এক বছরে আমাদের করোনাজ্ঞান

এক বছরে আমাদের করোনাজ্ঞান

উপসম্পাদকীয় | উত্তরদক্ষিণ
মুদ্রিত সংস্করণ: রবিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২০ | আপডেট: ০০:০১

আল আমীন :: গত বছরের ডিসেম্বরে মধ্য চীনের উহান শহর থেকে নিউমোনিয়ার মতো একটি রোগ ছড়ানোর খবর পাওয়া গেল। এরপরই জানা গেল কোভিড-১৯ বা করোনাভাইরাসের কথা। পরে চলতি বছরের ১১ মার্চ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) করোনাকে মহামারি ঘোষণা করলো। এর আগে ২০ জানুয়ারি জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করলো ডব্লিউএইচও। করোনাভাইরাস সম্পর্কে এই ইতিহাস আমাদের কমবেশি জানা।

এরপরের ঘটনাও আমরা জানি। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই ভাইরাসের নাম দেন ‘চীনা ভাইরাস’।

কেউ কেউ বললো, এটি চীনের তৈরি ভাইরাস, আবার কেউ বললো ‘প্রাকৃতিকভাবেই সৃষ্টি’… এই তর্ক-বিতর্ক, জানা-অজানার মধ্যেই দেখতে দেখতে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়লো বিশ্বব্যাপি। মহামারি থেকে অতিমারিতে রূপ নিলো, একের পর এক দেশ লকডাউন, শাটডাউনের পথ বেছে নিলো, করোনা আসলো আমাদের দেশেও। এরপর?… হ্যাঁ, এরপরের ইতিহাস বড়ই বিচিত্র।

চীনে করোনা শনাক্তের পর প্রায় এক বছর কিন্তু হয়েই গেছে, বিশ্ব জুড়ে করোনাক্রান্তের সংখ্যা এই বছরের নভেম্বরে এসে ছয় কোটি ছাড়িয়েছে, প্রাণঘাতি এই ভাইরাসের সংক্রমণে মৃতের সংখ্যাও প্রায় ১৫ লাখ। কিন্তু আমরা, বাংলাদেশিরা কিন্তু করোনাকে ডরাইনি। কেন? এর কারণ হয়তো আমাদের ‘করোনাজ্ঞান’।

‘করোনাজ্ঞান’ এই জন্য বলছি, কারণ আমাদের দেশের অনেকেই এটাকে আমলে নিতে চান না বা চাননি। বিশ্বাস করেন না। অনেকেই মনে করেন, এটি ‘পাপিদের রোগ’ অনেকে বলেন এটা ‘বড়লোকের রোগ’, গরীবের এটা হয় না।

করোনা সম্পর্কে সচেতনতামূলক কিছু বলতে গেলেই বিশেষ করে আমাদের দেশের গ্রামের মানুষদের মুখে এমন অভিব্যাক্তি দেখেছি, যেন এটার নামও নেয়া যাবে না!

গ্রামের মানুষ বা কম শিক্ষিত মানুষদের কথাই খালি বলবো কেন? আমাদের শিক্ষিত সমাজও তো কম যাই না। সরকারিভাবে দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে যে হারে ভিড় বেড়েছিল বা গ্রামের বাড়ি যাওয়ার জন্য লঞ্চ-ফেরিতে যে ভিড় লেগেছিল, তা গণমাধ্যমের কল্যাণে আমরা সবাই কম বেশি দেখেছি। হ্যাঁ, মানছি লকডাউনের কারণে যারা দলে দলে গ্রামের পথ ধরেছিল তাদের পেছনে যুক্তিসংগত কারণ ছিল… এ অবস্থায় ঢাকায় থাকলে অনেকেরই জীবিকা নির্বাহ করতে বহুবিধ সমস্যার শিকার হতে হতো, তাই তারা ঢাকা ছেড়েছিলেন, কিন্তু বারবার সোশাল ডিস্ট্যান্স মেনে চলার আহ্বান জানানোর পরও যারা সাধারণ ছুটিতেই শখের বশে বা প্রমোদ ভ্রমণে বের হলেন, তাদের ব্যাপারে কী বলা যায়!

অথচ আমাদের দেশে যখন প্রথম করোনা শনাক্ত হলো, তখনই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সরগরম হয়ে উঠলো লকডাউন কেন হচ্ছে না, সেই পোস্টে… অনেকেই লকডাউন ঘোষিত অন্যান্য দেশের নির্জন রাস্তার ছবির পাশে ঢাকার রাস্তার যানজটের ছবি জুড়ে দিয়ে পোস্ট দিতে শুরু করলেন, ‘করোনাকালে অন্য দেশের রাস্তা আর আমাদের দেশের রাস্তার চিত্র’-টাইপ ক্যাপশন দিয়ে।

যাইহোক, আমাদের দেশেও লকডাউন হলো। কে কতটুকু মেনেছি সোশাল ডিস্ট্যান্স বা লকডাউন, তা আমরাই ভাল করে জানি। কেউ ঘরবন্দী হয়ে ছিল ঠিকই, কিন্তু অন্যরা বিচিত্র… কেউ কেউ আবার বাধ্য হয়ে বা পেশাগত কারণে ঘরবাহির হয়েছেন, সেটা অন্য কথা। কেউ কেউ মাস্কই পরতে চান না, আবার কেউ কেউ অপ্রয়োজনেও পিপিই পরে বাইরে বেরিয়েছেন। এ নিয়ে বহুত ঘটনা আছে, আমরা জানি।

আমরা সোশাল ডিস্ট্যান্স মানতে নারাজ, মাস্ক পরতে অনীহা এমনকি করোনাকেও বিশ্বাস করতে অনেকে রাজি না। অথচ আমাদেরই কেউ কেউ থানকুনি পাতার গুজবে মধ্যরাতে করোনা নিধন করতে পাড়াময় হাঁকডাক জুড়ে দিয়েছিল। করোনা দূর করার আরও কত গুজব আমরা শুনেছি।…

বিচিত্র অভিজ্ঞতার দিনকাল পার করে এখন আমরা মুখোমুখি, করোনার সেকেন্ড ওয়েভে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী সংক্রমণের হার যখন পাঁচ শতাংশে নেমে আসে এবং সেটি অন্তত তিন সপ্তাহ ধরে একই অবস্থায় থাকে, সে অবস্থাকে করোনাভাইরাসের প্রথম ওয়েভ শেষ হওয়া বলা যাবে। ইউরোপের অনেক দেশেই করোনাভাইরাস সংক্রমণের হার একবার কমে আসার পরে আবার বাড়তে শুরু করেছে—যাকে বলা হচ্ছে সেকেন্ড ওয়েভ। আবার আমেরিকার ক্ষেত্রে সংক্রমণ পুরোপুরি না কমেও নতুন করে সংক্রমণের হার বেড়ে গেছে।

এদিকে শীতকালও আবার চলে এসেছে। যেহেতু করোনাভাইরাস ঠান্ডাজনিত রোগ। আর শীতপ্রধান দেশগুলোতেও এখন নতুন আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। যদিও বাংলাদেশ ও ইন্ডিয়ার মতো দেশগুলোয় গরমের সময়েও করোনাভাইরাসের ব্যাপক বিস্তার দেখা গেছে। তবে বাংলাদেশে শীতের সময় করোনাভাইরাসের আরেক দফা সংক্রমণ বৃদ্ধির আশঙ্কা করা হচ্ছে সরকারের পক্ষ থেকে। যদিও শীত বা ঠান্ডার সাথে করোনাভাইরাসের কোনো সম্পর্ক রয়েছে বলে এখনও পুরোপুরি প্রমাণিত হয়নি। তবে করোনাভাইরাসের অন্য যে গোত্রগুলো রয়েছে, যার কারণে সাধারণ সর্দি-কাশির মতো রোগের প্রকোপ বেড়ে যায়, সেসব ঠান্ডা পড়লে বেড়ে যায় বলে দেখা গেছে। এজন্য নানা প্রস্তুতির কথা বলা হয়েছে। গত কিছুদিন ধরে নতুন সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যাও বৃদ্ধি পেতে দেখা গেছে।

এই অবস্থার মধ্যে বিশেষজ্ঞরাও বলছেন আমাদের দেশে শীতকালে করোনার সেকেন্ড ওয়েভ বা দ্বিতীয় ঢেউ আঘাত হানবে। সে অনুযায়ী স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী সংসদ অধিবেশনে তার বক্তব্যে দেশবাসীকে সতর্ক করে দিয়েছেন। তিনি মাস্ক ব্যবহারের ওপর জোর দিয়েছেন, সামাজিক দূরত্ব বজিয়ে রেখে চলাচলের কথা বলেছেন। বলেছেন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জীবনযাপনের কথা।

এখন আমাদের কী চিন্তাভানা? প্রায় এক বছর পরে এসে করোনায় আমরা কতটুকু ভীত বা সেকেন্ড ওয়েভ নিয়ে আমরা সতর্ক কতটুকু? আমরা কি আদৌ সতর্ক? তুলনা করা যাক।

এ বছর মার্চে আমাদের দেশে করোনা যখন প্রথম আঘাত হানে তখন আমরা করোনা নিয়ে যতটা ভীত ছিলাম, যতটা সতর্কতা অবলম্বন করেছিলাম, এখন তা আর নেই বললেই চলে। যার প্রমাণ মিলে রাস্তাঘাটে, হাটে বাজারে, বাস-ট্রেন-লঞ্চে, অফিস আদালতে। বলা যেতে পারে সবখানে। আগে সর্দি জ্বর কাশি হলে প্রথমে করোনার কথা মনে পড়তো এবং তাৎক্ষণিকভাবে মানুষ করোনা টেস্ট করাতো। এখন আর অতি সামান্যতে মানুষ ভয় পেয়ে করোনা টেস্ট করায় না। ভাবে করোনা হয়ে থাকলেও এটি ওষুধেই চলে যাবে। বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করার দরকার নেই। বলতেই হয়- করোনামুক্ত থাকার এটাই যেন এখন মানুষের ‘নিঞ্জা টেকনিক!’ টেস্ট না করা…

এদিকে মাস্ক পরার ক্ষেত্রে মানুষ সচেতন নয় বলে, শেষ পর্যন্ত ’নো মাস্ক, নো সার্ভিস’ সিস্টেম চালু করা হয়েছে। তবু করোনার ভয় কিন্তু এখন আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে নেই বললেই চলে।

অথচ, গত বছরের মার্চ এপ্রিলে আমাদের দেশের চিত্র ছিল এমন। দেখা গেল, কোনো এক বিল্ডিংয়ে বা বাসা-বাড়িতে প্রথম করোনা ধরা পড়লো। সে কী এক অবস্থা! ওই বিল্ডিং বা বড়িটাকে লকডাউন করা হলো। প্রশাসনের লোকজন এসে মাইকিং করলো। ফলে ভয়ে ওই বিল্ডিংয়ের বা বাড়ির আশেপাশে অন্য কোনও বিল্ডিংয়ের বসবাসকারীরা যেতেন না। তাদেরকে নিজ বিল্ডিং থেকে বের হতে দেওয়া হতো না। অনেকটা মৃত্যুপুরীর মতো শুনশান অবস্থা ছিল সেটি।
দিন দ্রুত বদলেছে, এখন কিন্তু অনেক বাড়িতেই করোনা আক্রান্ত রোগী আছে, কিন্তু সেই প্রথম শনাক্ত হওয়া বিাড়ির মতো অবস্থা নেই। নেই সেই সতর্কতা কিংবা ভয়।

আবার ওই সময়গুলোতে এমনও দেখা গেছে, গ্রামের কোনো বাড়িতে বিদেশ থেকে কেউ এসেছেন, তাকে ওই বাড়িতেই কোয়রেন্টাইনে রাখা হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে উৎসুক জনতার ভীড়… বড়ই বিচিত্র আমরা, তারও চেয়ে বেশি বিচিত্র আমাদের করোনাজ্ঞান।

লকডাউন কিংবা পেশাগত কাজের কারণে করোনাকালের দুই ঈদে গ্রামের বাড়ি না গেলেও পরে গিয়েছিলাম গ্রামে। গ্রামে গিয়ে রীতিমত মাস্ক পরা আমি যেন তাদের কাছে এলিয়েন, সবাই অন্যচোখে তাকায়, হাসে, হা করে তাকিয়ে থাকে। পরে অবশ্য পরিচিতদের কয়েকজনকে বোঝাতে সক্ষম হলাম যে, ‘আপনারা করোনার ভয় না পেলেও আমি পাই। কিংবা গ্রামে করোনা না থাকলেও আমি যেহেতু ঢাকা থেকে এসেছি, তাই আমার মাধ্যমেও ছড়াতে পারে, তাই এই সতর্কতা…’

শুধু মফস্বল শহরে বা গ্রামে নয়, রাজধানীসহ দেশজুড়ে করোনার বিষয়ে এখন অতি ঢিলেঢালা অবস্থা বিরাজ করছে। খালি চোখে যা দেখছি তাতে প্রতীয়মান হচ্ছে গত কয়েক মাস ধরে মানুষের মধ্যে করোনার ভীতি কমেছে, সচেতনতা কমেছে। মাস্ক ব্যবহার, স্যানিটাইজার ব্যবস্থা পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার প্রবণতা ইত্যাদি কমেছে। ঢাকার বাইরে অনেক জায়গায় এসবের তো বালাই নেই। ইদানীং ঢাকাসহ দেশের বড় বড় শহরেও করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে যেভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা দরকার তা মানা হচ্ছে না। বরং গা ঘেঁষাঘেঁষি করে রাস্তাঘাটে, কাঁচাবাজারে, শপিং মলে, বাসে-লঞ্চে, অফিসে-আদালতে মানুষ চলাচল করছে। এক কথায় বলা যেতে পারে যে মানুষের মধ্যে এখন বিধিনিষেধ না মানার প্রবণতা কাজ করছে।

এদিকে দেশে বর্তমানে করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যু এই দুইয়ের ঊর্ধ্বগতি করোনার সেকেন্ড ওয়েভের আঘাতের কথা বারবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। সেকেন্ড ওয়েভের আক্রমণ মোকাবিলার জন্য এখনই যদি সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হয় তবে তার পরিণতি যে ভয়াবহ হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এর জন্য সামাজিক সচেতনতার যেমন প্রয়োজন রয়েছে তেমনি আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও কঠিন অবস্থান গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে।

বলা হচ্ছে, ভ্যাকসিন আসার আগ পর্যন্ত এখন একমাত্র নির্ভরযোগ্য করোনাপ্রতিরোধ ব্যবস্থা মাস্ক পরা… এদিকে ডিসেম্বরেই কয়েকটি দেশে ভ্যাকসিন প্রদান শুরু হবে বলেও খবরে জানা যাচ্ছে। তবে আমাদের দেশে যেহেতু করোনা প্রতিরোধ টিকা পাওয়ার সুযোগ আসতে এখনও অনেক সময় অপেক্ষা করতে হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, সেহেতু করোনার সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য সচেতনতা ও বিধিনিষেধ পরিপালনের আপাতত কোনও বিকল্প নেই। এতে জনগণ জনপ্রতিনিধি প্রশাসন স্বাস্থ্যকর্মী সকলেরই কাজ করে যেতে হবে। নিজ নিজ এলাকায় মাস্ক পরা সহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য মানুষকে বাধ্য করতে হবে। এর জন্য কঠিন পদক্ষেপ নিতে হলেও দিতে হবে। ঢাকাসহ দেশের সর্বত্র জনসমাগম হয় এমনসব স্থানে মাস্ক পরা ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি। ‘নো মাস্ক নো সার্ভিস’ শুধু অফিসে আদালতে নয়, হাটে-বাজারে দোকানপাটে কলকারখানায়-বাসে-লঞ্চে সর্বত্র এর বাস্তবায়ন ঘটাতে হবে। করোনা সেকেন্ড ওয়েভের কালো ছোবল থেকে বাঁচার জন্য এসবের আর কোনও বিকল্প নেই। করোনাজ্ঞান শুধু ‘জানা’র মধ্যে নয় ‘মানা’র আওতায় আনতে হবে, এটাই শেষ কথা । লেখক: কবি ও সংবাদকর্মী

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading