বিশ্ব রাজনীতিতে কাতারের সাফল্যের নেপথ্যে
প্রতিক্রিয়া| উত্তরদক্ষিণ
মুদ্রিত সংস্করণ: রবিবার, ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | আপডেট : ০০:০১
ফিরে যেতে হবে ৩ বছর আগে। স্থিতু কিছু সমস্যা দেখিয়ে ২০১৭ সালের জুন মাসে কাতারের ওপর অবরোধ আরোপ করে মিত্র উপসাগরীয় ৪ দেশ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিশর এবং বাহরাইন। দেশগুলোর অভিযোগ, সন্ত্রাসবাদে আর্থিক সহায়তা ও মদদ দিয়ে আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা তৈরি করছে দোহা। তবে বরাবরই এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে কাতার। তবুও পড়ে যায় নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে। কিন্তু তাতেও নোয়ানো যায়নি কাতারকে। সাময়িক সময় কিছু সমস্যা পোহাতে হলেও ধীরে ধীরে সবকিছু কাটিয়ে ওঠে কাতার। বিশেষ করে ইরান, মরক্কো আর তুরস্কের সহযোগিতা উল্লেখযোগ্য। কারণ খাদ্যসামগ্রী থেকে গৃহস্থালি নানা জিনিসে মধ্যপ্রাচ্যের এই চার দেশের ওপর নির্ভরশীল ছিল কাতার। হঠাৎ করেই অবরোধ আরোপ দেশটিকে বিপাকে ফেলে দেয়। ব্যাপক সমস্যাতেও পড়েছিল দোহা। দেশটির অর্থনীতি সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয়েছিল। কিন্তু মাস দেড়েক পরই ভিন্ন এক চিত্র দেখা যায়। চার দেশের অবরোধকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে উঠে দাঁড়াচ্ছে কাতার।
প্রথমদিকে অবরোধের চাপকে কাজে লাগিয়ে আল-জাজিরা চ্যানেল বন্ধসহ কাতারের ওপর ১৩টি শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু তার একটিও মানেনি কাতার। উল্টো ঘোষণা করে, আরব দেশগুলো কাতারের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হেনেছে। এরপর বিপরীত রাস্তা খুজে বের করে মধ্যপ্রাচ্যের ধনী এই দেশটি। কাতারের ভাষায়, এই ১৩ টি আইন ছিল অন্যায্য। যেমন ‘গলায় দড়ি দিয়ে গরু-ছাগলের মতো বেধে রাখা’।
মূলত বিভিন্ন দেশে কাতারের জমি, ব্যবসা, আর ধনী ব্যক্তিরা যেভাবে আঞ্চলিক বিরোধ ও রাজনীতিতে ভূমিকা রাখছেন, তা প্রতিবেশী দেশগুলোর পছন্দ হয়নি। সিরিয়া ও লিবিয়া ইস্যুতে কাতারের ভূমিকা ভালো চোখে দেখেনি প্রতিবেশী দেশগুলো। আর তাই দেশটির প্রধান সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে পুরোপুরি বন্ধ করার দাবি জানিয়েছিল এই চার দেশ।
সেসময় জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মার্ক লিঞ্চ বলেন, ‘ইয়েমেনে সর্বনাশা এক যুদ্ধের পর সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সাফল্যের জন্য উঠেপড়ে লেগেছিল। কিন্তু তা করতে গিয়ে কিছুটা বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। একটি পরিকল্পনা ব্যর্থ হলে বিকল্প পরিকল্পনা লাগে। আর সেটি তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে তারা। বিশেষ করে গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল বা জিসিসি থেকে কাতারকে বিচ্ছিন্ন করে সফল হতে চেয়েছিল বিরোধী চারটি দেশ। কিন্তু তা কাজে দেয়নি। প্রতিবেশীর ক্ষতি করার ব্যাপারে নিজেদের সক্ষমতা সম্পর্কেও তাদের ধারণা ভুল ছিল।’
সময়ের পরিক্রমায় ৪ বছর আগের দেওয়া এই বিশেষজ্ঞের কথা অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেল। বিশেষ করে সৌদি আরব ও আমিরাত নিজেদের সক্ষমতা বুঝে উঠতে পেরেছে। কারণ তাদের সাথে মধ্যপ্রাচ্যের বাকী দেশগুলো তাল মেলায়নি। নিরব ভুমিকায় ছিল কুয়েতসহ গালফভুক্ত অনেক দেশ। এরপর যাদের সাথে সম্পর্কের জন্য কাতারের ওপর অবরোধ আরোপ করা হয় ঠিক তাদের সাথেই কাতারের আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে ইরান, তুরস্ক আর মরক্কোর সহযোগিতায় ঘুরে দাঁড়ায় কাতার। উল্টো অবরোধের বছর না ঘুরতেই এসব দেশের পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এমনকি অন্য কোন দেশ হয়েও যেন এসব পণ্য কাতারে না ঢুকতে পারে সেদিকেও বিশেষ নজর ছিল দেশটির।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও কাতারের অবস্থান পোক্ত। আয়তনে ছোট বলে কেউ চাইলেই কোনঠাসা করতে পারবে না। সৌদির নেতৃত্বে আরব উপদ্বীপের প্রভাবশালী কয়েকটি দেশ অবরোধ দিয়েও কাতারকে বশ মানাতে পারেনি। অবরোধের পর রাজনীতিতে দেশটির অবস্থান আরো পোক্ত হয়েছে বলেই বিশ্লেষকরা মনে করেন। বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বে কাতারের আমিরের গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে। কিছু কিছু সিদ্ধান্তের বেলায় কাতারের দিকে তাকিয়ে থাকেন অনেক মুসলিম নেতা।
তিনি কখনো ব্যক্তিগত স্বার্থে ক্ষমতা গ্রহণ করেননি। ব্যক্তিগত স্বার্থে ক্ষমতা থেকে সরেও দাঁড়ান নি। যা করেছেন সবটাই জাতির স্বার্থে। তিনি নিশ্চিৎ তামিম দায়িত্বশীল, আস্থাভাজন। ক্ষমতা নেওয়ার পর বাবার মতো করেই দেশ চালাতে থাকেলন তামিম। বাবার মিত্রকে মিত্র ভাবলেন। বাবার শত্রু থেকে সাবধান থাকার কৌশল নিলেন তিনিও। তার সব কার্যক্রমের ওপর চোখ রাখলো সৌদি। সৌদির চোখরাঙানিতেই অবরোধের মুখে পড়তে হয় কাতারকে। এই অবরোধের পেছনের আরেক কারিগর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি নিজের মুখে এর দায় স্বীকার করেছেন। পরে অবস্থান থেকে সরে আসতে বাধ্যও হয়েছেন।
কাতারে রয়েছে মার্কিন বিশাল সামরিক ঘাঁটি। এছাড়াও জ্বালানিসহ নানা দিক থেকে দোহার কাছে দায়বদ্ধ ওয়াশিংটন। এসব সাত-পাঁচ ভেবে সৌদির আহ্বানে কাতারের সঙ্গে সরাসরি বিরোধে জড়াননি বেপরোয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
কারো সঙ্গে বিরোধে জড়াতে চান না তামিমও। সৌদি আরবের শাসকদের সঙ্গেও না। হাসি-খুশি, খোলা মনের এই আমিরের সুনাম বিশ্বজুড়ে। আভিজাত্য, বিলাসিতার ভেতরে থেকেও সাধারণ জীবনযাপনের জন্য তিনি প্রশংসিত। আর প্রশংসিত আপোষ না করার জন্য।
ছোট আরব দেশ দুটি যখন ইসরাইলের সাথে দোস্তির ঘোষণা দিয়েছে তখন আরেকটি আরব দেশ ফিলিস্তিনিদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রকাশ্য জানিয়ে দিয়েছে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন ছাড়া ইসরাইলের সাথে সর্ম্পক স্বাভাবিক করবে না। এই দেশটি হচ্ছে কাতার। একই সময়ে আরেক ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটছে কাতারের রাজধানী দোহায়। এই দেশটির মধ্যস্থতায় তালেবানের সাথে শান্তি আলোচনায় বসেছে আফগান সরকার।
আজ তিন বছর পর ভেবে দেখার সময় এসেছে, এ বিরোধে শেষ পর্যন্ত কার জয় আর কার পরাজয় হয়েছে? বিশ্লেষকরা বলছেন, এতে জয় হয়েছে মার্কিন লবিস্ট এবং অস্ত্রশিল্প খাতের আর পরাজয় ঘটেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। সেদিন কাতার দখলে মার্কিন বিরোধিতার পেছনে ছিল অনেক কারণ। যেমন, কাতারে ছিল মার্কিন সামরিক ঘাঁটি, যাতে ছিল ১০ হাজার মার্কিন সৈন্য। তাদের রেখেই কাতার দখল করলে এবং তাদের নাকের ডগায় তিন দেশের সৈন্যরা দাবড়ে বেড়ালে মার্কিনীদের সম্মান থাকে?
প্রশ্ন হলো, ওই চার দেশ কি তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিয়ে কাতারের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ ও অবরোধ আরোপ করেছিল? বিভিন্ন সূত্রের গবেষণা বলছে, না। এর মঞ্চ প্রস্তুত হয়েছিল সাত মাস আগে, যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
কাতারের ওপর আরোপিত অবরোধের অবৈধতা এবং সন্ত্রাসবাদ দমনে দেশটির অবদান তুলে ধরে গুগল ও ইউটিউবে ইতিমধ্যে বিজ্ঞাপন সম্প্রচারিত হচ্ছে।
এ-ই যখন অবস্থা, তখন জাতিসংঘের এক অধিবেশন শেষে কথা বলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও কাতারের আমীর তামিম। পরে ট্রাম্প বলেন, দু’দেশ অনেক দিনের পুরনো বন্ধু। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
গত ১০ এপ্রিল আবারও বৈঠকে বসেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও আমীর তামিম। এ সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কাতারের আমীরকে তার ‘বন্ধু’ ও ‘একজন বিশিষ্ট ভদ্রলোক’ বলে অভিহিত করেন। জবাবে কাতারের আমীর অবরোধকালে তার দেশকে সমর্থন দেয়ায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ধন্যবাদ দেন।
সব মিলিয়ে ছোট দেশ কাতারের মোকাবিলায় সউদি জোট বেশ পিছিয়েই পড়েছে বলা যায়।
কাতারের চ্যালেঞ্জ ছিল দুটি। প্রথমত, তাদের প্রমাণ করতে হবে যে ওসামা বিন লাদেনের মতো কোন সন্ত্রাসীকে তারা সমর্থন করছে না। দ্বিতীয়ত; তাদের অর্থনৈতিক ভিত্তি যে মজবুত সেটি প্রমাণ করা। বিনিয়োগের জন্য কাতার যে একটি ভালো জায়গা সে বিষয়টি প্রমাণ করতে হয়েছে।

