অবশেষে কোয়ারেন্টিন থেকে ‘মুক্তি’ পেলেন ডা. ফেরদৌস খন্দকার
শেখফারুক । উত্তরদক্ষিণ । রবিবার ২১ জুন ২০২০ । ১১:০৬
অনেক ‘নাটক’ আর ‘জল ঘোলা’ করার পর অবশেষে কোয়ারেন্টিন থেকে ‘মুক্তি’ পেলেন বহুল অলোচিত ডা. ফেরদৌস খন্দকার। ১৪ দিনের কোয়ারেন্টিন শেষে আজ রবিবার (২১ জুন) সকালে তিনি ‘মুক্ত’ হন।
নিউ ইয়র্কের মাউন্ট সিনাই হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. ফেরদৌস খন্দকার করোনা কালে ‘সেবা দানে’র উদ্দেশ্যে দেশে আসেন ৭ জুন। ওইদিন বিকালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাকে ‘কোয়ারেন্টিনে’ নিয়ে যান।
ডা. ফেরদৌস করোনা আক্রান্ত হয়েছিলেন। পরে তিনি সুস্থ হন। আমেরিকার ‘অ্যান্টিবডির সনদ’ থাকার পরও, ১৪ দিনের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে পাঠানো হয় ওই প্রবাসী চিকিৎসককে।
এই নিয়ে সারা দেশে আলোচনার ঝড় ওঠে। প্রবাসীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। পত্র-পত্রিকা, টিভি চ্যানেল, অনলাইন নিউজ পোর্টালে ও সোশ্যাল মিডিয়ায় তার পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা ও সমালোচনা চলতে থাকে। নানা গুজবও ডালপালা মেলতে থাকে।
দেশে ফেরার পরে ডা. ফেরদৌসকে নিয়ে শুরু হয় নানা রকমের আলোচনা আর সমালোচনা । রাজনৈতিক জল্পনা-কল্পনা যুক্ত হয়ে পরে। বেশ কিছু গুরুতর অভিযোগ ওঠে। এমনকি বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী খন্দকার মোশতাক ও কর্নেল রশিদের আত্মীয় হিসেবে ডা. ফেরদৌসের নাম জড়িয়ে পড়ে। তার বিরুদ্ধে বিএনপি নেতা তারেক রহমানের অর্থ-জোগানদাতা হিসেবে কথা ওঠে।
সব অভিযোগ অস্বীকার করে ডা. ফেরদৌস এইগুলো প্রমাণের জন্য চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন। অদ্যাবধি তার বিরুদ্ধে ওঠা একটা অভিযোগ প্রমাণের জন্য কেউ উদ্যোগ নেয়নি। এমনকি যারা অভিযোগ করেছিলেন তারাও পরে চুপ হয়ে যান।

কোয়ারেন্টিন মুক্ত হয়ে ডা. ফেরদৌস তার ফেসবুক পেজে একটা পোস্ট দিয়েছেন। সেখানে লিখেছেন, ‘অবশেষে কোয়ারেন্টিন মুক্ত হলাম আমি। কেটে গেল ১৪টি দিন। সময়তো কাটবেই। থেকে যাবে কেবল স্মৃতি। এই মুহূর্তে কোনও অভিযোগ নয়, কেবল ধন্যবাদই দিতে চাই সবাইকে।’ তিনি আবারও বলেছেন, ‘রাজনৈতিক কোনও অভিলাষ আমার ছিল না, নেই-ও’।
তার পোস্টের পুরোটুকু এখানে উদ্ধৃত করা হলঃ
“কোয়ারেন্টাইন মুক্ত হলাম আমি
অবশেষে কোয়ারেন্টাইন মুক্ত হলাম আমি। কেটে গেলো ১৪টি দিন। সময়তো কাটবেই। থেকে যাবে কেবল স্মৃতি। এই মুহূর্তে কোন অভিযোগ নয়, কেবল ধন্যবাদই দিতে চাই সবাইকে। যারা গত ১৪টি দিন আমার সাথে ছিলেন। বিভিন্নভাবে সহায়তা দিয়েছেন, মানসিকভাবে শক্ত থাকতে প্রেরণা জুগিয়েছেন। তবে একথা আমাকে বলতেই হবে যে, শুরুটা বেশ কঠিনই ছিল আমার জন্যে। আমার বিরুদ্ধে “অহেতুক” এবং “মিথ্যা অভিযোগে” বিরাট ঝড় উঠেছিল। সব ভুল প্রমাণিত হয়েছে। ঝড়ও হয়তো থেমে গেছে।
যা বলছিলাম, দেশে আসার পর আমাকে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে দেয়া হয়েছে; এই বিষয়টি আমি প্রথম পাঁচদিন মানতেই পারছিলাম না। কেননা আমার এন্টিবডির সনদ ছিল। তখন মানসিকভাবে রীতিমতো বিদ্ধস্ত হয়ে পড়েছিলাম। পরিবার, সহকর্মী, বন্ধু, সুধীজন, সহযোদ্ধারা, সাংবাদিক এবং দেশের মানুষের সহায়তা ও সমর্থণ আমাকে সাহস জুগিয়েছে।
দেশে এসেছিলাম কয়েক সপ্তাহ দেশবাসীর জন্যে কাজ করবো বলে। সাথে ছোট্ট একটি স্বাস্থ্য কেন্দ্র গড়ে তুলে যাবো, এমন আশা ছিল। সেই লক্ষ্যেই দুই থেকে তিন সপ্তাহের জন্যে এসেছিলাম। যদিও সময় কিছুটা ক্ষেপন হয়ে গেছে। এরপরও আমি মনে করি, কোন আক্ষেপ নেই আমার। দ্রুততম সময়ের মধ্যে কিছুটা কাজ করে যাবো। তবে সাথে নিয়ে যাবো গত দুটি সপ্তাহে ঘটে যাওয়া অনেক কিছু ও অভিজ্ঞতা। বিশেষ করে যেসব সৈনিক ভাইয়েরা আমার সাথে ছিলেন, তারা অনেক ভালোবাসা দিয়েছেন। অনেক সহযোগিতা করেছেন। আপনাদের মমতা কোনদিন ভুলবার নয়। সেই সাথে কুয়েত প্রবাসী কিছু ভাই শেষের দিকে কোয়ারেন্টাইনে যোগ দিয়েছিলেন। তাদের ভালোবাসায় ভরা স্মৃতিগুলোও বাকি জীবন আমার সাথে থাকবে। কখনো যদি দেখা হয়, নিশ্চয়ই ভালো লাগবে; বুকে জড়িয়ে ধরবো আপনাদের। দেখা না হলেও, আপনাদেরকে আমার সবসময় মনে থাকবে।
দেখুন আমি অতি সাধারণ একজন চিকিৎসক। তবে দেশকে, দেশের মানুষকে খুব ভালোবাসি। এসেছিলাম, দূর্যোগের এই সময়টায় কেবলই দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য। কোন রাজনৈতিক অভিলাষ বা ইচ্ছা আমার ছিল না; নেইও। ফলে যারা তেমনটি ভেবেছিলেন, আশা করছি আপনাদের ভুলটা ভেঙেছে। বাংলাদেশের চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী ও সম্মুখসারির যোদ্ধারা করোনার এই সময়টায় রীতিমতো জীবন বাজি রেখে লড়াই করছেন। তাদের আত্মত্যাগ, এই জাতি সবসময়ই মনে রাখবে। সামনের দিনগুলোতেও তারা এমনিভাবে লড়ে যাবেন বলে আমার বিশ্বাস।
আমি এই মুহূর্তে স্বাস্থ্য বিষয়ক ছোট্ট একটি সেটআপ শুরু করবো। কারো বিরুদ্ধে আমার কোন অভিযোগ নেই। মায়ের বিরুদ্ধে সন্তানের কোন অভিযোগ থাকে না। আমারো নেই। আবারো দেখা হবে। ভালোবাসা বাংলাদেশ। সবাই ভালো থাকুন। নিরাপদে থাকুন। আপনাদের মঙ্গল হোক”।

