অনলাইন কেনাকাটায় প্রতারণা: হুমকির মুখে ডিজিটাল বাজারব্যবস্থা

অনলাইন কেনাকাটায় প্রতারণা: হুমকির মুখে ডিজিটাল বাজারব্যবস্থা

সম্পাদকীয় | উত্তরদক্ষিণ
মুদ্রিত সংস্করণ: সোমবার, ১১ জানুয়ারি, ২০২১ | আপডেট: ০০:০১

বিশ্বজুড়ে প্রথম যখন অনলাইনে পণ্য বেচাকেনার সুযোগ তৈরি হয়, তখন অনেকে এটিকে তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের চাবিকাঠি ভেবে পুলকিত হয়েছিল। এই অনেকের অধিকাংশই যে বেকার বা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী নয়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কোনোরকম খরচ ছাড়াই পণ্য কেনাবেচার পরিবেশই মূলত তাদের এই প্লাটফর্মের প্রতি আগ্রহী করে তুলেছিল। ফলে বাড়তি আয়ের এই সুযোগ লুফে নিতে তারা দেরি করেনি। অন্যদিকে ঘরে বসে পছন্দসই পণ্য কেনার সুযোগ পেয়ে ক্রেতারাও বেশ খুশি হয়। নিজের পছন্দের জিনিসপত্র কিনতে তাদেরকে আর বাড়তি টাকা খরচ করে যেতে হয় না কোনো শপিংমল বা বাজারে। পছন্দের জিনিস এক ক্লিকেই ঘরে। ফলস্বরূপ একটা সময় প্রযুক্তির কল্যাণে বদলে যেতে থাকে অনেক তরুণ উদ্যোক্তার ভাগ্য, অনলাইন প্লাটফর্মকে কেন্দ্র করে তৈরি হতে থাকে কর্মসংস্থান।

এদিকে ই-কমার্সের প্রতি মানুষের নির্ভরতার সুযোগ নিয়ে কিছু অসত্ চক্র গ্রাহকদের সঙ্গে করছে প্রতারণা। তারা অনলাইন মার্কেটিংয়ের জগত্জুড়ে বিছাতে থাকে প্রতারণার জাল। তাদের ফাঁদে পড়ে প্রতারিত হন অনেকে। তাদের প্রতারণার রয়েছে নানা অভিনব পদ্ধতি। কখনো ক্রেতাকে এক ধরনের পণ্য দেখিয়ে অন্য পণ্য কিংবা আসল পণ্যের মোড়কে নকল পণ্য সরবরাহ, কখনোবা পরিমাণে কম দেয়া, আবার কখনো আগাম অর্থ নিয়ে উধাও হয়ে যাওয়া, এসব তাদের নিত্যনৈমিত্তিক কাজ। এভাবেই সাধারণ মানুষকে সর্বস্বান্ত করতে থাকে তারা। অনলাইনে চটকদার বিজ্ঞাপন আর লোভনীয় অফার দেখে অনেক মানুষ পণ্য কিনে নানাভাবে প্রতারণার শিকার হন। লক্ষণীয়, তারা কোনো নির্দিষ্ট পন্থা অবলম্বন করেই থেমে থাকে না। প্রতিনিয়ত তাদের প্রতারণার কৌশল করতে থাকে পরিবর্তন।

বিশেষ করে চাহিদা অনুযায়ী কাঙি্ক্ষত পণ্য সরবরাহ না করা এবং করলেও নিম্নমানের পণ্য সরবরাহ করার ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটে চলছে। করোনাকালে এই প্রতারণা আরও বেড়ে গেছে। লকডাউনে গৃহবন্দি মানুষের পক্ষে প্রয়োজনীয় বা পছন্দের পণ্যটি যখন মার্কেটে গিয়ে কেনা সম্ভব হচ্ছে না, তখন তিনি তার অর্ডার করছেন অনলাইনে। কিন্তু যে পণ্যটি অর্ডার করা হচ্ছে, প্রতারকরা সেটি না দিয়ে দিচ্ছে নিম্নমানের বা অর্ডারের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন আরেকটি পণ্য।

বর্তমানে ফেসবুকে বিভিন্ন পেইজ বা গ্রুপের মাধ্যমেও কেনাকাটা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। অনেকেই ব্যক্তি উদ্যোগে পেইজ খুলে অনলাইনে ব্যবসা শুরু করে দিয়েছেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য সাইট কোনটি তা বোঝা কঠিন। অনেকে বিক্রির নামে প্রতারণা করায় এর প্রভাব পড়ছে দেশের ই-কমার্সের ওপর, যা ডিজিটাল বাজারব্যবস্থার প্রসার তথা ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথে অন্তরায়। আস্থার জায়গা হারিয়ে মুখথুবড়ে পড়ছে অনলাইন মার্কেটিং। বলা যায়, এক শ্রেণির অসাধু প্রতারকচক্রের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে ই-কমার্স খাত। আর তাদের কারণে আস্থা হারাচ্ছে অসংখ্য সত্ উদ্যোক্তা। ফলে ই-কমার্স জগতে সদ্য তৈরি হওয়া অবস্থান হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে অসংখ্য তরুণ।

অনলাইন পণ্য কিনে প্রতারিত হলে নির্দিষ্ট প্রমাণ সাপেক্ষে দেশের ভোক্তা অধিকার আইনে অভিযোগ করা যেতে পারে। কিন্তু প্রচার না থাকার কারণে সে আইনের প্রক্রিয়া ও নিয়ম-কানুন বেশিরভাগ মানুষের অজানা। তাছাড়া প্রতিষ্ঠান, ভেরিফাইড পেইজ, মানুষের রিভিউ দেখে নিজের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে সব বিচার-বিশ্লেষণ করে তারপর পণ্য অর্ডার করলে হয়তো প্রতারণা থেকে রক্ষা পাওয়া যেতে পারে। তাই এ ব্যাপারে সচেতনতা বাড়াতে, ভোক্তা অধিকার আইন বিষয়ে প্রচার বাড়াতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

যে প্রযুক্তির উত্কর্ষে পাল্টে গেছে পৃথিবী। অপব্যবহারে সেটাই কখনও কখনও হয়ে ওঠে গলার কাঁটা। এই কাঁটা সরাতে দরকার প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধ করা। যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অনলাইনে পণ্য বেচা-কেনায় প্রতারণার আশ্রয় নিচ্ছে, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তাদের চিহ্নিত করে দেশের প্রচলিত আইনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা নেয়া দরকার। যাতে করে অনলাইন কেনাকাটায় মানুষের আস্থা ফিরে আসে।

হাজারো উদ্যোক্তার কর্মস্থল অনলাইন মার্কেট তথা ই-কমার্সের জগেক নিরাপদ রাখতে চাইলে কর্তৃপক্ষকে এখনই মাঠে নামতে হবে, বাড়াতে হবে নজরদারি। পাশাপাশি ই-কর্মাস খাতে প্রণয়ন করতে হবে যুগোপযোগী নীতিমালা ও আইন এবং এর সুষ্ঠু প্রয়োগের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে এ জগতের নিরাপত্তা। তবেই এদেশের তরুণরা পারবে নিজেদের মতো করে বাঁচতে, নিরাপদ হবে দেশের ডিজিটাল বাজার ব্যবস্থা।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading