ভ্যাকসিন পলিটিক্স
মির্জা মমতাজ | উত্তরদক্ষিণ
মুদ্রিত সংস্করণ: রবিবার, ২০ ডিসেম্বর, ২০২০ | আপডেট: ০০:০১
অর্থ, ক্ষমতা ও প্রযুক্তির জোরে ধনী দেশের হাতে সম্পূর্ণ নিয়ণ্ত্রণ!
মির্জা মমতাজ : ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর উহান মিউনিসিপাল কমিশন হুবেই প্রদেশের উহান শহরে নিউমোনিয়া রোগীদের একটি ভাইরাস শনাক্ত করার কথা জানায় চিন। তখন ঘুণাক্ষরে বিশ্বের মানুষ চিন্তাও করতে পারেনি শনাক্ত করা ভাইরাসটি এতটা দ্রুত ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে ছয়-সাত মাসের ভেতর সমগ্র পৃথিবী ওলট-পালট করে দেবে। ২০২০ সালের ১২ জানুয়ারি চীন শনাক্ত করা নভেল করোনাভাইরাসের জেনেটিক সিকোয়েন্স প্রকাশ করে। পরবর্তীতে তার নাম হয় কোভিড-১৯।
কোভিড-১৯ দ্রুত গতিতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর হার বারতে শুরু করে। তখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিশ্ববাসীকে হুঁশিয়ার করেন নতুন মহামারি সম্পর্কে এবং ভ্যাকসিন তৈরি করতে অনেক বছর সময় লেগে যায়- এজন্য খুব দ্রুত কিছু পাওয়ার আশা যেন বিশ্ববাসী না করে তাও বলে দেন। তবে সুখবর হলো মাত্র ১০ মাস পরেই কিছু দেশে করোনাভাইরাসের টিকা দেয়া শুরু হয়ে য়ায়। এই মুহূর্তে অনেক উন্নয়নশীল দেশে সাধারণ জনগণদেও ভ্যাকসিন দিচ্ছে এবং ২০২১ সালে বিশ্বেও অনেক দেশ ভ্যাকসিনের আওতায় চলে আসবে। ভ্যাকসিন যারা তৈরি করেছে – সেই কোম্পানিগুলোর নাম এখন লোকের মুখে মুখে ফিরছে। দু-তিনটি ভ্যাকসিন-উৎপাদক কোম্পানি – আমেরিকার মডার্না, জার্মানির বায়োএনটেক এবং আমেরিকান কোম্পানি ফাইজার এর ভেতর বিশ্বব্যাপী ভ্যাকসিন সরবরাহ শুরু করেছে এবং এরই সঙ্গে আন্তর্জাতিক রাজনীতিও শুরু হয়ে গেছে।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, আগে যত ভ্যাকসিন আবিষ্কার ও প্রয়োগ এর বিষয় সামনে এসেছে সবসময় রাজনীতি ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের ভেতর দিয়েই যেতে হয়েছে। করোনা ভ্যাকসিন সামনে ব্যতিক্রম ঘটছে না। সকল ধরণের রাজনীতি, বৈশ্বিক যোগাযোগ, উন্নয়ন, কৌশল, ও বন্ধুরাষ্ট্র বিষয়গুলো নতুন করে যোগসূত্র বাঁধতে শুরু করেছে। অনেককাল আগে থেকেই ইতিহাসবিদ এবং নৃবিজ্ঞানীরা এই বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণা করে আসছেন এবং ‘দি পলিটিক্স অব ভ্যাকসিন: এ গ্লোবাল হিস্ট্রি’ গ্রন্থটিতে বৈশ্বিক রাজনীতি সম্পর্কে দারুণ ভালভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
গত শতক অনুসারে ভ্যাসিনের রাজনীতি পরিবর্তনের সঙ্গে এই শতকে পরিবর্ধন ঘটে। আগে টিকা রাজনীতির সাথে কলোনিয়াল রাজনীতি, জাতীয়তাবাদ, ডি-কলোনাইজেশন, কোল্ড ওয়ার, নব্য উদারনৈতিকতাবাদ বিষয়গুলো যুক্ত ছিল। তবে করোনার ভ্যাকসিন যুদ্ধে নতুন আরো কিছু বিষয় সামনে আসেছে নতুন মোড়কে, যেগুলো বাদ দিয়ে ভ্যাকসিনের রাজনীতি বোঝা যাবেনা। ইতিহাস অন্তত তাই বলে। পৃথিবীর উন্নত রাষ্ট্রগুলো তাদের উৎপাদিত ভ্যাকসিন সফল বলে প্রমাণ করার জন্য প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে যাচ্ছে; যেখানে ক্ষমতা ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে ঐ রাষ্ট্রগুলোর প্রভাব থেকেই যায়; কারণ এর মাধ্যমে রাজনৈতিক শক্তির ক্ষমতার বৈধতার বিষয়টি জড়িত।
যদিও আগের মত এখন হয়ত কলোনিয়াল সাম্রাজ্যবাদ নেই; কিন্তু নানা ধরনের প্রভাববাদ তো এখনও আছেই। আমেরিকা, চীন, রাশিয়াসহ অন্যান্য দেশ এই প্রতিযোগিতায় এখন লিপ্ত। এই মুহূর্তে ভ্যাকসিন রাজনীতি জমজমাট আকার ধারণ করেছে বিশ্বে। ইতিহাসের দিকে তাকারে দেখা যায় পৃথিবীর অধিকাংশ যুগান্তরকারী আবিষ্কার পশ্চিম বিশ্ব নেতৃত্ব দিয়েছে। সময় পরিবর্তনের সঙ্গে এখন উত্তরের-দক্ষিণ সমান তালে পাল্লা দিয়ে এগোচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের ভ্যাকসিনের সঙ্গে চীনের ভ্যকসিনের কথাও বেশ জোড়ালো আলোচনায় তুলছে। এদিক রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের টিকা আবিষ্কারের দাবি এই প্রতিযোগিতায় সামনের সারিতেই আছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে কেন্দ্র করে এখন আমেরিকা, চীন, রাশিয়া এবং অন্যান্য দেশ তাদের ক্ষমতা ধরে রাখার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে গেছে। নানা প্রকার অনৈতিকতা, গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ তো আছেই। করোনার আগে যে বৈশ্বিক ভাতৃত্ববোধ ছিল তা এখন অনেক যায়গায়ই অনুপস্থিত। কারণ সুপারপাওয়ার বা ক্ষমতাশালী দেশগুলো তাদের জন্য করোনা ভ্যাকসিনের আগাম চুক্তি করে রেখেছে। সেখানে আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশগুলোর কি হবে তা একটি ভাবার বিষয়।
বিশ্বের বিভিন্নি সুপারপাওয়ার বা ক্ষমতাশালী রাষ্ট্রগুলো তাদের উৎপাদিত ভ্যাকসিন সফল সেটি প্রমাণ করার জন্য ছোট ছোট রাষ্ট্রগুলোকেও সঙ্গে নিতে চাইচ্ছে; বাংলদেশ এখন এই রাজনীতির রোষাণলে পড়েছে। আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশের জন্য এটি একটি বড় সমস্যা। একদিকে আমাদের ভ্যাকসিন পাওয়ার চাহিদা এবং কোন ভ্যাকসিনটি আসলে বেশি কার্যকর-দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। সেই সাঙ্গে সেটিই বা আমরা কবে পাবো? আমার দেশের মানুষের টিকা দেয়ার উপর আস্থা তৈরিরও ব্যাপার আছে।
আমাদের দেশের উন্নয়নের বিষয়টিই একটি বড় প্যারাডাইম। দরিদ্র দেশগুলোর সাথে সুপারপাওয়ার বা ক্ষমতাশালী দেশগুলো টিকা ভাগাভাগিতে অংশ নিবে কিনা সেটিও প্রশ্নবিদ্ধ। আবার, বাংলাদেশ এখন দরিদ্র দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় নাম লিখিয়েছে; সেদিক বিবেচনায় বাংলাদেশের টিকা প্রাপ্তির সারির তালিকায় প্রথম দিককার সারিতে নেই এটিও অনেকটা নিশ্চিত বলা চলে।
অন্যদিকে আমাদের দেশের বেশিরভাগ উন্নয়ন পরিকল্পনা করা হয় টপ ডাউন এপ্রোচের উপর ভিত্তি করে। আমাদের খুব সতর্কতার সঙ্গে ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী রাষ্ট্রের সাথে যোগাযোগ করতে হবে যেন আমরা সহজেই ভ্যাকসিন পেতে পারি। কারণ আমাদের চিকিৎসা বাবস্থা এমনিতেই ভেঙ্গে পড়েছে; অর্থনীতি, রপ্তানি, এগুলো এত দীর্ঘসময় কার্যকরী রাখা অসম্ভব। আমাদের সংক্রমণ হারও পরিসংখ্যানিক ভাবে অনেক বেশি। ভ্যাকসিন ছাড়া হার্ড ইমিউনিটি সম্ভব নয়। আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও ভ্যাকসিন নেয়ার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলবে সঙ্গে আমাদের দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা, বৈদেশিক ঋণ সুবিধা প্রাপ্তিসহ নানা বিষয়গুলোও জড়িত আছে।

