ভাইরাল হওয়ার নেশা: কোনো সুস্থ সংস্কৃতির রূপ হতে পারে না
সম্পাদকীয় | উত্তরদক্ষিণ
মুদ্রিত সংস্করণ: রবিবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০২১ | আপডেট: ০০:০১
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই যুগকে অনেকে ‘ভাইরাল’ যুগ বলে সম্বোধন করে। এই যুগে ভাইরাল হয়ে অনেকেই রাতারাতি তারকা বনে গেছেন। আবার কুকীর্তি ফাঁস হয়ে বিখ্যাত অনেকেই খলনায়কে পরিণত হয়েছেন। কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো বিষয় ভাইরাল হলে এটি সমাজের একটি বড় অংশকে নাড়া দিতে সক্ষম হয়।
প্রশ্ন উঠতে পারে ‘ভাইরাল’ শব্দটি কি কেবল এই ডিজিটাল যুগেরই ফসল? অতীতে কি কোনো কিছু ভাইরাল হতো না? হ্যাঁ, হতো। আগেকার দিনেও অনেক কিছুই ভাইরাল হতো। তখনকার দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম না থাকলেও অন্যভাবেও ভাইরাল হতো। তবে তফাত্ এতটুকুই যে, সে সময় হয়তো কোনো কিছু এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ত না। হতো ধীরে ধীরে। আর সে সময় হয়তো ‘ভাইরাল’ শব্দটির প্রচলন ছিল না। আসল তফাত্টাই এখানে।
২০১৭ সালে গুগল, ইউটিউব, ফেইসবুকে সবচেয়ে বেশি ব্যবহূত বা খোঁজ করা শব্দগুলোর মধ্যে ভাইরাল শব্দটি অন্যতম। গুগল ট্রান্সলেটরে যার আভিধানিক অর্থ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘ভাইরাসঘটিত’ এবং ব্যবহারিক অর্থ হিসেবুে বিষপূর্ণ, বিষাক্ত, দূষিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই ‘ভাইরাল’ শব্দটি ভাইরাল হওয়ার আগেও কিন্তু এর ব্যবহার ছিল, যেমনু ভাইরাল ফিভার/জ্বর বা এই ধরনের শব্দে। আর রোগ-জীবাণু বা কম্পিউটারের ক্ষেত্রে ভাইরাস শব্দটির ব্যবহার তো ছিলই।
এখনকার যুগে ‘ভাইরাল’ শব্দটির ব্যাপক ব্যবহার টিকটক, লাইকি, ফেসবুক ও ইউটিউবের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতেই বেশি দেখা যায়। কারো কোনো তথ্য, লেখা, ছবি, ভিডিও অথবা যে কোনো কিছুই সামাজিক মাধ্যমে বা যে কোনোভাবে সমাজে ছড়িয়ে পড়লে, সেটিকে আমরা ভাইরাল হিসেবে অভিহিত করে থাকি। আমাদের সমাজের অনেক মানুষই, বিশেষ করে, তরুণ প্রজন্মের বড় একটা অংশই এই ভাইরাল হওয়ার সংগ্রামে নিমজ্জিত। এদের মধ্যে কেউ কেউ রয়েছেন যারা তাদের চুলের কাটিং, পোশাকের ভিন্নতা, কথা বলার ধরনসহ বিভিন্ন রকম অনন্য সব অঙ্গভঙ্গিতে লেখা, ছবি, অডিও ও বিভিন্ন ভিডিও কনটেন্ট তৈরি করে ভাইরাল হতে চায়। কেউ কেউ অশ্লীলতাকেও বেছে নেয় এ কাজে। এই ভাইরাল হওয়ার জন্য অনেকেই নিজের জীবন, পরিবার, সমাজ এমনকি দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হওয়ার ব্যাপারে বিন্দুমাত্র আশঙ্কাও যেন করছে না। ভালো হোক, মন্দ হোক তারা যেন তাদের পথেই অবিচল।
আবার বিনোদন কিংবা মজার ছলে এবং কৌতুহল বা বিভিন্ন কারণবশত ইদানীং আমাদের মতো সাধারণ মানুষও অনেক বেশি পরিমাণে তাদের করা ওইসব কন্টেন্ট দেখছে বা গ্রহণ করছে। এজন্য তারা এদিকে আরো বেশি উত্সুক হয়ে পড়ছে। কারণ তাদের কোনো ভিডিওর যখন ভিউয়ার, লাইক, কমেন্ট, শেয়ার এবং ফলোয়ারের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়, তখন তাদের মোটা অঙ্কের অর্থ ও রাতারাতি সেলিব্রিটি বনে যাওয়ার স্বপ্ন পূরণ হতে থাকে। একেই তারা জীবনের পরিপূর্ণ সফলতা হিসেবে দেখতে থাকে এবং পেশা হিসেবে অনেকেই এ ভাইরাল হওয়ার সংগ্রামকেই বেছে নেয়। কে কী বলে সেটি দেখার মতো সময় বা মনোভাব তাদের আর থাকে না। এভাবে একজনের দেখাদেখি অনেকেই এ পথে পা বাড়াচ্ছে প্রতিনিয়ত। ভাইরাল হওয়ার এই নেশা দিনে দিনে যেন একটি সংস্কৃতিতে পরিণত হচ্ছে। যাচ্ছেতাই করে ভাইরাল হওয়ার এই প্রক্রিয়া আমাদের তরুণ প্রজন্মকে ধীরে ধীরে একগুঁয়ে করে তুলছে, ভিন্ন এক সংস্কৃতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে এবং অশ্লীলতার পথে পা বাড়াতে সহযোগিতা করছে। বিশেষ করে, ক্রমেই পড়াশোনা, পরিবার ও সভ্য সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এটি কোনো সুস্থ সংস্কৃতির রূপ হতে পারে না। ভাইরাল হওয়ার অপ্রীতিকর, অশ্লীল, অকল্যাণকর ও অসামাজিক সব ধরনের লেখা, ছবি, অডিও এবং ভিডিওর কুপ্রভাব থেকে বর্তমান ও ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে বাঁচাতে হলে আমাদের সবাইকে সম্মিলিতভাবে এ ধরনের সব কিছুই সরাসরি বর্জন করা উচিত। আগেই বলেছি, এ সমস্যাগুলো সৃষ্টির পেছনে আমরা সাধারণ মানুষও কখনো দায় এড়াতে পারব না। কারণ আমাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রশ্রয়ের জন্যই এগুলোর প্রভাব বৃদ্ধি পায়। আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে কোনোরকম অপরাধে না জড়িয়ে বা কাউকে অপরাধে সাহায্য না করে বরং তা ব্যবহারে সর্বাত্মক সচেতন হয়ে চলার প্রক্রিয়া গ্রহণ করা উচিত।

