সুন্দরগঞ্জে অসময়ে তিস্তার ভাঙন: দিশেহারা তীরবর্তী জনপদ

সুন্দরগঞ্জে অসময়ে তিস্তার ভাঙন: দিশেহারা তীরবর্তী জনপদ

সুদীপ্ত শামীম । উত্তরদক্ষিণ

গাইবান্ধা: মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর, ২০২০ । আপডেট: ১৪:০৫

তিস্তার পানি নেমে যাচ্ছে ব্রহ্মপুত্রে। সেই সঙ্গে শুকিয়ে যাচ্ছে গতিপথ হারা প্রমত্ত তিস্তা। তবুও পানির তীব্র স্রোতে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে নদী ভাঙন। গত একসপ্তাহ ধরে এমন ভয়াল রূপ নিয়েছে তিস্তা। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার হরিপুর, শ্রীপুর ও কাপাসিয়া ইউনিয়নে ভাঙনের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি। এরেই মধ্যে নদীতে বিলীন হয়েছে কয়েকটি গ্রামের সহস্রাধিক বসতঘর। ভাঙনে বিলীন হয়েছে শতাধিক একর ফসলি জমি। রক্ষা পায়নি গাছপালা আর ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ নানা স্থাপনা। এতে ভাঙন আতষ্কে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন নদী তীরবর্তী জনপদের মানুষ।

এদিকে, তিস্তার এমন ভয়াবহ ভাঙন রোধে জরুরি ব্যবস্থা নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে অবগত করেও কোন ফল পায়নি স্থানীয়রা। বাধ্য হয়ে ভাঙন ঠেকাতে ড্রেজার দিয়ে নদীর গতিপথ পরিবর্তন করার চেষ্টা করছেন ক্ষতিগ্রস্থরা। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, ওইসব ভাঙন কবলিত স্থানে স্থায়ী তীররক্ষা প্রকল্পের কাজ শুরু করা হবে। তাই আপাতত জরুরি কোন কাজ করছি না।

জানা গেছে, গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের হরিপুর খেয়া ঘাটে ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। প্রতিনিয়তই তিস্তার ভাঙনে বিলীন হচ্ছে বাড়িঘর, ফসলি জমি ও বিভিন্ন স্থাপনা। ইতোমধ্যে ভাঙনে হুমকির মুখে পড়েছে শত শত ভিটা, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। স্কুল থেকে নদীর দুরুত্ব মাত্র ৩’শ মিটার। যে কোন সময় তিস্তা গর্ভে যেতে পারে বিদ্যালয়টি। আর হরিপুর খেয়াঘাট ভাঙনের কবলে পড়ায় ব্যাহত হচ্ছে নৌ-চলাচল। প্রতিদিন নতুন নতুন ফসলি জমি ও বসত-ভিটে বিলীন হওয়ায় অনেকেই সরিয়ে নিচ্ছে দোকানপাট, ঘরবাড়ি ও স্থাপনা। এছাড়াও তিস্তার ভাঙনের কবলে পড়েছে শ্রীপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ শ্রীপুর, উত্তর শ্রীপুর, কাপাসিয়া ইউনিয়নের লালচামার ঘাট ও বেলকা ইউনিয়নের নবাবগঞ্জ গ্রাম। ভাঙনে বসতভিটা হারিয়ে অনেকেই আশ্রয় নিয়েছেন বাঁধ ও অন্যের জমিতে। কেউ আশ্রয় না পেয়ে চলে যাচ্ছেন অন্যত্র।

অন্যদিকে তিস্তা-ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে প্রতি বছরেই বাড়ছে পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক ছিন্ন মানুষের সংখ্যা। গেল কয়েক মাসে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে এ উপজেলার অন্তত ২ হাজার পরিবারের ঘরবাড়ি। ভাঙনের শিকার হয়ে কে কোথায়? আশ্রয় নিয়েছে তা জানা নেই অনেকের। নদী ভাঙনে শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে নি:স্ব অনেকে। কেউবা বাধ্য হয়ে আশ্রয় নিয়েছে অন্যর জায়গায় ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে। আবার জায়গা না পাওয়ায় খোলা আকাশের নিচে কোন রকমে দিন কাটাচ্ছে ক্ষতিগ্রস্তরা। এ ছাড়াও হুমকির মুখে বসতঘর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক স্থাপনা।

লালচামার ঘাটের বাসিন্দা মজিবুল হক বলেন, ‘বন্যার আগেও নদীর ভাঙনে বাড়িঘর, ফসলি জমি বিলীন হয়েছে। এখন আবার পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে ভাঙনের তীব্রতা বাড়ছে। দফায় দফায় ভাঙনে কখন আমাদের বাড়িঘর গিলে নেয় এ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছি।’

হরিপুর ঘাটের বাসিন্দা আবদুর ছালাম বলেন, ‘ভাঙনের কারণে প্রতিনিয়ত তাদের বাড়িঘর সড়িয়ে নিতে হচ্ছে। ঘরবাড়ি সরিয়ে নিয়ে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবেন তাও জানা নেই। বন্যার ক্ষতি পুষিয়ে না উঠতেই নদীর ভাঙনে এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা।’

হরিপুর ইউপি চেয়ারম্যান নাফিউল ইসলাম জিমি বলেন, ‘তিস্তার ভাঙনে দিশেহারা হয়ে পড়েছে নদী তীরবর্তী এলাকার মানুষ। গত কয়েক দিনে হরিপুর ঘাটসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের শতাধিক বসতভিটে ও হাজারো বিঘা আবাদি জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। ভাঙনের মুখে পড়েছে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ অসংখ্য বাড়িঘর, ফসলি জমি, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। ‘

নদী বাঁচাও মানুষ বাঁচাও আন্দোলনের আহ্বায়ক সাদেকুল ইসলাম দুলাল বলেন, তিস্তার অব্যাহত ভাঙনে হাজারো বসত-বাড়ি ও ফসলি জমি নদী গর্ভে চলে গেছে। বাপ-দাদার শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে এখন নি:স্ব পরিবারগুলো। তার দাবি, জিওব্যাগ কোন সমাধান নয়, ভাঙন রোধে দ্রুত স্থায়ী তীররক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়ন করার।

এ বিষয়ে গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান বলেন, হরিপুর ও শ্রীপুরে স্থায়ী তীর রক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। এটি আগামী ডিসেম্বর মাসে কাজ শুরু করা হবে। তাই সেই স্থান গুলোতে জরুরি কোন কাজ করা হচ্ছে না। আর লালচামার এলাকায় ভাঙন ঠেকাতে জরুরী ভিত্তিতে জিওব্যাগ ফেলার কাজ চলছে।

অব্যাহত নদীর ভাঙনে উদ্বিগ্ন গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী। তিনি বলেন, ‘ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ড তৎপর রয়েছে। বরাবরেই ভাঙন রোধে নদী তীরবর্তী এলাকায় শুধু অস্থায়ীভাবে বালুর বস্তা ফেলানোর কাজেই হয়েছে। তবে এবার ৬টি পয়েন্টে ৪১২ কোটি টাকার প্রকল্পে একনেকে অনুমোদন হয়েছে। এই প্রকল্প আগামী মাসের মধ্যে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণসহ পুরো এলাকাকে সুরক্ষিত করা সম্ভব হবে।

শুধু আশ্বাসেই নয়, ভাঙন রোধে মজবুত বাঁধ নির্মাণসহ ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে দ্রুতই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি, নদী তীরবর্তী এলাকার মানুষের।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading