বেশিরভাগ পরিবার ‘ছেলের বউ’ চায় না, চায় ‘বাধ্যগত দাসী’

বেশিরভাগ পরিবার ‘ছেলের বউ’ চায় না, চায় ‘বাধ্যগত দাসী’

উপসম্পাদকীয় | উত্তরদক্ষিণ
মুদ্রিত সংস্করণ | মঙ্গলবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০২০ | আপডেট: ০০:০১

ফারজানা আক্তার :: ‘মেয়ে ঠিক আছে কিন্তু বয়সটা একটু বেশি! আমরা আরেকটু কম বয়সী মেয়ে খুঁজছি।’ পাত্রপক্ষের এমন কথা শুনে মনে হয়, তারা কম বয়সী মেয়ে বিয়ে করিয়ে তাদের বাসায় নিয়ে লালন পালন করে মানুষ করবে।

পাত্রীর গায়ের রং ধবধবে সাদা হবে, লম্বা হতে হবে, চুল ঘন, কালো, বড় হবে, স্বাস্থ্য বেশি মোটা বা চিকন হতে পারবে না। ঘরের সকল কাজ জানতে হবে, সকলকে মানিয়ে চলার ক্ষমতা থাকতে হবে, সকল বিষয়ে চুপ থাকতে হবে, একটু আরটু পড়াশোনা জানলে ক্ষতি নেই তবে বয়সটা কচি হতে হবে।

পাত্রীর বয়স কম হতে হবে তবে সংসারটা পাক্কা গৃহিনীর মতো সামলাতে হবে। শ্বশুরবাড়ির সকলের মন যুগিয়ে চলার জন্য যা যা করার দরকার সব করতে হবে। পাত্রী পড়াশোনা কম জানুক সমস্যা নেই, তবে মূর্খের মতো কথা বা আচরণ করতে পারবে না।’

বেশি পড়াশোনা জানা মেয়ে মানুষ বেশি বুঝে! আর, কম পড়াশোনা জানা মেয়ে মানুষ মূর্খের মতো কথা বললে বা আচরণ করলে সকলের সামনে লজ্জায় পাত্র পক্ষের মাথা কাটা যাবে।

একজন মেয়ে মানুষ হয়ে এই সংসারে জন্ম নেওয়ার কত জ্বালা সেটা শুধুমাত্র একজন মেয়ে মানুষই জানে। অথচ বিয়ের বাজারে পাত্রপক্ষের চাহিদা এমনই। সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে নানান ধরণের পরিবর্তন এসেছে। সকল পরিবর্তনকে হোক সেটা ভালো, মন্দ আমরা সাদরে গ্রহণ করছি। কিন্তু আমাদের সমাজে বিয়ের বাজারে পাত্রী খোঁজার নিয়মের কোন পরিবর্তন হয়নি। উল্টো আরো কিছু অসামাজিক চাহিদা যুক্ত হয়েছে।

অনেক মেয়ে যোগ্যতার দিক থেকে অনেক এগিয়ে গেছে। পড়াশোনা, ভালো ফলাফল, ভালো চাকরিও পেয়ে গেছে। নিজের ক্যারিয়ার ঠিক করে যখন বিয়ের প্রস্তুতি নেয় তখন পাত্রপক্ষের একটাই সমস্যা- ‘মেয়ের বয়স বেশি!’

মেয়ের বাবা-মায়েরা এখন এই বিষয়ে খুব আতংকিত। তারা তাদের মেয়েকে পড়াশোনা শেষ না করিয়ে বিয়ে দেওয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন। বা পড়াশোনার মাঝখানে মেয়ের বিয়ের দেওয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগে যায়।

আন্দোলন করে যে বাল্যবিবাহ বন্ধ করা হয়েছিলো, ঘুরেফিরে সেই বাল্যবিবাহের প্রচলন আবার শুরু হয়ে যাচ্ছে। অনেক অঞ্চলে বাল্যবিবাহ অবশ্য বন্ধই হয়নি।

তবে মাঝের সময়ে বাবা মায়েরা যথেষ্ট সচেতন ছিলেন। মেয়েকে তার ইচ্ছেমতো পড়শোনা করার বা বিয়ে নিয়ে চিন্তা করার সময় দিয়েছেন। পরবর্তীতে পাত্রপক্ষের ‘মেয়ের বয়স বেশি!’ কথার তালে তালে মেয়েদের বাবা মায়ের সচেতনতা লোপ পাচ্ছে।

একটি পরিবারে শিক্ষিত, অভিজ্ঞ এবং স্বাবলম্বী ব্যক্তি হচ্ছে সেই পরিবারের সবথেকে বড় শক্তি। শিক্ষিত হয়ে লাভ নেই যদি না সেই শিক্ষা আপনার, আপনার পরিবারের বা সমাজের কোন কাজে আসে।

দেখা যায় পাত্রের বাবা, মা, পাত্র উচ্চশিক্ষিত। কিন্তু পাত্রী চাচ্ছে স্বল্পশিক্ষিত। কারণ তারা মনে করেন কম পড়াশোনা জানা মেয়েকে তারা বাধ্যগত করে রাখতে পারবেন। সেই মেয়ের উপর তাদের সকল চাওয়া পাওয়া চাপিয়ে দিতে পারবেন। বেশিরভাগ পরিবার ‘ছেলের বউ’ চায় না, চায় ‘বাধ্যগত দাসী’।

যাদের দৃষ্টিভঙ্গি এতো নিচ তাদের শিক্ষার কি কোন দাম আছে? আপনি বিশ্বাস করুন বা না করুন আমাদের সমাজে এমন মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি। যে দেশের বেশিরভাগ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি এমন, সেই দেশের অগ্রগতি আপনি কতটুকু আশা করেন ?

দেশের উন্নতি, সভ্যতার উন্নতি, সমাজের উন্নতি নিয়ে ভাবার থেকে আমরা বেশি ব্যস্ত মেয়েটা সুন্দরী কিনা! বয়সটা কত! আগে প্রেম করেছে কিনা! আগে বিয়ে হয়েছে কিনা! এই মেয়ের বন্ধুর সংখ্যা কত! সবার সাথে হেসে কথা বলে কিনা! কয়টায় বাসা থেকে বের হয়, কয়টায় বাসায় ফিরে! রান্নাটা জানে কিনা! মুরগিটা কাটতে পারলো কিনা! মাছের টুকরার সাইজ ঠিক থাকে কিনা!

পাত্রপক্ষ এতকিছু খুঁজে, পাত্রীপক্ষ এতকিছু ঠিকঠাক রাখার চেষ্টা করে। একপক্ষ মানসিক চাপ দেয়, অন্যপক্ষ মানসিক চাপ নেয়। মাঝখানে দেশ, সমাজ আর সভ্যতার উন্নয়ন চ্যাপ্টা হয়ে যায়।

তারপর আমরা অন্য দেশের দিকে তাকিয়ে থাকি। কখন তারা কি আবিষ্কার করবে আর আমরা হাত পেতে চেয়ে নিবো। আর ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিবো ‘কংগ্রাচুলেশনস আমেরিকা! কংগ্রাচুলেশনস ইন্ডিয়া! কংগ্রাচুলেশনস চায়না…’ এবং টু বি কন্টিনিউড। লেখক: এক্সিকিউটিভ সেক্রেটারি, ওমেন’স কর্নার।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading