করোনা: গ্রামের দৃশ্য অকল্পনীয়!
মোহাম্মদ শিহাব । উত্তরদক্ষিণ
সোমবার, ০৩ আগস্ট ২০২০ । আপডেট: ১৮:০০
করোনাভাইরাস গরীবের জন্য নয়। এটি বড়লোকের জন্য। করোনায় মারা যাচ্ছে ধনীরা, গরীব মানুষ করোনায় মরে না। গবীবের করোনা হয়ও না। তাই মাস্ক-টাস্ক পরার দরকার পড়ে না!’ এমনটাই গ্রামের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষের বিশ্বাস ও বক্তব্য। অবশ্য শহরে বসবাসকারী নিম্ন আয়ের মানুষ, অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত আর ধর্মীয় কট্টপন্থী শ্রেণির বক্তব্যও প্রায় একই।
চলতি বছরের শুরু থেকে জুলাই পর্যন্ত গত ৭ মাসে গ্রামে যাওয়া হয়নি। করোনা মহামারিকালে গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রা দেখারও সুযোগ হয়নি এতদিন। কোরবানির ঈদে বাধ্য হয়ে (পারিবারিক কারণে) গ্রামে যেতে হয়েছে। কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রে যা দেখলাম, তাতে রীতিমতো অবাক হয়েছি। ভাবছি, সব গ্রামের চিত্রই কি এমন? সত্যিই কি তাহলে করোনা গরীব নিম্ন আয়ের মানুষকে ঘায়েল করতে পারে না? যদি ইউরোপ আমেরিকার মতো বাংলাদেশের গ্রামগুলোতে করোনার সংক্রমণ হতো- তাহলে, গ্রামের পর গ্রাম মানুষ মরে শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। বাস্তবে তা হয়নি। বিষয়টি আমার কাছে অকল্পনীয় মনে হয়েছে।
ঈদুল আজহার আগের দিন সন্ধ্যায় নরসিংদীর পলাশ উপজেলার নোয়াকান্দা, নয়াবাজার গ্রামের উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করি। মাস্ক, ফেস শিল্ডসহ পিপিই পরে যাত্রীবাহী একটি বাসে মহাখালী থেকে উঠলাম ৩১ জুলাই সন্ধ্যায়। বাসে প্রথমে দুই সিটে একজন করে ‘স্বাস্থ্যবিধি মেনে(!)’ যাত্রী তুললেও দৃশ্য বদলে গেল উত্তরা কাউন্টারে গিয়ে। যাত্রীদের কাছ থেকে দ্বিগুণ ভাড়া আদায় করা হলেও এবার প্রতিটি সিটে যাত্রী বসানোর বায়না বাসশ্রমিকদের। যাত্রীদের অনেকে প্রতিবাদ করলেও শেষ পর্যন্ত সবাই সফল হননি। বেশ ক’টি সিট পূর্ণ করা হলো। এমনকি ২-১ জন যাত্রী দাঁড় করিয়েই বহন করা হয়েছে। সবার মুখে মাস্কও ঠিক মতো ছিল না। বাসশ্রমিকদের তো মাস্ক পরার প্রশ্নই উঠে না। পুরো পথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরও কোনও তৎপরতা লক্ষ্য করলাম না। পুলিশের অনেকে করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর এখন অনেকটা চুপসে গেছে হয়তো!
বাস থেকে পাঁচদোনা স্টেশনে নেমে সিএনজি অটোরিকশা ভাড়া করতে গিয়ে আকাশ থেকে পড়লাম। কী আশ্চর্য, একটি অটোরিকশায় সামনে পেছনে ৫জন যাত্রী ঠাসাঠাসি করে বহন করা হচ্ছে। কারো মধ্যে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ভয় বা স্বাস্থ্যবিধি মানার তাড়া নেই। নিজেকে ‘সচেতন’ মনে করে আমি সিএনজি চালিক একটি অটোরিকশা রিজার্ভ করে একা চললাম গন্তব্যে। কিন্তু যে বাড়িতে গেলাম, সেখানে সব ঘরের শিশু-কিশোর, নারী-পুরুষ সবাই মিলে-মিশে একাকার। মাস্ক, সামাজিক দূরত্ব, হাত ধোয়া- সেখানে কোনও কিছুই নেই বললেই চলে।
আমি পিপিই খুলে গোসল করে ঘরে প্রবেশ করলাম। এরপর ওই গ্রামে দুদিন থেকে আমার যে অভিজ্ঞতা হলো- তা এককথায় বুঝাতে গেলে ব্যাপারটা ঠিক- ‘নগ্ন মিছিলে কেউ একজন পোশাক পরে উপস্থিত হলে, তাকেই লজ্জায় পড়তে হয়।’ আমার অবস্থাও ঠিক তেমনই।
আল্লাহর রহমতে সুস্থ শরীরেই শেষ পর্যন্ত ঢাকায় ফিরলাম। এখন ঘুরেফিরে মাথায় একটাই চিন্তা- গ্রামের মানুষগুলো করোনার সংক্রমণ থেকে মুক্ত আছে কীভাবে? আসলেই করোনা কি গরীব মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হয় না। সত্যিই এটি কেবল বড়লোক বা ধনীদের জন্য..? নাকি রোদ-বৃষ্টি আর কাদা-মাটিকে সঙ্গী করে বেড়ে ওঠা গরীব মানুষগুলোর এসব ভাইরাস প্রতিরোধের মতো যথেষ্ট অ্যান্টিবডি আল্লাহর রহমতে তাদের শরীরে তৈরি হয়ে আছে। ফলে করোনা-ফরোনা (কোভিড-১৯) তাদের কাবু করতে পারে না! আমার মনে হয়, এটি নিয়ে গবেষণা হওয়া দরকার। ছবি: প্রতীকী
লেখক: সাংবাদিক।

