তুরস্কে নিষেধাজ্ঞা এবং বিশ্ব রাজনীতির নতুন মেরুকরণ

তুরস্কে নিষেধাজ্ঞা এবং বিশ্ব রাজনীতির নতুন মেরুকরণ

উপসম্পাদকীয় | উত্তরদক্ষিণ
মুদ্রিত সংস্করণ: সোমবার, ১১ জানুয়ারি, ২০২১ | আপডেট: ০০:০১

জারিফ রহমান :: চলমান মহামারী পরিস্থিতির মধ্যেও বিশ্বজুড়ে সামরিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে চলেছে। যদিও প্রায় তিন দশক আগেই এই পরিবর্তনের শুরু। তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়া আর আমেরিকার একমাত্র পরাশক্তি হিসেবে উত্থান ঘটা যেন পরিবর্তনের ভিত্তি ছিল। এরপর সোভিয়েত থেকে রাশিয়া আর এশিয়ার চীন বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন মোড় ঘটায়।

আমেরিকার সঙ্গে সকল দিক দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো উত্থান ঘটে দেশ দুটোর। এরপর থেকেই দেশগুলো বিভিন্ন দেশের সাথে যুদ্ধে জড়াচ্ছে অথবা অন্যান্য দেশকে সামরিক সহায়তা দিচ্ছে। আমেরিকাকে ‘বিশ্বমোড়ল’ বলা হলেও চীন-রাশিয়াও এর থেকে কোনও অংশে কম নয়।

এর মধ্যে বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন রূপে উত্থান হয়েছে এক মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের রাষ্ট্রের। যারা ইতিমধ্যে বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধেও জড়িয়ে পড়েছে। পাশাপাশি অনেক দেশে রয়েছে তাদের সামরিক ঘাঁটি। সামপ্রতিক বিশ্বের একটি অন্যতম আলোচিত বিষয় হচ্ছে দেশটির সামরিক ও রাজনৈতিক উত্থান। বছিলাম তুরস্কের কথা। দেশটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর তাঁর হাত ধরেই দেশটির এই উত্থান। তুরস্কের নতুন সকল নীতি ও পরিকল্পনা এরদোয়ানের মস্তিষ্কপ্রসূত। গত দুই দশকে তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন বাঁক বেশ লক্ষণীয়। এতদিন পশ্চিমাদেরই অনুসরণ করেছে তুরস্ক। কিন্তু এরদোয়ান ক্ষমতায় এসে দেশটির পররাষ্ট্রনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে।

আমেরিকার পরই ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক শক্তি হওয়া স্বত্বেও তুরস্ক এখন আর পুরোপুরি পশ্চিমা বা ন্যাটোনির্ভর নীতি অবলম্বন করছে না। আমেরিকার ছায়ার বাইরে গিয়ে নিজের অবস্থান জানান দেওয়ার চেষ্টা করছে। নতুন প্রযুক্তির সামরিক যন্ত্রপাতি উত্পাদন থেকে শুরু করে এরদোয়ানের নেতৃত্বে একটি বলিষ্ঠ পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করেছে তুরস্ক। এছাড়াও সিরিয়া, ইরাক, পূর্ব ভূমধ্যসাগর, লিবিয়া ও আজারবাইজানে তুর্কি সামরিক হস্তক্ষেপ যেন বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন আলোড়ন তৈরি করেছে।

প্রতিরক্ষা শিল্পে খুব দ্রুত বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করছে তুরস্ক। দেশটির অনেক কর্মকাণ্ড ক্ষেপিয়ে তুলছে পশ্চিমাদের। ইতিমধ্যে তুরস্কের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে আমেরিকা। এছাড়াও দেশটির ওপর নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)।

ইইউ’র হুমকির নেপথ্যে গ্রিসের সঙ্গে বিরোধ ও জ্বালানিসম্পদ ও সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ থাকলেও আমেরিকার ক্ষেত্রে এর কারণ সবচেয়ে ভিন্ন। আমেরিকা নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার নেপথ্যে উল্লেখ করেছে, ন্যাটোর সদস্য হয়েও রাশিয়ার সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তি। কিছুদিন আগে ক্ষেপণাস্ত্র ক্রয়ের চুক্তি। সম্প্রতি গ্যাস পাইপলাইনের চুক্তিও এর অন্যতম কারণ। বিশেষ করে গ্যাস পাইপলাইনের চুক্তির ফলে ইউরোপের কাছে তুরস্কের দাম আরও বেড়ে যাবে। তবে ইইউ অনেক ক্ষেত্রেই তুরস্কের ওপর নির্ভরশীল দেশটির ভৌগলিক অবস্থানের কারণে। যার ফলে সংগঠনটি তুরস্কের ওপর নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রে দ্বিতীয়বার ভাববে!

তবে মজার বিষয় এই যে আমেরিকার এমন নিষেধাজ্ঞার পরও তুরস্কের সুর নমনীয় হয়নি। বরং তুরস্কের প্রেসিডেন্ট তাঁর তোয়াক্কা না করেই উল্টো নিন্দা করেছেন। এ ব্যাপারে অনেকেই বলে থাকেন, নব্য অটোমান সাম্রাজ্যের মতো নতুন সুলতান হওয়ার স্বপ্নে বিভোর এরদোয়ান।

তবে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, তুরস্কের প্রতিরক্ষা খাতের মতো এত বড় একটা অংশে আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার পরও দেশটির ‘ডোন্ট কেয়ার’ মনোভাবের কারণ কী? তবে কি ভিন্ন কোনও পরিকল্পনায় এগোচ্ছে তুরস্ক, নাকি প্রতিরক্ষা খাতে নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি আগেই আন্দাজ করতে পেরেছিল দেশটি।

এদিকে ইরানও দীর্ঘ সময় ধরে আমেরিকার অবরোধের মুখে আছে। ধারণা করা হচ্ছে, আমেরিকার এমন সিদ্ধান্তের কারণে তুরস্ক হয়তো রাশিয়া, চীন, পাকিস্তান ও ইরানকে নিয়ে একটি জোট গড়ে তুলতে পারে। এছাড়াও মার্কিনবিরোধী সব মহল বিশেষ করে আফগান তালিবান, তুরস্ক, ইরান, ইরাক, রাশিয়া, চীন এবং পাকিস্তান- সবগুলো দেশ এক কাতারে চলে আসবে।

মনে হচ্ছে, পৃথিবীতে দুইটি জোট স্পষ্ট হয়ে উঠবে। একদিকে সবগুলো আরব দেশ, ইসরাইল ও ইন্ডিয়া সংযুক্ত থাকবে। তবে সৌদি বাদশাহ সালমান কাতারকেও এই ব্লকে নিয়ে আসার চেষ্টা করতে পারেন। কারণ তারা এখন কাতারের সঙ্গে পুনঃসম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অনেক নমনীয়।

এমনিতেও অনেকদিন ধরে ফ্রান্স, গ্রিস ও আরো বেশ কয়েকটি আরব দেশের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্কে টানাপড়েন যাচ্ছে। আজারবাইজানে নাগারনো-কারাবাখের যুদ্ধকে কেন্দ্র করেও বিশ্বে আরেক দফা মেরুকরণ হয়ে গেছে। লেখক: সাংবাদিক

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading