পাপুলের স্ত্রী-শ্যালিকাকে দুদকে জিজ্ঞাসাবাদ, স্ত্রী বলছেন ‘সব ষড়যন্ত্র’

পাপুলের স্ত্রী-শ্যালিকাকে দুদকে জিজ্ঞাসাবাদ, স্ত্রী বলছেন ‘সব ষড়যন্ত্র’

উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ২২ জুলাই ২০২০ । আপডেট ১৬:৪৩

অর্থ ও মানবপাচারে জড়িত থাকার অভিযোগে কুয়েতে কারাবন্দী লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য কাজী শহীদুল ইসলাম পাপুলের দুর্নীতি তদন্তে স্ত্রী সেলিনা ইসলাম এমপি ও শ্যালিকাকে দুদকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। পরে সংসরক্ষিত আসনের এমপি সেলিনা গণমাধ্যমের সামনে কথা বলেন। এসময় দুর্নীতির দায় অস্বীকার করে তিনি বলেন, পাপুলের বিরুদ্ধে যা হচ্ছে ‘সবই ষড়যন্ত্র’।

বুধবার (২২ জুলাই) দুদকের তলবে সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়ে বোনকেসহ উপস্থিত হয়ে দুদক কর্মকর্তাদের প্রশ্নের মুখোমুখি হন আলোচিত এই নারী এমপি। পরে তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের প্রশ্নের জবাব দেন কার্যালয় থেকে রেড়িয়ে যাওয়ার সময়।

২৫ জুন কুয়েতে মানব ও অবৈধ মুদ্রা পাচারের অভিযোগে আটক বাংলাদেশের সাংসদ শহীদুল ইসলাম পাপুলকে ঘুষ দেওয়া, মানব ও অবৈধ মুদ্রা পাচার এবং রেসিডেন্ট পারমিট বিক্রির অভিযোগে ২১ দিন কারাগারে রাখার নির্দেশ দেন কুয়েত আদালত। এছাড়া, তার বিরুদ্ধে কুয়েতের মারাফি কুয়েতিয়া কোম্পানির অ্যাকাউন্টে পাঁচ মিলিয়ন কুয়েতি দিনার রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। যা বাংলাদেশি টাকায় ১৩৭ কোটি ৮৮ লাখ ৮৩ টাকা।

৬ জুন কুয়েত সিটির মুশরিফে তার বাসা থেকে আটকের পর, কাজী শহিদকে নিয়ে ফলাও করে খবর ছাপে দেশটির গণমাধ্যম। তাকে নিয়ে আলোচনাও হয় সেই দেশের পার্লামেন্টে। কুয়েতের রাজনীতিবিদেরা ভিসা পাচারের নামে মানব পাচারের বিষয়টি নিয়ে সোচ্চার হওয়ায় দেশটির উপ প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আনাস আল সালেহ টুইটে পাপুলকে সবচেয়ে বড় মানবপাচার চক্রের হোতা হিসেবেও উল্লেখ করা হয়।

শুধু কুয়েতে নয়, দেশেও তার বিরুদ্ধে মানবপাচার ও মানিলন্ডারিংয়ের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। রয়েছে পরিবারের নামে-বেনামে ব্যাংকের ঋণ নেয়া, সম্পদ ভোগ, নিজের ও স্ত্রীর নামে শেয়ার কিনে ব্যাংকের পরিচালক হওয়ার অভিযোগ। যার আড়ালে ২০১৬ সাল থেকে হাজার কোটি পাচারের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

এমন আলোচনার মধ্যে গত ১২ জুলাই পাপুলের স্ত্রী ও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সেলিনা ইসলাম এবং শ্যালিকা জেসমিন প্রধানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নোটিশ দেয় দুদক। দুদকের উপপরিচালক মো. সালাহউদ্দীন স্বাক্ষরিত ওই তলবি নোটিশে তাদেরকে ২২ জুলাই দুদকের প্রধান কার্যালয়ে হাজির হতে বলা হয়।

এদিন দুদকে হাজির হয়ে সেলিনা এমপি জানান, ভাবমুর্তি ক্ষুন্ন করতেই এই অভিযোগ। কুয়েতের আদালতে অভিযোগও ষড়যন্ত্রের অংশ বলে মনে করেন তিনি।

অবশ্য ইংরেজি দৈনিক আরব টাইমস জানিয়েছে, পাপুল ও তার কোম্পানির অ্যাকাউন্টে ৫ মিলিয়ন কুয়েতি দিনার রয়েছে। যার মধ্যে ৩ মিলিয়ন দিনার কোম্পানির মূলধন। যা ফ্রিজ করেছেন দেশটির আইনী সংস্থা।

গত ২৬ ফেব্রুয়ারি কমিশন পাপুলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থপাচার ও শত শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর দুদকের পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল আউয়ালকে অনুসন্ধান তদারকি কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়। পরে দুদকের উপপরিচালক মো. সালাহউদ্দীনকে কমিশন অনুসন্ধান কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেয়। অনুসন্ধানের ধারাবাহিকতায় ১৭ জুন দুদক পাপুলের স্ত্রী, মেয়ে ও শ্যালিকার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জানিয়ে সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করে পুলিশের বিশেষ শাখায় (এসবি) চিঠি দেয়। এরপর গত ২২ জুন পাপুল, স্ত্রী সেলিনা, মেয়ে ওয়াফা ইসলাম ও শ্যালিকা জেসমিনের ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক দেশি-বিদেশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে থাকা সব ব্যাংক হিসাব স্থগিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকে চিঠি দেয় দুদক।

সাধারণ শ্রমিক হিসেবে কুয়েত গিয়ে বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন পাপুল। ২০১৮ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন লক্ষ্মীপুরের আসনটিতে। ওই নির্বাচনে ওই আসনটি আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু জাতীয় পার্টির প্রার্থী শেষ মুহূর্তে ভোট থেকে সরে দাঁড়ালে বিএনপিকে ঠেকাতে স্থানীয় আওয়ামী লীগ পাপুলের পক্ষে কাজ করেছিল। পাপুল নিজে এমপি হওয়ার পর স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের কোটায় পাওয়া সংরক্ষিত একটি আসনে তার স্ত্রী সেলিনাকে এমপি করে আনেন।

বুধবার কী বিষয়ে দুদক কর্মকর্তারা তাদেরকে জিজ্ঞাসাববাদ করেছে এবং তারা কী ধরনের তথ্য দিয়েছে জিজ্ঞাসাবাদে- সে বিষয়ে দুদকের পক্ষ থেকে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কিছুই জানানো হয়নি গণমাধ্যমকে।

এমপি সেলিনা বলেন, ‘কুয়েতে পাপুলের প্রতিষ্ঠানে হাজার হাজার শ্রমিক কাজ করে। সেই প্রতিষ্ঠানে কাজ করে দেশের বহু শ্রমিক; কোটি কোটি টাকার রেমিটেন্স পাঠাচ্ছে। সেখানে একটি পক্ষের ষড়যন্ত্রের কারণে কুয়েতে তিনি সমস্যার সন্মুখীন হয়েছেন। মূলত পাপুল ষড়যন্ত্রে শিকার। আমাদের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে এসব করা হচ্ছে।’

অর্থ পাচার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা আমাদের বিষয়গুলো নিয়ে দুদকের কাছে লিখিত বক্তব্য দিয়েছে। আমাদের কোনো গোপন সম্পদ নেই, অবৈধ সম্পদও নেই। যা আছে তার বিবরণ দুদকে দিয়েছি। আমরা আইনের পক্ষে। এই তদন্তে দুদককে সব ধরণের সহযোগিতা করবো।’

এর আগে সকাল সাড়ে ১০টায় দুদক প্রধান কার্যালয়ে পাপুলের স্ত্রী সেলিনা এবং শ্যালিকা জেসমিন প্রধান জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হন। অনুসন্ধান কর্মকর্তা দুদকের উপ-পরিচালক মো. সালাহউদ্দীন দুপুর পৌনে ১২টা পর্যন্ত তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading