মেডিকেলের প্রশ্নফাঁস করে কোটিপতি, অবশেষে সিআইডির জালে ধরা!
উত্তরদক্ষিণ । বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২০ । আপডেট ২০:৪৫
মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসে জড়িত সন্দেহে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি পুলিশ বলছে, সংঘবদ্ধ এই চক্রটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রেস থেকে প্রশ্ন বের করে বিপুল অংকের অর্থের বিনিময়ে তা বিক্রি করত। এভাবে প্রশ্নফাঁস করে তারা কোটি কোটি টাকার সম্পদ করেছেন। প্রত্যেকে বাড়ি-গাড়ি ও ফ্ল্যাট বানিয়েছেন অবৈধ সেই অর্থে। এফডিআর হিসেবে জমা আছে লাখ লাখ টাকা।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) সিআইডি সদর দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে সাইবার ক্রাইম ইউনিটের জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) সুমন কুমার দাস এসব তথ্য দেন। তিনি বলেন, ২০১৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস নিয়ে তদন্ত করে সিআইডি। ওই মামলায় ৪৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়, যাদের ৪৬ জনই আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দেন।
ওই তদন্তের অংশ হিসেবে ২০১৮ সালে মেডিকেলের প্রশ্নফাঁসের এই চক্রের বিষয়ে জানতে পারেন সিআইডি কর্মকর্তারা। এরপর তাদের বিষয়ে অনুসন্ধান চলছিল। এরমধ্যে গত ১৯ জুলাই এসএম সানোয়ার হোসেন নামের একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি ২০১৩, ২০১৫ ও ২০১৭ সালে মেডিকেল ও ডেন্টাল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়ে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য দেন। ওই তিন বছর মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের মূল হোতা জসিম উদ্দিন ভূইয়া ওরফে মুন্নু (৪৫) নামের একজন বলে জানান গ্রেপ্তারকৃত সানোয়ার।
সিআইডি পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এরপর ওই দিনই মিরপুর এলাকা থেকে মুন্নুসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। অপর তিনজন হলেন- মো. পারভেজ খান (৩২), জাকির হোসেন দিপু ও মোহাইমেনুল ইসলাম বাঁধন (৪৫)।
গ্রেপ্তারের পর জসিমের কাছ থেকে ২ কোটি ২৭ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র এবং বিভিন্ন ব্যক্তির দেওয়া ২ কোটি ৩০ লাখ টাকার চেক উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া তার তিনটি গাড়ি, ঢাকায় দুটি বাড়িসহ অর্ধশত কোটি টাকার সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে বলে সিআইডির ওই কর্মকর্তা জানান। জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) সুমন কুমার দাস বলেন, বাকিদের মধ্যে পারভেজের কাছ থেকেও ৮৪ লাখ টাকার চেক পাওয়া গেছে।
সিআইডির সাইবার ক্রাইম ইউনিটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কামরুল হাসান বলেন, গ্রেপ্তারদের মধ্যে দুজনের আত্মীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চাকরি করতেন। তাদের মাধ্যমে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রেস থেকে প্রশ্নপত্রগুলো বাইরে চলে আসত এবং উচ্চমূল্যে বিক্রি করা হত। একেকজনের কাছ থেকে ১০ লাখ বা তার বেশি টাকা নিয়ে প্রশ্ন দেওয়া হত।
চেকের বিষয়ে জানতে চাইলে সিআইডির এই কর্মকর্তা বলেন, যেসব চেক পাওয়া গেছে- সেগুলো বিভিন্ন ব্যক্তি তাদের দিয়েছে। প্রশ্নপত্রের বিনিময়ে এসব চেক তাদের কাছে দেওয়া হয়েছে। এই চক্রটির মাধ্যমে শত শত শিক্ষার্থীর কাছে প্রশ্ন গেছে। চেকের সূত্র ধরে ওই সব শিক্ষার্থীকে বের করার চেষ্টা করা হবে। ২০১৫ সালের চেকও পাওয়া গেছে। সেগুলো তাদের কাছে ছিল কেন, সে বিষয়টিও দেখা হবে।
গ্রেপ্তারদের মধ্যে জসিমের বাড়ি মানিকগঞ্জের সিংগাইরে। এত সম্পদের মালিক হওয়া জসিমের পেশা কী জানতে চাইলে সিআইডি কর্মকর্তা কামরুল হাসান বলেন, “এদের কারও তেমন কোনো নির্ধারিত পেশা নাই। জসিম নিজেকে আমদানি-রপ্তানি ব্যবসার সাথে জড়িত বলে দাবি করেছে। এ বিষয়ে কোনো কাগজপত্র তার কাছে পাওয়া যায়নি। এছাড়া মোহাইমেনুল ইসলাম বাঁধন ২০১৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর লেখাপড়া শেষ না করে এই চক্রের সাথে জড়িয়ে পড়ে। অন্যদেরও নির্ধারিত কোনো পেশা নেই। এদের মধ্যে একজন দেশের বাইরে ছিল।
এই চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে মেডিকেল, বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি চাকরির ‘প্রশ্নপত্র ফাঁস করে আসছিল’ বলেও জানান তিনি।
ওই মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য জসিম উদ্দিন ভূঁইয়া মুন্নু, পারভেজ খান ও জাকির হোসেন দিপুকে ৭ দিনের রিমান্ডে পেয়েছে সিআইডি। ঢাকা মহানগর হাকিম বেগম ইয়াসমিন আরা বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) ভার্চুয়াল আদালতে শুনানি নিয়ে তাদের এ রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
আদালত পুলিশের সাধারণ নিবন্ধন কর্মকর্তা এসআই হেলালউদ্দিন জানান, কারাগার থেকে তিন আসামিকে ভার্চুয়াল আদালতে উপস্থিত দেখানো হয়। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় মিরপুর থানায় করা মামলার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য তাদের ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা। অপরদিকে তাদের পক্ষ থেকে রিমান্ড বাতিল করে জামিন চাওয়া হয়। আসামিপক্ষের আবেদন নাকচ করে প্রত্যেকের ৭ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত।
অপর দুই আসামি সানোয়ার হোসেন ও মোহাইমেনুল ইসলাম বাঁধন এরইমধ্যে আদালতে দোষ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন বলে সিআইডি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তথ্য সহায়তা বিডিনিউজ।

