ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে ভিডিও গেমস আসক্তি, পরিত্রাণের উপায় খোঁজা জরুরী

ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে ভিডিও গেমস আসক্তি, পরিত্রাণের উপায় খোঁজা জরুরী

সম্পাদকীয় | উত্তরদক্ষিণ
মুদ্রিত সংস্করণ | মঙ্গলবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০২০ | আপডেট: ০০:০১

বিশ্বজুড়ে ভিডিও গেমস একটা সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে৷ বড় হচ্ছে এর বাজারও। সেইসঙ্গে বেড়েছে সুযোগ ও আগ্রহের পরিধিও। এই গেমারদের বেশিরভাগই শিশু ও টিনএজার। তবে বড়রাও বাদ নেই এই তালিকা থেকে। বিশ্লেষকরা বলছেন, মাদকাসক্তির মতোই ক্ষতিকর এই গেমস আসক্তি। আর এ থেকে বের হতে হলে চিকিৎসাও দরকার হতে পারে।

বিশ্বের অনেক দেশেই বড় সমস্যা তৈরি করছে এটি। এর ফলে দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার একটা নতুন আইন করে যাতে ১৬ বছরের কমবয়সীদের মধ্যরাত থেকে ভোর ছয়টা পর্যন্ত অনলাইন গেমস খেলার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। জাপানে যারা খেলে তারা প্রতি মাসে একটা নির্দিষ্ট সময়ের বেশি খেললে তাদের সতর্কবার্তা পাঠানো হয়। চীনে টেনসেন্ট নামে বড় ইন্টারনেট কোম্পানি বাচ্চারা কত ঘন্টা ইন্টারনেটে তাদের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলাগুলো খেলবে তার সময়সীমা বেঁধে দেয়।

এদিকে করোনা প্রাদুর্ভাবের কারণে অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। করোনার এই বন্ধে শিক্ষার্থীদের অনলাইন ক্লাসে অংশ নিতে অনেক শিক্ষার্থীকেই তড়িঘড়ি করে ইন্টারনেট সুবিধাসহ স্মার্টফোন-ট্যাব বা ল্যাপটপের ব্যবস্থা করে দেয়া হয়েছে। এই সুবাদে অনলাইন ক্লাসের নামে বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই বুঁদ হয়ে আছে পাবজি, কল অফ ডিউটি, ফ্রি ফায়ার, প্রো ইভুলেশন সকার (পেইস)সহ অন্যান্য ভিডিও গেমিংয়ে কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। করোনাকালে দিনের বেশিরভাগ সময়ই শিক্ষার্থীরা এই গেমিংয়ের পেছনে ব্যয় করছে, বেড়েছে স্মার্টফোন ব্যবহারের হার।

বিকেল হলেই বিভিন্ন মাঠে, ঝুপড়ি দোকানে বসে তরুণ সব শিক্ষার্থীদের দলবদ্ধ হয়ে ইন্টারনেট দুনিয়ায় জনপ্রিয় এই গেম খেলতে দেখা যায়। গেম খেলার নেশায় এসব তরুণ শিক্ষার্থীর বেশিরভাগই খেলাধুলা করতে চায় না। অনেকে বন্ধুদের সঙ্গে মেশে না, রাত জেগে গেম খেলায় অনেকের সকালের খাবার খেতে হয় দুপুরে, অনলাইন গেম ছাড়া বাকি সব কিছুতেই অনীহা প্রকাশ করে এসব তরুণ শিক্ষার্থীরা।

অভিভাবকরা বলছেন, হঠাৎ করে করোনা পরিস্থিতির কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় বাচ্চারা আগের মতো পড়ালেখায় ব্যস্ত নেই। দিনের বেশিরভাগ সময় ঘরে অবস্থান করছে তারা, এছাড়া হাতের মুঠোয় স্মার্টফোন চলে আসায় দিন-রাত গেম খেলে তারা সময় কাটাচ্ছে, তৈরি হচ্ছে আসক্তি। অনলাইন ক্লাস এর কথা বলে তারা ক্লাস বাদ দিয়ে বন্ধুদের সাথে অনলাইনে চ্যাট ও গেমিংয়ে ঝুঁকছে। এমন পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের দিন যদি আরো দীর্ঘ হয় তাহলে শিক্ষার্থীরা মানসিকও শারিরীক দু’ভাবেই ক্ষতিগ্রস্থ হবে এবং তাদের ভবিষ্যত্ বাধাগ্রস্ত হবে। এই মুহুর্তে তাদের শাসন করাও কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ছে৷ জনপ্রিয় এসব গেম আবার আত্নহত্যারও কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, মহামারি কাটিয়ে দেশে যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলবে তখন শিক্ষার্থীদের গেমিংয়ের মাত্রাতিরিক্ত আসক্ত থেকে বের করে আনা অনেকটাই কষ্ট সাধ্য হয়ে পড়বে। অতিমাত্রায় স্মার্টফোন ব্যবহার পড়ুয়াদের মধ্যে পড়াশোনার ইচ্ছা কমিয়ে দিচ্ছে। এর ফলাফল হিসাবে শিক্ষাগত যোগ্যতার মানও খুব খারাপ। এছাড়া তৈরি হচ্ছে ঝরে পড়ার আশঙ্কা অন্যদিকে বাড়ছে নিঃসঙ্গতা, একাকীত্বের অনুভূতি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে অনলাইনে ক্লাসের নাম করে অনেক শিক্ষার্থী বেশী সময় নেটে অবস্থান করলেও অভিভাবকরা শিক্ষাজীবনের কথা ভেবে কোন রকম আপত্তি করতে পারছে না। এদিকে, নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের কোমলমতি অনেক শিক্ষার্থীরা হঠাত্ করে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পাওয়ায় কৌতুহলবশত বিভিন্ন সাইটে প্রবেশ করছে বা করার চেষ্টা করছে।

করোনা যেহেতু একটি বৈশ্বিক সমস্যা তাই এখন সরকার চাইলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে শিক্ষার্থীদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলতে পারে না। তবে শিক্ষার্থীরা যেন গেমিংয়ে আসক্ত হয়ে না পড়ে সেজন্য প্রত্যেক অভিভাবককে আরো দায়িত্বশীল হতে হবে এবং গেম খেললেও তা যেন মাত্রাতিরিক্ত না হয় সেদিকে খেয়াল করতে হবে। ব্রিটেনসহ কয়েকটি দেশ এ নিয়ে বিশেষ ক্লিনিক স্থাপনের পাশাপাশি পর্যাপ্ত মনিটরিং শুরু করলেও এক্ষেত্রে বাংলাদেশে তেমন কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলে নজরে আসেনি।

বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে অনলাইনে ক্লাসের ব্যবস্থা যেমন করা হয়েছে, ডিজিটাইলাইজেশনে দেশ এগিয়েছে আরও এক ধাপ। তেমনি ডিজিটালভাবেই হোক বা অন্য যেকোনোভাবে এই গেমিং আসক্তি থেকে মুক্ত করা বা গেমিং নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় কিনা সেটা নিয়ে ভাবা জরুরী হয়ে পড়েছে।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading