৪০ বছর ধরে ঘানি টানছেন নীলফামারীর মোস্তাকিম তেলি

৪০ বছর ধরে ঘানি টানছেন নীলফামারীর মোস্তাকিম তেলি

শাহজাহান আলী মনন । উত্তরদক্ষিণ
সৈয়দপুর (নীলফামারী): রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০ । আপডেট ১২:৩০

বৈচিত্রময় এই পৃথিবীতে প্রতিনিয়ত আমাদের চারপাশে এমন কিছু ঘটনা ঘটে যা মর্মস্পর্শী ও হৃদয়বিদারক। জীবন-জীবিকার তাগিদে দু’মুঠো অন্ন জোগাতে বিচিত্র অনেক পেশায় নিয়োজিত রয়েছে কিছু মানুষ। এমনই এক হাড়ভাঙা হৃদয়বিদারক পেশায় জীবন জীবিকা নির্বাহ করে আসতেছেন সহায়-সম্বলহীন নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার বাহাগিলী ইউনিয়নের উত্তর দুরাকুটি পাগলাটারী গ্রামের মৃত কাজেতুল্লাহ’র ছেলে মোস্তাকিম তেলি (৭০)।

গরু কেনার সামর্থ্য নেই তার। আছে শুধু দারিদ্রের কষাঘাত। দু’মুঠো পেটের অন্ন জোগাতে গরুর অভাবে কলুর বলদ সেজে ষাটোর্ধ স্ত্রী ছকিনার বেগমের সহায়তায় গত ৪০ বছর ধরে খাঁটি সরিষার তেল তৈরির কাঠের ঘানির জোঁয়াল বুকে জড়িয়ে টানছেন মোস্তাকিম তেলি।

বয়সের ভারে অনেকটাই অক্ষম হয়ে পড়লেও উভয় দম্পতি পরিবারের চার সন্তানসহ ছয় জনের মুখে অন্ন তুলে দিতে সাত সকাল হতে তেলের ঘানির জোঁয়াল বুকে জড়িয়ে ঘূর্ণায়নমান জীবন যুদ্ধে নেমে পড়েন। সহস্রাধিক ঘামঝরা অজস্র ঘূর্ণায়ন পাকে পাঁচ কেজি সরিষার দানা থেকে ফোঁটা ফোঁটা তেল বের করেন সোয়ালিটার। প্রতিদিন আয় আসে ১৫০/২০০টাকা। ঘানির ঘাম শুকাতে না শুকাতেই আবারও তাকে খুচরা তেল বিক্রির জন্য ছুটতে হয় বিভিন্ন গ্রাম গঞ্জের পাড়া-মহল্লায়।

এই দিয়ে ছয় জনের সংসার চলে নানা টানা পোড়নের মধ্যে দিয়ে। পেটে যায় না তিনবেলা ভাত।

জানা গেছে, মোস্তাকিম তেলি (৭০) ছকিনা বেগম (৬০) দম্পতি তিন ছেলে চার মেয়ের জনক-জননী। দারিদ্রের কষাঘাতে পিষ্ট হয়ে ঘানি টানার বলদ বিক্রি করে ধাারদেনা করে চার মেয়েকে কোনরকমে বিয়ে-শাদী দিলেও এক মেয়ের যৌতুকের দাবি মেটাতে না পেরে স্বামী পরিত্যক্তা হয়ে এক সন্তানের জননী রুপালি বেগম এখনও তার ঘরে রয়েছেন। তিন ছেলের মধ্যে দুই ছেলেই প্রতিবন্ধী। একছেলে অন্যের বাড়িতে আছেন ঘর জামাই। ওই দু’জনের ভাগ্যেও জোটেনি বয়স্ক ভাতার কার্ড।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পরিবারটি পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া নামমাত্র মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের উঠোনে জরাজীর্ণ টিনের ছাপড়া আর পলিথিন মুড়িয়ে স্থাপন করেছেন বিশেষ ধরনের গাছের গুড়ি দিয়ে তৈরি করেছেন তেলের ঘানিটি । ক্যাঁচএচ ক্যাঁচএচ ক্যাঁচর শব্দে তেলের ঘানির চারদিকে ঘুরছে মোস্তাকিম তেলি। পেছনে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন স্ত্রী ছকিনা। আর কাতাড়ির উপরে বসে আছেন প্রতিবন্ধি ছেলে। বাপ-দাদার পেশার ঐতিহ্য খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে আজও যেন আঁকড়ে ধরে আছেন। পেশা আঁকড়ে ধরে রাখতে গিয়ে পরিবারটি পড়েছেন মহা বিপাকে।

নিজেই ঘানি টানার বিষয়ে জানতে চাইলে মোস্তাকিম তেলি বলেন, “বাহে হামরা জম্মের গরিব। এক সময়ে একটা গরু আছিল, মেয়ের বিয়া দিতে সেটা ব্যাচে (বিক্রি) ফেলাচুন। তখন থেকে আর গরু কিনবার পারো নাই।

তিনি আরও বলেন, এই বয়সে আর ঘানি টানবার পারো না। গায়ের বল কমি গেইছে। ঘানির সাথে ঘুরতে ঘুরতে মাথা ঘুরতে থাকে। বয়সও হইছে মেলা।
পরিবারটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সমাজের বিত্তশালী মানুষের কাছে সহযোগীতার আশা করেছেন। যদি তাঁকে কেউ একটা ঘানি টানার গরু কিনে দিতো, তাহলে বৃদ্ধ বয়সে পরিশ্রম কমত, আয় রোজগারও একটু বাড়ত।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading