বৈরুত বিস্ফোরণ: বিক্ষুব্ধরা একাধিক মন্ত্রণালয়ে হামলা চালিয়েছে

বৈরুত বিস্ফোরণ: বিক্ষুব্ধরা একাধিক মন্ত্রণালয়ে হামলা চালিয়েছে

উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ০৯ আগস্ট ২০২০ । আপডেট: ১৭:৫০

লেবাননের রাজধানী- বৈরুতে গত মঙ্গলবারের ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ করার এক পর্যায়ে কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে হামলা চালিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা। কয়েক হাজার মানুষ রাজপথে নেমে বিক্ষোভ করার সময় পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট পাটকেল নিক্ষেপ করে। পরে পুলিশও বিক্ষোভকারীদের দিকে পাল্টা টিয়ার গ্যাস ছোড়ে। দেশটির কেন্দ্রীয় মারটায়ারস স্কয়ার থেকেও গুলির শব্দ শোনা যায়। খবর বিবিসির।

টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে লেবাননের প্রধানমন্ত্রী হাসান দিয়াব বলেছেন যে, তিনি সঙ্কট থেকে বেরিয়ে আসার উপায় হিসেবে দ্রুত নির্বাচন চাইবেন। তার কথায়, ‘আমরা দ্রুত পার্লামেন্ট নির্বাচন না করে দেশের কাঠামোগত সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে পারবো না।’ আগামীকাল সোমবার (১০ আগস্ট) দেশটির মন্ত্রিসভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনার কথা রয়েছে বলে বিবিসির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

মঙ্গলবারের ওই বিস্ফোরণে কমপক্ষে ১৫৮ নিহত হয়েছিলেন। ২০০০ টন অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট সংরক্ষণের গুদামে বিস্ফোরণ প্রতিরোধে ব্যর্থ হওয়ায় ক্ষুব্ধ বহু লেবানিজ নাগরিক। এই বিপুল পরিমাণ অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট ছয় বছর আগে একটি জাহাজ থেকে জব্দ করা হয়েছিল তবে কখনও স্থানান্তর করা হয়নি। সরকার দায়ীদের খুঁজে বের করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

বন্দরের এই বিস্ফোরণ শহরের একটি অংশ ধ্বংস করে দিয়েছে যা সরকারের প্রতি মানুষের অবিশ্বাসকে আরও গভীর করে তোলে। দেশটির বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে আগে থেকেই অদক্ষতা ও দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। অর্থনৈতিক সঙ্কট এবং মুদ্রা সংকট নিয়ে গত অক্টোবর থেকে সরকারবিরোধী আন্দোলনও চলছিল।

মন্ত্রণালয়ে কী হয়েছে?
কয়েক হাজার বিক্ষোভকারী বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে এবং দেশের ব্যাংকিং সমিতির সদর দফতরে হামলা চালিয়েছে। প্রথমে একদল বিক্ষোভকারী সরকারবিরোধী স্লোগান দিতে থাকে এবং প্রেসিডেন্ট মিশেল আউনের প্রতিকৃতি পুড়িয়ে দেয়। এরপর তারা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রবেশ করে এবং দখলে নেয়। রেবেকা বলে পরিচয় দেয়া এক বিক্ষোভকারী বিবিসির নিউজ আওয়ারকে বলেছেন, ’এই জায়গা এখন আমাদের, পুরোপুরি আমাদের। দরজার বাইরে পুলিশ আছে। কিন্তু তারা আমাদের থামাতে পারেনি।’

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভেতরে জড়ো হয় শতাধিক বিক্ষোভকারী। তাদের মধ্যে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাও ছিলেন বলে জানা গেছে। মঙ্গলবারের বিস্ফোরণে মন্ত্রণালয়ে প্রবেশপথ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ভবনে সহজেই প্রবেশ করতে পেরেছেন বিক্ষোভকারীরা। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, সেনাবাহিনী কয়েক ঘণ্টা পরে বিক্ষোভকারীদের মূল দলটিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বের করে দেয়। তবে অন্যান্য ভবন তখনও তাদের দখলে ছিল বলে জানা গেছে।

টিভি ফুটেজে দেখা যায়, প্রতিবাদকারীরা জ্বালানি ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের দফতরেও প্রবেশ করছে। সৈন্যদের মেশিনগান লাগানো যানবাহনে রাস্তায় টহল দিতে দেখা গেছে। জানা গেছে, গত শনিবার ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে জড়ো হয়ে বন্দরের কাছে অন্যতম বিধ্বস্ত অঞ্চল শহীদ স্কয়ারে একটি মিছিল করে। প্রথমে পুলিশের সাথে বিক্ষোভকারীদের বাকবিতণ্ডা শুরু হয় সেখানে। এরমধ্যে কয়েকজন বিক্ষোভকারী পুলিশকে লক্ষ্য করে পাথর ছুড়লে এবং লাঠি নিয়ে এগিয়ে এলেও পুলিশও পাল্টা টিয়ার গ্যাস ও রাবার বুলেট ছোড়ে।

পার্লামেন্টের বাইরে এমনভাবে ব্যারিকেড তৈরি করা হয় যেন বিক্ষোভকারীরা প্রবেশ করতে না পারে। পুলিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে নিশ্চিত করেছে যে, কেন্দ্রীয় বৈরুতে গোলাগুলি হয়েছে। তবে কারা গুলি চালিয়েছে তা এখনও পরিষ্কার নয়। বিক্ষোভ চলাকালীন একজন পুলিশ কর্মকর্তার মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। বিক্ষোভকারীরা পুলিশকে ধাওয়া করলে ওই কর্মকর্তা একটি হোটেলের লিফট শ্যাফটে পড়ে মারা যান।

স্থানীয় রেড ক্রস জানিয়েছে, তারা ঘটনাস্থলে ১১৭ জন আহত ব্যক্তির চিকিৎসা করেছে। আরও ৫৫ জনকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। বিক্ষোভ চলার সাথে সাথে মারটায়ার স্কয়ারে দেশটির রাজনৈতিক নেতাদের প্রতীকী ফাঁসি কার্যকর করা হয়। সর্বশেষ আপডেট অনুসারে, ক্ষোভ প্রকাশের পাশাপাশি বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্তদের স্মরণ করেন। ভয়াবহ ওই বিস্ফোরণে ৬০০০ মানুষ আহত হয়েছেন। গৃহহীন হয়েছেন প্রায় ৩ লাখ মানুষ।

জাতিসংঘের সংস্থাগুলি দেশটিতে সম্ভাব্য খাদ্য ঘাটতি থেকে শুরু করে কোভিড ১৯ মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে না পারাসহ লেবাননে একটি মানবিক সঙ্কটের বিষয়ে সতর্ক করেছে। রোববার ফরাসী প্রেসিডেন্ট ইমান্যুয়েল ম্যাক্রোর ভার্চুয়াল দাতা সম্মেলনে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে বিশ্ব নেতাদের। সেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উপস্থিত হওয়ার কথা রয়েছে।

ডাউনিং স্ট্রিট বলেছেন, যুক্তরাজ্যসহ অনেক দেশ ইতোমধ্যে সহায়তা প্রদান করেছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন শনিবার লেবাননের প্রেসিডেন্ট আউনের সাথে কথা বলেছেন এবং লেবাননের জনগণের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন। লেবাননের প্রেসিডেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যে, অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট – সাধারণত সার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে এটি একটি বিস্ফোরক তৈরিতে ব্যবহার হতে পারে। ২০১৪ সাল থেকে কোনও সুরক্ষা সতর্কতা ছাড়াই বন্দরের একটি গুদামে সংরক্ষণ করা হয়েছিল ভয়াবহ ওই বিস্ফোরক উপাদানটি।

শহরের কেন্দ্রের কাছে একটি গুদামে এত বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক রাখার সিদ্ধান্তটি অনেক লেবানিজের মনে সরকারের বিরুদ্ধে অবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে। আউন স্বচ্ছ তদন্তের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি খারিজ করেছেন। সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ও হামলায় জড়িত সন্দেহে ইতোমধ্যে ২১ জন নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে লেবাননের কাস্টমস কর্তৃপক্ষের মহাপরিচালক বাদ্রি দাহের রয়েছেন।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading