রবি ঠাকুরের প্রয়াণ ও বাইশে শ্রাবণ
উত্তরদক্ষিণ । বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২০ । আপডেট: ০৬:২৫
বাংলা বর্ষপঞ্জির হিসাবে আজ বৃহস্পতিবার, ২২শে শ্রাবণ। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৭৯তম প্রয়াণ দিবস। মহাকালের চেনাপথ ধরে প্রতিবছর বাইশে শ্রাবণ আসে। এই বাইশে শ্রাবণ বিশ্বব্যাপী রবি ভক্তদের কাছে একটি শূন্য দিন।
রবীন্দ্র ভক্তরা যেমন বাইশে শ্রাবণে অশ্রুসিক্ত নয়নে প্রিয় কবিকে স্মরণ করেন, ভক্তি অর্চনা জানান- তেমনি বিশ্বকবির জীবনকেও অতীষ্ঠ করেছিল একটি বাইশে শ্রাবণ। সেই বাইশে শ্রাবণের অগ্নিকুন্ড জ্বালা নিয়ে কবিকে পার করতে হয়েছে বছরের পর বছর। তুষের আগুনে দগ্ধ হয়েছেন কবি। কবির জীবনেও বাইশে শ্রাবণ একটি মৃত্যুর দিন। কবির সবচেয়ে প্রিয় দৌহিত্র নীতিন্দ্রনাথের আকস্মিক মৃত্যু সংবাদ ছিল সেই বাইশে শ্রাবণের দিনে।
যদিও এ মৃত্যু প্রথম নয়। নিজের দীর্ঘমেয়াদী জীবদ্দশায় আঙিনা দিয়ে মৃত্যু শোকের যে দীর্ঘ মিছিল শুরু হয়েছিল দৌহিত্র নীতিন্দ্রনাথের মৃত্যু ছিল মিছিলের শেষ বিন্দু। ইতোপূর্বে শোকের ঝড়ে উৎসবের প্রদীপ নিভে গেছে বারে বারে। আগেই দুই মেয়ে বেলা এবং রেনু অকালে মারা গিয়েছিলেন। আর কবির মাত্র ১৪ বছর বয়সের সময় মৃত্যু ঘটে তার মায়ের।
মা সারদা দেবী ছিলেন নিষ্ঠাবতী বৈষ্ণবী, ধর্মমতী। সাত বছর বয়সে সাত পাঁকে বাঁধা পড়েন। দেবেন্দ্রনাথের বয়স তখন সতেরো। অল্পবয়সেই প্রথম সন্তানের জননী। তারপর একে একে পনেরটি সন্তানের গর্ভধারিণী। জীবন স্মৃতিতে রবীন্দ্রনাথ মায়ের সম্পর্কে লিখেছেন, ‘যে রাত্রীতে তাঁহার মৃত্যু হয় আমরা তখন ঘুমাইতে ছিলাম। তখন কত রাত্রি জানি না, একজন পুরাতন দাসী আমাদের ঘরে ছুটিয়া আসিয়া চিৎকার করিয়া কাঁদিয়া উঠিল- ‘ওরে তোদের কী সর্বনাশ হলরে’- স্তিমিত প্রদীপে অস্পষ্ট আলোকে ক্ষণকালের জন্য জাগিয়া উঠিয়া হঠাৎ বুকটা দমিয়া গেল। কিন্তু কী হইয়াছে ভাল করিয়া বুঝিতে পারিলাম না। প্রভাতে বাহিরের বারান্দায় আসিয়া দেখিলাম তাহার সুসজ্জিত দেহ প্রাঙ্গণে খাটের উপর শয়ান।’
রবীন্দ্রনাথের বিয়ের দিনেও মৃত্যু হানা দিতে ভুল করেনি। ঠাকুর পরিবারের বিয়ে নিয়ম ছিলো একটু অন্য ধরনের। পালকি চড়ে পাত্রীকেই আসতে হতো পাত্রের বাড়িতে। সেই বিয়ের দিনেই ঘটে এক অলুক্ষুণে অঘটন। রবীন্দ্রনাথের দিদি সৌদামিনীর স্বামী সারদা প্রসাদ ছিলেন ঘরজামাই। ছোট ভাইয়ের বিয়ের দিনেই কপালের সিদুঁর আর হাতের শাঁখা দুটি হারালেন সৌদামিনী। আর তখনো পালকিতে বলে সলজ্জা সালঙ্কারা মৃণালিনী দেবী।
না মৃত্যু এখানে এসে থেমে থাকেনি। এবার আর এক ট্রাজেডি। বিয়ের পর চার মাস অতিক্রান্ত হতে না হতেই তার নতুন বৌঠান, জ্যোতিরিন্দ্র নাথের রূপবতী স্ত্রী কাদম্বরী দেবী পূর্ণ যুবতী অবস্থায় আত্মহত্যা করেন। কিন্তু আবারো কবি পরিবারে মৃত্যুর হাতছানি। মৃত্যু এসে আর একজনের শিয়রে দাঁড়ায়। মাত্র আটাশ বছর বয়সে কবি পত্নীরও মৃত্যু হয়। তার আগে প্রথম সন্তান বেলার জন্ম হয় ১৮৮৮ সালে। তারপর সেজো মেয়ে রেনু এবং ছোট মেয়ে মীরা। এতোদিনে রবীন্দ্রনাথ মৃত্যুর বিষয় হজম করে আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হয়ে ওঠেন।
১৯০১ সালে বড় মেয়ে বেলার বিয়ে হয়। কিন্তু বিয়ের অল্প কিছুদিন পরেই বেলার মৃত্যু হয়। এবার মৃত্যু এসে ডাক দিয়ে যায় সেজো মেয়ে রেনুর জীবনেও। হারাধনের দশটি ছেলের মতো রবীন্দ্রনাথের হাতেও থাকে আর একটি মাত্র মেয়ে মীরা। মীরার বর নগেন্দ্রনাথ ছিলেন ঠাকুরবাড়ীর ঘরজামাই। এই ঘরে বংশ প্রদীপ জ্বেলে রেখেছিলো একমাত্র পুত্র নীতিন্দ্রনাথ। স্বাভাবিকভাবেই রবীন্দ্রনাথের স্নেহাস্পদের স্থানে ছিলো এই নীতিন্দ্রনাথ। তার বয়স যখন সবেমাত্র কুড়ি, অস্ফূট জীবনের কুঁড়ি যখন বিকশিত হবে রবীন্দ্রনাথ তাকে পাঠান বিলাতে। উন্নত ধরনের ছাপার কাজ ও প্রকাশন শিল্পের জ্ঞান অর্জন করে দেশে ফিরবে নীতিন্দ্রনাথ।এই প্রত্যাশ্যায়ই ছিলো কবির। কিন্তু নিয়তির আর এক পরিহাস। বিলেতেই অসুস্থ হয়ে পড়লেন নীতিন্দ্রনাথ। যক্ষ্মা রোগের জীবানুগুলো আষ্টে-পৃষ্ঠে পেঁচিয়ে ধরেছে নীতিন্দ্রনাথকে।
রবীন্দ্রনাথের মুখের উৎকন্ঠার আঁচগুলো প্রকট হয়ে ওঠে। এই কালব্যাধির খবর শুনে বিচলিত হয়ে ছুটে আসেন নীতিন্দ্রনাথের বাবা নগেন্দ্রনাথ। সাথে মা মীরা দেবী। ডাক্তার-ওষুধ ও চিকিৎসার জন্য অকাতরে টাকা দিচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ। সাথে উৎকন্ঠা আর উদ্বেগ।
২১ শ্রাবণ ৬ আগস্ট মৃত্যুর সমন পৌঁছে যায় নীতিন্দ্রনাথের শিয়রে। ডাক্তারদের নাগালের বাইরে চলে যেতে থাকেন তিনি। পরদিন বাইশে শ্রাবণ ১৩৩৯। ৭ আগস্ট ১৯৩২ মৃত্যই জিতে যায়। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন নীতিন্দ্রনাথ। আর প্রিয় দৌহিত্রের মৃত্যুদিবস বাইশে শ্রাবণকে ধারণ করে কবিও বিদায় নেন আর এক বাইশে শ্রাবণে। সূত্র: বাসস।

