শিশু-কিশোর পর্নোগ্রাফির ফাঁদ ও অবৈধ কারবার : অবক্ষয়ের অশনিসংকেত
শব্দনীল | উত্তরদক্ষিণ
মুদ্রিত সংস্করণ: রবিবার, ২৭ ডিসেম্বর, ২০২০ | আপডেট: ০০:০১
সামাজিক অবক্ষয় ও শিশু নির্যাতনের অপর নাম পর্নোগ্রাফি। এ অভিশাপে নতুন প্রজন্ম শারীরিক ও মানসিক বিকাশে প্রশ্নাতীত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সমাজের কিছু বিক্রিত মস্তিষ্কের মুনাফা লোভীর জন্য এর ভয়াবহতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই দুষ্টু চক্রের নেটওয়ার্ক বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত ও শক্তিশালী। বাংলাদেশেও তারা ডালপালা মেলেছে এই বিষয়ে সর্বশেষ তথ্য নিয়ে শব্দনীল’র বিশ্লেষণী প্রতিবেদন
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল সেন্টার ফর মিসিং অ্যান্ড এক্সপ্লয়টেড চিলড্রেন(এনসিএমইসি) ওয়েবসাইটে ২০১৯ সালের প্রকাশিত তথ্য অনুসারে শিশুদের নিয়ে যৌনদৃশ্য ধারণ, নিপীড়নের ছবি-ভিডিও এবং তা আদান- প্রদানের দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম। অন্যদিকে যৌনদৃশ্য ধারণ (শিশু পর্নোগ্রাফি) এবং তা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার পেছনে কারা জড়িত, সে বিষয়ে পুলিশের কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই।
শিশু পর্নোগ্রাফির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ঢাকার তিনটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষার্থীকে চলতি বছরের ১৫ অক্টোবর গ্রেপ্তার করে সিটিটিসির সাইবার অপরাধ বিভাগ। গ্রেপ্তার ওই তিনজন নিজেদের পরিচয় গোপন করে দেশি-বিদেশি শিশু, কিশোর-কিশোরী ও প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের সঙ্গে পরিচিত হতেন। পরে তাদের ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করে বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করতেন ওই তিন শিক্ষার্থী।
এই তিন ছাত্রকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের ১৪ বছরের এক কিশোরীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে। ওই কিশোরীর ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করে গ্রেপ্তার তিন যুবক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইনস্টাগ্রামের একটি গ্রুপে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। গ্রুপটিতে ওই কিশোরীর পরিবারের সদস্যরাও ছিলেন। অপরাধীদের মুঠোফোনের আইএমইআই নম্বর এবং কোন আইপি ব্যবহার করে তাঁরা অপরাধের সঙ্গে যুক্ত, সে তথ্যও কিশোরীটিই সিটিটিসির কর্মকর্তাদের দিয়েছিল।
বাংলাদেশের সাইবার অপরাধ তদন্তের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা বলেন, শিশু পর্নোগ্রাফি সংক্রান্ত বিষয়গুলো তদন্তের জন্য যে সক্ষমতা এবং অবকাঠামো প্রয়োজন, তার কোনোটাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নেই। উদাহরণ হিসেবে তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক শিশু পর্নোগ্রাফির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে টিপু কিবরিয়া নামের এক শিশুসাহিত্যিক ও আলোকচিত্রীসহ তিনজনকে ২০১৪ সালে গ্রেপ্তার করেছিল সিআইডি। সেটিও শনাক্ত হয়েছিল আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের তথ্যের ভিত্তিতে।
এনসিএমইসির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৯ সালে শিশু পর্নোগ্রাফি, শিশুদের যৌন নিপীড়নসংক্রান্ত ছবি ও ভিডিও ধারণ এবং আদান–প্রদানের সর্বোচ্চ ১৯ লাখ ৮৭ হাজার ৪৩০টি ঘটনা ঘটেছে ভারতে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা পাকিস্তানে ঘটেছে ১১ লাখ ৫৮ হাজার ৩৯০টি, তৃতীয় অবস্থানে থাকা ইরাকে ঘটেছে ১০ লাখ ২৬ হাজার ৮০৯টি, চতুর্থ অবস্থানে থাকা আলজেরিয়ায় ঘটেছে সাত লাখ ৫৩৫টি এবং পঞ্চম অবস্থানে থাকা বাংলাদেশে ঘটেছে পাঁচ লাখ ৫৬ হাজার ৬৪২টি।
ভাবুন তো আমরা কোথায় আছি, শিশু পর্নোগ্রাফির পঞ্চম স্থান অধিকারী একটি দেশে। যেখানে প্রশাসন জানে না কারা করছে এই ধরণের কাজ এবং কারা জড়িত আছে। কিন্তু একটু ভাবুন তো, কাকে দোষ দিবেন। সরকারকে না নিজেকে। দেখুন আপনার পরিবারের যে শিশুটি বড় হচ্ছে তাকে আপনি, আমি বা আমরা সঠিকভাবে লালনপাল বা পথ নির্দেশনা দিতে পারছি কি না? আমরা নিজেরা কি তাদেরকে সচেতন করতে পারছি?
আমি কিছুদিন আগে ইউএস ওমেন্সের একটি ক্যাম্পেইনে এটেন্ড করতে গিয়ে আমার সাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিছু সতর্ক বার্তা দিয়েছিলাম। যেখানে আমাদের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল, আপনার-আমার সন্তানকে সঠিক যৌনশিক্ষা দিন। যেখানে যৌনশিক্ষা একটি বিজ্ঞান। যা কেবল আমাদের দেশের মানুষেরাই মানবে না বা কাঠখোট্টা মনোভাব জাহির করে অটল থাকবে নিজের ভ্রান্ত ধারণার উপর। এখানে আমাদের কাছে ‘যৌন’ শব্দটাই-তো একটি গা রিরি করা শব্দ। এদেশের মানুষ কখনও বুঝবে না যৌন কাজ এবং যৌনশিক্ষা এক নয়।
আপনার বাচ্চাকে যখন আপনি সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত করবেন এবং তার অনুপাতে তার প্রতিটি প্রশ্নের সঠিক জবাব দিবেন তখন দেখবেন যেকোন অযাচিত ঘটনাগুলো সে এড়িয়ে চলা শিখা যাবে নিজের বুদ্ধি ও বিচক্ষণতার সঙ্গে। শিশু পর্নোগ্রাফির জন্য কাকে দায় করবেন, সরকারকে বা প্রশাসনকে, আপনি দায়ি করতে পারেন কিন্তু আমি দায়ি করবো আপনাকে-আমাকে এবং আপনার-আমার পরিবারকে। একজন শিশু প্রথম যৌন নির্যাতনের শিকার হয় তার নিকটতম পরিবারের সদস্যদের দ্বারা। যদি বিশ্বাস না হয় আপনার বাচ্চাকে অভয় দিয়ে জিজ্ঞেস করুন দেখবেন কোন না কোন অপ্রীতিকর ঘটনার সম্মুখীন সে ইতোমধ্যে হয়ে গিয়েছে।
আপনার শিশুকে শিখান, জানান কোনটি আপত্তিকর হাত, কোন স্পর্শ খারাপ। কোন শব্দগুলো শুনলে বা তাকে বলা হলে অবশ্যই তার পরিবারের যে সদস্যকে আপন মনে হবে তার গিয়ে নির্ভয়ে বলতে পারবে। এতে তাদের ভেতর সাহস তৈরি হবে। আমাদের ভেতর অনেকের প্রবনতা আছে, বাচ্চাদের যার তার কাছে দিয়ে দেওয়া। একটু সচেতন ভাবে লক্ষ রাখুন যাদের কাছে দিচ্ছেন তারা চকলেট, চিপস, খেলনা এনে দিয়ে বাচ্চাদের খুশি করার চেষ্টা করছে নাকি তারা আপনার বাচ্চার ক্ষতি করছে?
একজন অপরিচিত বা পরিচিত ব্যক্তি যেই হোক যখন কোন কাজ বারংবার করবে মনে রাখবেন, এখানে তার কোন স্বার্থ জড়িত আছে। বাচ্চা বা শিশুমনে আঘাত পেরে যে ট্রমা সৃষ্টি হয়, সে খান থেকে বের হতে অনেক সময় লাগে। মানুষিক চাপে শিশুর প্রচণ্ড ক্ষতি, যে ক্ষতি বড় হলেও ভুলতে পারে না। অবশ্যই আপনার-আমার-আমাদের সময়ের ভেতর সাবধান এবং সচেতন হতে হবে বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ সুন্দর করার জন্য। তা না হলে আমাদের আগামী প্রজšে§র কাছে নিজেদের জবাবদিহিতা করতে হতে পারে।

