গভীর হচ্ছে নেপালের রাজনৈতিক সঙ্কট!

গভীর হচ্ছে নেপালের রাজনৈতিক সঙ্কট!

উপসম্পাদকীয় | উত্তরদক্ষিণ
মুদ্রিত সংস্করণ: রবিবার, ০৩ জানুয়ারি, ২০২১ | আপডেট: ০০:০১

সালমা আলী :: নেপাল ১৯৯৬ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত মাওবাদী ও রাজতন্ত্রের মধ্যকার দন্দ্বে বিদীর্ণ হয়েছে। আমেরিকার মধ্যস্থতায় ২০০৫ সালে মাওবাদী ও গণতান্ত্রিক দেশগুলো সংবিধান সভা গঠনে একমত হলে সেখানে শান্তি আসে । ‘জনগণের আন্দোলনে’ রাজা জ্ঞানেন্দ্র রাজত্ব ছাড়ার দুই বছর পর নেপালে প্রথম নির্বাচন হয় ২০০৮ সালে। নির্বাচনে মাওবাদীরা বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। প্রজাতন্ত্র আসার পরেও দেশটিতে সংবিধান তৈরিতে সময় লাগে আট বছর। এরপরও অস্থিরতা তৈরি হয় বারবার।

নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি কমিউনিস্ট পার্টিতে ক্ষমতার অন্তর্দন্দ্বের জেরে প্রেসিডেন্টের কাছে সংসদ ভেঙে দিয়ে নতুন নির্বাচনের সুপারিশ করেন। প্রেসিডেন্ট বিদ্যাদেবী ভান্ডারি কালবিলম্ব না করে সেই প্রস্তাব অনুমোদন করেছেন।

ক্ষমতা দখলকে কেন্দ্র করে ওলি ও প্রচন্ডের বিবাদ ক্রমশই বাড়ছিল। এর আগে ওলির ২৫ সদস্যের মন্ত্রিসভা থেকে মাওবাদী সমর্থক ৭ মন্ত্রী একযোগে পদত্যাগ করেন। তারা নেপালি কংগ্রেসের সাথে মিলে নতুন কোয়ালিশন গঠনের দিকে যাচ্ছিলেন বলে মনে করা হয়।

ইন্ডিয়ান সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাদের ঘন ঘন কাঠমান্ডু সফরে মনে হচ্ছিল সেখানে রাজনৈতিক অভ্যুত্থান আসন্ন। চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সফরের পর অস্থিরতা আরো বেড়ে যায়। আর এখন রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ঘিরে ধরেছে নেপালকে।

দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে প্রধানমন্ত্রী ওলিকে। সে সিদ্ধান্তকে অবৈধ বলে নাকচ করে দিয়েছেন ওলি। সংসদ ভাঙার পরদিনই প্রেসিডেন্টের সংসদ ভেঙে দেয়ার আদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে নেপাল সুপ্রিম কোর্টে।

বিরোধী পক্ষ বলছে, সংসদ ভাঙার এই আদেশে সংবিধান মানা হয়নি। সংসদ বহাল রেখে সরকার গঠনের অবকাশ নিঃশেষ হয়ে গেলে সংসদ বাতিল করা যেতে পারে বলে তারা মনে করেন।

অন্যদিকে ওলির সমর্থকরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশে সংসদ বাতিলের এখতিয়ার সংবিধানে প্রেসিডেন্টকে দেয়া হয়েছে।

সংবিধানের ব্যাখ্যা দেয়ার চূড়ান্ত এখতিয়ার সুপ্রিম কোর্টের। পৌনে তিন কোটি মানুষের দরিদ্র দেশ নেপাল এখনো মহামারী নিয়ে লড়াই করছে। নেপালের অভিবাসী কর্মীরা বিশ্বের অনেক জায়গায় বেকার হয়ে পড়েছেন। এই চাপ মোকাবেলায় চীন নেপালিদের ইউনানে কাজ করার বিশেষ অনুমতি দিয়েছে। ভারতের সাথে সম্পর্কের টানাপড়েনের ক্ষতি পুষিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছে বেইজিং।

কে পি ওলির সরকারের প্রতি চীনের সমর্থনে কোনো রাখঢাক নেই। বৈদেশিক বাণিজ্যের জন্য এককভাবে ইন্ডিয়ার ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে চীন। চীন-নেপাল সংক্ষিপ্ত রুটে বহুপক্ষীয় যোগাযোগের জন্য নানা প্রকল্পের কাজ চলছে। চীন-নেপাল সহযোগিতার সম্পর্ক সামনে কতটা অব্যাহত থাকবে এ নিয়ে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে নতুন রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে।

২০২১ সালের এপ্রিল-মে মাসে নেপালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক বা না হোক উভয় ক্ষেত্রে পরিস্থিতি চীনপন্থী প্রধানমন্ত্রী কে পি ওলির বিপরীতে যাবে বলে মনে হচ্ছে।

ওলি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই জানতেন, তিনি নেপালের প্রধানমন্ত্রী থাকুন তা দিল্লি চায় না। এ কারণে তিনি ভারসাম্য বজায় রাখার পরিবর্তে চীনের সাথে সম্পর্ক সুদৃঢ় করতে সম্ভব সব পদক্ষেপ নেন। এতে ক্ষুব্ধ হয় ইন্ডিয়া।

ফলে ইন্ডিয়া নেপালের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সামাজিক ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারের সব উপায় উপকরণ সক্রিয় করে তোলে। এই কার্যক্রমে সরকারের পাশাপাশি ইন্ডিয়ার সেনাবাহিনীও যুক্ত হয়।

দক্ষিণ এশিয়ায় চীন ও ইন্ডিয়ার প্রভাব বিস্তারের কৌশলগত ধরনে ভিন্নতা রয়েছে। ইন্ডিয়া একই সাথে রাজনীতি, অর্থনীতি সমাজ-সংস্কৃতি এবং ক্ষেত্রবিশেষে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিজস্ব নেটওয়ার্ক তৈরি করে। অন্যদিকে চীনের প্রভাব বিস্তারের মুখ্য কৌশল হলো সরকার বা রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক তৈরি এবং আর্থিক বা বিনিয়োগসহায়তা দেয়া। এক সময় দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক মিত্র তৈরির যে কৌশল চীনের ছিল তা দেং শিয়াও পিংয়ের সময় এসে বেশ খানিকটা গৌণ হয়ে যায় আর শি জিনপিংয়ের সময় তা এক রকম হারিয়ে যায়।

নেপালে রাজনৈতিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন ও ভূমিকা রাখার ক্ষেত্রে চীন একই ধরনের ভুল করেছে বলে বেইজিংয়ের নীতিপর্যবেক্ষকদের ধারণা। এই ভুল পদক্ষেপের ফলে মাওবাদীরাই দিল্লির পক্ষে রাজনৈতিক মেরুকরণে প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

বলার অপেক্ষা রাখে না, ২০২১ সাল হতে যাচ্ছে বিশ্ব পরিস্থিতির জন্য খুবই জটিল একটি সময়। নতুন বছর আসার আগেই সঙ্ঘাতের বাজনা বেজে উঠছে। লেখক: সংবাদকর্মী

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading