‘ভালো’ পুঁজিবাজার, তবুও শংকা কাটছে না!

‘ভালো’ পুঁজিবাজার, তবুও শংকা কাটছে না!

মুদ্রিত সংস্করণ | উত্তরদক্ষিণ
রবিবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০২১ | আপডেট: ০০:০১

দেশের শেয়ার মার্কেটের সামগ্রিক পরিস্থিতি ‘ভালোর দিকে’ ও গতিশীল হলেও মাঝেমধ্যে হোঁচট খাচ্ছে। পুঁজিবাজারের সাম্প্রতিক প্রবণতা নিয়ে শেখফারুকের পর্যালোচনা প্রতিবেদন

করোনা মহামারিসহ নানামুখি প্রতিকুল পরিস্থিতি মোকাবেলা করে দেশের পুঁজিবাজার যথেষ্ট গতিশীল। ঢাকা ও চট্টগ্রামের দুটি স্টক এক্সচেঞ্জের লেনদেন বেড়েছে। মাঝেমধ্যে ধাক্কা খেলেও সাম্প্রতিক সূচক উর্ধ্বমুখী। বিশ্বজুড়ে করোনা (কোভিড ১৯) ভাইরাস মহামারীর আঘাতে অর্থনীতিসহ সকল ক্ষেত্রে বিপর্যয় নেমে এসেছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। মধ্যেও বিদায়ী বছরে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার আগের চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে বলে মনে করছেন মার্কেট সংশ্লিষ্টরা। তারপরেও মার্কেট নিয়ে শংকা যেন কাটছে না। মাঝেমধ্যে হোঁচট খাচ্ছে। কারণে-অকারণে অস্বাভাবিকভাবে উত্থানের পাশাপাশি পতনও হচ্ছে। একটার সঙ্গে অন্যটার হিসাব মেলানো দুরূহ হয়ে যায়। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশার আলো জ্বলে উঠতে না-উঠতে আবার হতাশা গ্রাস করে।
একটু পিছনে ফিরে তাকালে দেখা যায়, করোনার কারণে গত বছর কয়েক মাস অফিস, শেয়ার মার্কেট, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প-কারখানার উত্পাদন কর্মকাণ্ড প্রায় বন্ধ ছিল। গত অর্থবছর শেষে বাংলাদেশের মোট দেশজ উত্পাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমে ৫ দশমিক ২৪ শতাংশে নেমে এসেছে। এ অবস্থা পৃথিবীর সব দেশেই ঘটেছে। তারপরেও বিস্ময়করভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতি যে ভাবে করোনার ধকল কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। একই কথা দেশের পুঁজিবাজারের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। এ কথা আজ দেশে-বিদেশে স্বীকৃত।
গত বছরের শুরুতে পুঁজিবাজার একটি সংঘবদ্ধ চক্রের ষড়যন্ত্রের শিকারে পরিনত হয়। এর সঙ্গে পরে যুক্ত হয় করোনা আতঙ্ক। এই দু’য়ে মিলে শেয়ার মার্কেট যখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে, তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তড়িত সিদ্ধান্তের পুঁজিবাজার রক্ষা পায়।
পুঁজিবাজারের এই উত্থানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা অনিস্বীকার্য। বিশেষভাবে ফ্লোর-প্রাইস নির্ধারণ ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) পুনর্গঠন। প্রধানমন্ত্রীর যুগান্তরকারী ওই দু’সিদ্ধান্তে পুজিবাজার বলিয়ান হয়ে উঠেছে। বিশেষভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্সুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামকে চার বছরের জন্য বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী পুঁজিবাজারে একজন দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিকে নিয়োগ দিয়েছেন।
অধ্যাপক শিবলীর নেতৃত্বে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) অনেক সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছেন। মূলতঃ এই কমিশনের মাধ্যমে শেয়ার মার্কেট নতুন গতি পেয়েছে।
প্রায় ধ্বংসস্তুপ থেকে মার্কেট ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ২০১৯ সালের শেষ দিন দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই)’র মূল সূচক ডিএসইএক্স ছিল ৪ হাজার ৪৫৩ পয়েন্ট। গত ডিসেম্বর (২০২০ সাল) তা বেড়ে ৫ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমানে লেনদেন হচ্ছে দু’ হাজার কোটি টাকার ঘরে।
বিদায়ী বছরের শেষপর্বের ধারাবাহিকতায় নতুন বছরে (২০২১ সালে) পুঁজিবাজারের সেই তেজিভাব আরও বেড়েছে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার (১৪ জানুয়ারী) পুঁজিবাজারে মূল্যসূচকের বড় উল্লম্ফন ঘটেছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ২ দশমিক ৪১ শতাংশ বেড়েছে। দিনশেষে ডিএসইএক্সের অবস্থান দাঁড়ায় ৫ হাজার ৯০৯ দশমিক ৩০ পয়েন্ট।
ডিএসইতে কেনাবেচা হয়েছে ২ হাজার ৭০ কোটি ৮৫ লাখ টাকা মূল্যের শেয়ার। বাজারে ৩৬২টি কোম্পানির শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট কেনাবেচা হয়, এর মধ্যে ১৫৯টির দাম বেড়েছে, কমেছে ১৩৩টির দাম। আর ৭০টির দাম ছিল অপরিবর্তিত।

ডিএস৩০ সূচকের বড় উল্লম্ফনে ডিএসইর বাজারমূলধনে বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৬ শতাংশ বা ৩১ হাজার ৪৩৯ কোটি টাকা বেড়ে ৫ লাখ ১ হাজার ৭০৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এর মধ্য দিয়ে নতুন রেকর্ড বা মাইল ফলক স্পর্শ করল দেশের প্রধান এক্সচেঞ্জ ডিএসই। দেশের পুঁজিবাজারের মূলধন এর আগে কখনো ৫ লাখ কোটি টাকার ঘর স্পর্শ করেনি।

অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম

তারপরও একটি সুস্থ ও স্বাভাবিক পুজিবাজারের প্রত্যাশা থেকে একথা নির্দ্বিধায় বলা যেতে পারে, সূচকের উত্থান, বাজারের মূলধন বৃদ্ধিসহ আরও অনেক ভালো খবরের সত্বেও বিনিয়োগকারীদের মাঝে শংকা এখনও পুরোপুরি দূর হয়নি। নিয়ন্ত্রক সংস্থার কিছু সিদ্ধান্তে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে মার্কেটে সক্রিয় কয়েকটি অসাধু চক্র নানা উপায়ে বিনিয়োগকারীদের ফাদে ফেলে অর্থ কামিয়ে নিচ্ছে। বিভিন্ন উপায়ে গুজব ছড়িয়ে একধরনের মেকি হুজুগ সৃষ্টি করে চক্রটি অস্বাভাবিকভাবে কখনও শেয়ারের দাম বাড়াচ্ছে, আবার কখনও তলানীতে নামিয়ে বিনিয়োগকারীদের সর্বস্বান্ত করছে। এক্ষেত্রে বাজার সংশ্লিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান, সংবাদমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়াও হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

পুঁজিবাজারের অস্থিরতা ও অসাধু চক্রের বৃত্ত ভাঙতে না পারলে শেয়ার মার্কেটের সংকট দূর হবে না। এক্ষেত্রে অধ্যাপক শিবলী’র নেতৃত্বাধীন সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)’র সঠিক যথাযথ ও সাহসী পদক্ষেপের পাশাপাশি বাজার সংশ্লিষ্ট সকলের আন্তরিক প্রচেষ্টার বিকল্প নেই।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading