সড়ক দুর্ঘটনা কবে কমবে?
উপ-সম্পাদকীয় | উত্তরদক্ষিণ
মুদ্রিত সংস্করণ: মঙ্গলবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০২১ | আপডেট: ০০:০১
মশিউর রহমান :: ঘুম থেকে উঠেই সামাজিক মাধ্যম স্ক্রল করার অভ্যাস। আজও তার ব্যত্যয় ঘটল না। হঠাত্ স্ক্রল করতে করতে সড়ক দুর্ঘটনায় এক উঠতি অভিনেত্রীর মৃত্যুর খবর দেখতে পেলাম। খবরের ভেতরে ঢুকতেই দেখতে পেলাম, কোন একটি যানবাহনের ধাক্কায় ঘটনাস্থলেই বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণীর মৃত্যু হয়েছে। সেটি কীভাবে তাও কেউ সঠিকভাবে বলতে পারছেন না। হয়ত দুর্ঘটনার পর চিরায়ত নিয়মের মতোই গাড়িটি ঘটনাস্থল থেকে সটকে পড়ে। তবে রাতে দুর্ঘটনা ঘটলেও মেয়েটির লাশ মিরপুরের ট্যাকনিক্যাল সড়কেই পড়েছিল। পরবর্তীতে পুলিশ তা মর্গে পাঠায়। এ ঘটনায় দেশের নাট্যঙ্গনের অনেকেই শোক প্রকাশ করেছেন।
দুর্ঘটনায় মৃত্যু কখনো কারও কাম্য নয়। একটি তাজা প্রাণকে মাত্র কয়েক সেকেন্ডে নিঃশেষ করে দিতে পারে একটি দুর্ঘটনা। অথচ এই দুর্ঘটনাই যেন আমাদের প্রতিদিনের নিত্যসঙ্গী। আর শীতকাল আসলে তো কথায় নেই। সড়ক দুর্ঘটনা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। শহর অঞ্চলে শিশির কণা, শীতল মৃদু হাওয়া আর কুয়াশা তুলনামূলকভাবে অল্প হলেও দেশের বিভিন্ন মহাসড়ক যেন এর জন্য মরণফাঁদ হয়ে ওঠে। ঘটে ভয়াবহ হূদয়বিদারক এবং মর্মান্তিক দুর্ঘটনা।
প্রতিনিয়ত এসব দুর্ঘটনায় তিলে তিলে গড়ে ওঠা মানুষের স্বপ্নগুলো যেন মুহূর্তেই ধূলিস্যাত্। দুর্ঘটনায় যদি উপার্জনক্ষম মানুষের মৃত্যু হয় তাহলে একটি পরিবারের নিঃস্ব হতেও সময় লাগে না। বলতে গেলে পিতা হারাচ্ছে মা-সন্তানেরা। আবার পিতা-মাতা হারাচ্ছে সন্তানরা। ভাই হারাচ্ছে বোন আর বোন হারাচ্ছে ভাই। মানুষের জীবনসঙ্গীকেও যেন মুহূর্তেই নিঃশেষ হয়ে যায়। স্বজনদের আর্তচিত্কারে চারপাশ ভারি হয়ে উঠলেও তা যেন আমাদের বিবেককে নাড়া দিতে পারছে না। এ যেন এক নিষ্ঠুর মরণ খেলা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ৫৫ জন ব্যক্তি প্রাণ হারাচ্ছে। এদিকে ২০২০ সাল বাংলাদেশসহ বিশ্ববাসীর জন্য মহামারীর বছর। লকডাউনেই কেটে গেছে অর্ধেক বছর। কিন্তু এর মধ্যেও থেকে নেই দুর্ঘটনা। গত এপ্রিল মাসে করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে দেশব্যাপী পরিবহন চলাচল বন্ধ থাকলেও এ সময়ে ২০১টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২১১ জন নিহত ও ২২৭ জন আহত হয়েছেন। একই সময় নৌ-পথে ৮টি দুর্ঘটনায় ৮ জন নিহত, ২ জন আহত ও ২ জন নিখোঁজ হয়েছে।
সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত বছর সর্বমোট ৪ হাজার ৯২টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছেন ৪ হাজার ৯৬৯ জন। এছাড়া এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ৫ হাজার ৮৫ জন। রেলপথের দুর্ঘটনায় ১২৯ জন নিহত ও ৩১ জন আহত হন আর নৌপথের দুর্ঘটনায় ২১২ জন নিহত ও ১০০ জন আহত বা নিখোঁজ হন।
এসব অকালমৃত্যুর প্রতিবাদে একের পর এক সড়ক অবরোধ চলছে। এছাড়াও ট্রাফিক সপ্তাহ, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ফিটনেসবিহীন যানবাহন চিহ্নিতকরণের কাজ। কিন্তু তবুও যেন কমছে না সড়কের মৃত্যু। বিভিন্ন জায়গায় দেখা যায়, যেখানে-সেখানে গাড়ি থামানো, রাস্তাসংলগ্ন দোকান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সামনে ফুটপাতে গাড়িগুলো সমান্তরালে না রেখে খাড়াখাড়িভাবে রাখা হয়, যার ফলে গাড়ি চলার রাস্তা সংকীর্ণ হয়ে যায় ঘটে দুর্ঘটনা। ফিটনেসবিহীন গাড়ি, চালকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা ও বেপরোয়া গাড়ি চালানোর প্রবণতা, দৈনিক চুক্তিভিত্তিক গাড়ি চালানো, লাইসেন্স ছাড়া চালক নিয়োগ, আইন ভঙ্গ করেওভারটেকিং, বিরতি ছাড়াই দীর্ঘসময় ধরে গাড়ি চালানো, এসব দুর্ঘটনার কারণ হলেও কোনও অংশে কম যান না পথচারীরা। যত্রতত্র রাস্তা পারাপার তো আছেই এমনকি ট্রাফিক পুলিশ উপস্থিত থাকলেও মানুষ ব্রিজ ব্যবহার করেন না অথবা ট্রাফিক পুলিশকেও পথচারীদের ব্রিজ ব্যবহারে বাধ্য করতে দেখা যায় না।
এদিকে সড়কে দুর্ঘটনা কমাতে বাংলাদেশে চালক ও পথচারী উভয়ের জন্য কঠোর বিধান যুক্ত করে তৈরি হয় বহুল আলোচিত ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮।’ তবুও যেন কমছে না সড়ক দুর্ঘটনা। মানুষ মানছে না আইন। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার সড়ক দুর্ঘটনা দেখে আমার মনে হয়, সচেতনতা সৃষ্টি ও আইনের অস্পষ্টতার বিষয়গুলো নিয়ে অনেক আগে থেকে কাজ শুরু করা দরকার ছিল। বিভিন্ন অস্পষ্টতা সমাধান করে পুরোদমে দ্রুত আইনটি প্রয়োগ করা জরুরি। মূলকথা আমাদের সকলের একটু সচেতনতা এবং দায়িত্বশীলতাই এসব দুর্ঘটনা অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব। লেখক: সংবাদকর্মী

