
উত্তরদক্ষিণ । মঙ্গলবার ১৬ জুন ২০২০ । ১০:২০
কালাপানি সীমান্ত নিয়ে ইন্ডিয়া ও নেপালের মধ্যে উত্তেজনা চরমে। এরই মধ্যে ইন্ডিয়ার বিতর্কিত ভূখণ্ড অন্তর্ভূক্ত করে সংসদে বিল পাস করেছে নেপাল। ফলে পরিস্থিতি বেশ জটিল হয়ে উঠেছে। কোনোভাবেই ইন্ডিয়াকে ছাড় না দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে নেপাল। ধারণা করা হচ্ছে ইন্ডিয়ার বিরুদ্ধে নেপালকে উস্কে দিচ্ছে চীন। বিশ্লেষকরাও এ ধরণা সম্পূর্ণরূপে উড়িয়ে দিচ্ছেন না।
ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইন্ডিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী গত ৮ মে যখন ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে চীনের তিব্বত সীমান্তের লিপুলেখের সাথে সংযুক্তকারী ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি রাস্তা উদ্বোধন করেন। তখন তিনি হয়ত ধারণাও করেননি যে, এ নিয়ে প্রতিবেশী নেপালের সাথে এত বড় সংকট তৈরি হবে। রাস্তাটি উদ্বোধনের সাথে সাথে নেপাল প্রতিবাদ জানায়। নেপাল দাবি করে- যে এলাকার মধ্য দিয়ে এই রাস্তা নেওয়া হয়েছে তার অনেকটাই তাদের। কোনো কথাবার্তা ছাড়াই ওই জায়গার ভেতর দিয়ে ইন্ডিয়ার ওই রাস্তা তৈরি তারা কখনই মানবে না।
নেপাল সাথে সাথে ওই অঞ্চলের কাছে তাদের পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করে। কাঠমান্ডুতে ভারতীয় দূতকে ডেকে প্রতিবাদ জানায়। তারপর ইন্ডিয়ার কাছ থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে, গত শনিবার নেপালের সংসদের নিম্ন-কক্ষ দেশের নতুন একটি মানচিত্র অনুমোদন করেছে, যেখানে কালাপানি নামে পরিচিত প্রায় ৪শ বর্গকিলোমিটারের ওই পাহাড়ি এলাকাটিকে তাদের এলাকা বলে দেখানো হয়েছে।
ভোটাভুটিতে নেপালের একজন এমপিও নতুন মানচিত্রের বিপক্ষে ভোট দেননি। এমনকি বরাবর ইন্ডিয়াপন্থী হিসেবে পরিচিত নেপালি কংগ্রেসের এমপিরাও নতুন মানচিত্রের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। আর সংসদের বাইরে নেপালে সাধারণ মানুষের মধ্যেও ইন্ডিয়া বিরোধিতার যে চিত্র এখন দেখা যাচ্ছে তা বিরল।
(হ্যাসট্যাগ) #’ব্যাকঅফইন্ডিয়া’ নেপালের সোশাল মিডিয়াতে তোলপাড় তুলেছে। বিবিসি লিখেছে, এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে নেপালের কম্যুনিস্ট প্রধানমন্ত্রী কে পি অলির জনপ্রিয়তা এখন তুঙ্গে।
বিস্মিত ইন্ডিয়ার অঙ্গুলি চীনের দিকে
ঐতিহাসিকভাবে অনুগত ক্ষুদ্র এই প্রতিবেশীর এসব প্রতিক্রিয়ায় ইন্ডিয়ায় একাধারে বিস্ময় এবং উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইন্ডিয়ায় অনেকের কাছে প্রশ্ন হচ্ছে- ‘এত বড় পদক্ষেপ কেন এখন নেপাল নিচ্ছে? সড়কটি তো রাতারাতি তৈরি হয়নি। নেপাল তো অনেকদিন ধরেই দেখছে যে, ইন্ডিয়া সড়কটি তৈরি করছে।’
ইন্ডিয়ার সেনাপ্রধান এমএম নারাভানে সরাসরি বলেছেন যে, তৃতীয় একটি দেশ হয়তো নেপালকে উস্কে দিয়েছে। চীনের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন তিনি। ইন্ডিয়ার অনেক পর্যবেক্ষকও একইরকম সন্দেহ করছেন।
দিল্লিতে বিবিসি বাংলার শুভজ্যোতি ঘোষ বলেছেন, ইন্ডিয়া সরকার মুখে বলছে না- ঠিকই, কিন্তু নেপালের সাথে এই সঙ্কটের পেছনে নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি ‘চীনের ইন্ধন’ নিয়েও তারা গভীরভাবে সন্দিহান।
চীন কি আসলেই বিরোধে উস্কানি দিচ্ছে?
নেপালকে কি কেউ উস্কাচ্ছে? যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা সংস্থা ব্রুকিংস ইন্সটিটিউশনের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক গবেষক কনস্টানটিনো হাভিয়ের সে সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দিচ্ছেন না। প্রতিষ্ঠানের সর্ব-সাম্প্রতিক একটি প্রকাশনায় এক নিবন্ধে তিনি লিখেছেন, “যদিও নেপাল দাবি করে যে, তারা ৯০-এর দশক থেকে বিতর্কিত এলাকাটির সমাধান নিয়ে ইন্ডিয়ার সাথে কথা বলতে চাইছে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে, চীন- কাঠমান্ডুকে বিষয়টি নিয়ে তাদের অবস্থান শক্ত করতে পরোক্ষভাবে হলেও উৎসাহিত করছে না। কিন্তু তারপরও প্রধানমন্ত্রী অলিকে এখনই চীনপন্থী বলে আখ্যা দেওয়া সঙ্গত হবে না। চীন আদৌ পেছন থেকে কোনো কলকাঠি নাড়ছে কিনা তার কোনো প্রমাণ এখনও নেই।”
তিনি বলেন, চীন এখনও পর্যন্ত তাদের তিব্বত সীমান্তে ‘কালাপানি-লিপুলেখ-লিঙ্গুয়াধারা‘ অঞ্চল নিয়ে নেপাল-ইন্ডিয়া বিরোধ নিয়ে কোনো কথা বলেনি।
ইন্ডিয়ার সাবেক কূটনীতিক দেব মুখার্জি, যিনি ২০০০ সাল থেকে দুই বছর কাঠমান্ডুতে ইন্ডিয়ার রাষ্ট্রদূত ছিলেন, তিনি এখনই এই বিরোধে চীনের সম্ভাব্য ইন্ধনের প্রসঙ্গ তুলতে রাজি নন। দেব মুখার্জি বলেন, এটা ঠিক যে, হঠাৎ করে মানচিত্র বদলে ফেলার মতো এত বড় পদক্ষেপ কেন নেপাল নিলো- তা বোঝা মুশকিল। কিন্তু ইন্ডিয়ায় অনেকেই যে এটাকে চীনের উস্কানি হিসেবে দেখছেন- আমি তার সাথে একমত নই।’ একইসঙ্গে সাবেক কূটনীতিক দেব মুখার্জি বলেছেন, ‘ব্যাপারটির সমাধান এখন সত্যিই কঠিন হয়ে পড়েছে।’

